গুরুত্ব হারাচ্ছেন রাজনীতিকরা!

আগের সংবাদ

শাহরুখের ‘ডার্লিংস’ ছবিতে থাকছে আলিয়া

পরের সংবাদ

কালোটাকার সুযোগ থাকল

প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২১ , ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ৩০, ২০২১ , ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ

* মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবায় করপোরেট কর বাড়ছে না

* শিল্পের কাঁচামাল ক্রয়ে ক্রসচেকে লেনদেনের শর্ত শিথিল

* রেস্তোরাঁর খাবারে ভ্যাট কমল

* সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

মহামারি করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও ভ্যাট ছাড় দিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব করা হয়েছে। ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে আগের মতো ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে নয়; ২৫ শতাংশ কর এবং ওই করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানা দিয়ে নগদ টাকা, ব্যাংকে রাখা টাকা, সঞ্চয়পত্র কিনেও টাকা সাদা করা যাবে। একইভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চাইলে একই হারে কর ও জরিমানা দিয়ে কালোটাকা সাদা হবে। এবারের বাজেটেও অগ্রাধিকার পাচ্ছে দেশের প্রান্তিক তথা পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠী।

এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং সেবার করপোরেট কর কমানো, শিল্পের কাঁচামাল ক্রয়ে ক্রসচেকে লেনদেনের শর্ত শিথিল ও রেস্তোরাঁর খাবারে ভ্যাট কমানোসহ বেশকিছু খাতে সুযোগ অব্যাহত রেখে জাতীয় সংসদে গতকাল মঙ্গলবার পাস হয় ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য অর্থবিল। এ বিল পাসের মধ্য দিয়ে নতুন অর্থবছরের বাজেট পাসের প্রক্রিয়া শুরু হলো। আজ বুধবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের এই বাজেট পাস হবে। যা আগামীকাল ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো দরকার।

জানতে চাইলে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, বাজেটে পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর জন্য যে অগ্রাধিকারের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করি। অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা খাতে আরো জোর দেয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, মানুষ অনেক বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে গেছে। নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। আবার করোনার ধাক্কা আসছে। এ ধাক্কা দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে। সেখানে নি¤œআয়ের মানুষ নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। তাদের সহযোগিতা ও নগদ অর্থ দিতে হতে পারে। তাই সামাজিক সুরক্ষা খাতে আরো বরাদ্দ বাড়ানো দরকার ছিল। ড. মুস্তাফিজ বলেন, আয়করে কোনো ধরনের পরিবর্তন হয়নি। আমরা বলেছিলাম, শিক্ষা খাতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমানোর জন্য। কারণ, করোনাকালীন এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বে। এছাড়া ব্যক্তি খাতের আয়কর ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫ বা ৬ লাখ করা হলে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ কম পড়ত। এ অর্থনীতিবিদ বলেন, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোনো লাভ হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। এ ধরনের সুযোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। এ সুযোগ না দিয়ে বরং খেয়াল রাখা উচিত কিভাবে কর ফাঁকি কমানো যায়। এনবিআর, ব্যাংকিং খাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে ডিজিটাল ইন্টারফেস শক্তিশালী করা এবং গুড গভর্ন্যান্স এর ওপরে বেশি জোর দেয়া দরকার।

জাতীয় সংসদে গতকাল ২০২১ সালের অর্থবিল পাসের সময় কিছু ধারা সংশোধন করে পাস করা হয়েছে। সেখানে নগদ টাকা, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকে রাখা টাকার পাশাপাশি শেয়ারবাজার, ফ্ল্যাট জমিতে বিনিয়োগ করে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ কর ও জরিমানা দিয়ে আরো এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে। এ জন্য অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশে একাধিক ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে।

জানা গেছে, নগদ টাকার পাশাপাশি কারো যদি ব্যাংকে রাখা টাকা, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র থাকে, যা কালোটাকায় কেনা হয়েছে; তাহলে এসব খাতে রাখা কালোটাকাও সাদা করা যাবে। ২৫ শতাংশ কর ও করের ওপর ৫ শতাংশ জরিমানা, অর্থাৎ সব মিলিয়ে ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করতে হবে। এ ছাড়া কেউ যদি কালোটাকা শেয়ারবাজারে নিয়ে যেতে চান, তাহলেও একইভাবে ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে ওই টাকায় কেনা শেয়ার এক বছরের মধ্যে বিক্রি করলে ১০ শতাংশ হারে জরিমানা বসবে।

চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময়ে দেয়া নগদ টাকা, ব্যাংকে রাখা টাকা ও এফডিআর, সঞ্চয়পত্র কিনে ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগটি ৩০ জুন, অর্থাৎ আজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। শেয়ারবাজারেও একই হারে কর দিয়ে শেয়ারবাজারে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ শেষ হচ্ছে। ফলে কম হারে কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আছে আর মাত্র একদিন। এক বছর ধরে নগদ টাকা বেশি সাদা হয়েছে। নগদ টাকা সাদা করায় বেশি আগ্রহ ছিল করদাতাদের। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সব মিলিয়ে ১০ হাজার ৩৪ জন করদাতা কালোটাকা সাদা করেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ তেমন একটা নেননি করদাতারা। গত জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৩৪১ জন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে এ সুযোগ নিয়েছেন। জমি কিনেও খুব একটা কালোটাকা সাদা হয়নি।

এদিকে বিনিয়োগ সহজ এবং উৎসাহী করতে শিল্পের কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে ক্রসচেকের শর্তও শিথিল করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০ হাজার টাকার বেশি কাঁচামাল কিনলে সে ক্ষেত্রে চেকে লেনদেনের বিধান চালু আছে। এটি বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এখন থেকে ৫ লাখ টাকার কম টাকার কাঁচামাল কিনলে চেকে লেনদেনের বাধ্যবাধকতা থাকছে না। এতে শিল্প উদ্যোক্তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। নতুন অর্থবছরের বাজেটে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফএস) ওপর বাড়তি যে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা বাদ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এমএফএস কোম্পানিগুলো আগের মতোই সাড়ে ৩২ শতাংশ হারে করপোরেট কর দেবে। সংসদে গতকাল অর্থবিল পাসের আগে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সাংসদ মো. আব্দুস শহীদ এমএফএস সেবায় অতিরিক্ত ওই কর আরোপের বিষয়টি সংশোধনের প্রস্তাব তোলেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। ২০১২ সালে বিকাশ সেবা চালু করার পর দেশে এখন নগদ, রকেট, ইউক্যাশ, এমক্যাশ, শিওরক্যাশ এবং উপায়সহ ১৬টির মতো কোম্পানি এমএফএস সেবা দিচ্ছে।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বিধিনিষেধের আওতায় রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়া নিষেধ। কিন্তু খাবার কিনে নিয়ে যাওয়া যাবে। তাই রেস্তোরাঁ চলছে মূলত সীমিত পরিসরে। তবে সংক্রমণ কমে গেলে বদলে যেতে পারে রেস্তোরাঁর এ চিত্র। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত রেস্তোরাঁ ব্যবসা আবার জাগিয়ে তুলতে কমানো হয়েছে ভ্যাট হার। এতে গ্রাহকের খাবারের খরচ কিছুটা হলেও কমবে। বর্তমানে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) ফাস্টফুডের দোকান, রেস্তোরাঁয় প্রতি ১০০ টাকার খাবারে ১৫ টাকা ভ্যাট কেটে রাখা হয়। নতুন অর্থবছর তথা ১ জুলাই থেকে এ ধরনের ফাস্টফুডের দোকান ও রেস্তোরাঁ থেকে ভ্যাট কাটা হবে ১০ টাকা। আর ননএসি রেস্তোরাঁ বা ফাস্টফুডের দোকানে ভ্যাট দিতে হবে সাড়ে ৭ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০২১ সালের অর্থবিল পাসের সময় এই সংশোধনী আনা হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেছেন, এক বছর ধরে রেস্তোরাঁ ব্যবসা এমনিতে খারাপ গেছে। তাদের একটু স্বস্তি দিতে ভ্যাট কমানো হয়েছে।

বিদ্যমান ভ্যাট আইনের আওতায় কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ওপর কোনো ভ্যাট নেই। তবে রাজধানী ও বড় শহরের বহু এসি, নন-এসি রেস্তোরাঁকে ভ্যাটের আওতায় এনে ভ্যাট আদায়ের নানা উদ্যোগ নিয়েছেন ভ্যাট কর্মকর্তারা। প্যাকেজ ভ্যাট প্রথা উঠে যাওয়ার পর রেস্তোরাঁ খাত থেকে ভ্যাট আদায়ের তদারকি বাড়িয়েছেন তারা।

জানা গেছে, করোনার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রস্তাবিত বাজেটে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়নের ঘোষণা রয়েছে। কঠোর লকডাউনের কারণে সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়েন নিম্ন মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষ। গত বছর লকডাউনের শুরুতে নগদ প্রণোদনাসহ আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটেও বেশকিছু কর্মসূচি রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়