বিভেদ ভুলে মোদিকে আম পাঠালেন মমতা

আগের সংবাদ

সাকিবদের আচরণে অপমানিত, ক্ষোভে আম্পায়ারিং ছাড়ছেন মুনিরুজ্জামান

পরের সংবাদ

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠবে মৃত্যুর পর

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২১ , ১১:০৩ অপরাহ্ণ আপডেট: জুন ২৯, ২০২১ , ১১:০৩ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের যে ক’জন নারী তাদের কৃতিত্ব ও কর্ম দিয়ে দেশকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছেন রানী হামিদ তাদের অন্যতম। গত চার দশক ধরে দাবার নিয়মিত মুখ রানী হামিদ। ১৯৪৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। বাবা সৈয়দ মমতাজ আলী পেশায় পুলিশ কর্মকর্তা ও মা কামরুন্নেসা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বিশ্বে রানী হামিদ নামে পরিচিত হলেও তার বাবা-মায়ের দেয়া নাম সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুন। আর ডাকনাম রানী। মাত্র পনেরো বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আবদুল হামিদের সঙ্গে বিয়ে হয় রানী হামিদের। বিয়ের পর ডাক নামের সঙ্গে স্বামীর নাম যুক্ত করে তিনি হয়ে ওঠেন রানী হামিদ।

ক্রীড়াজগতে তিনি রানী হামিদ নামেই পরিচিত। আবদুল হামিদ তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একজন সাঁতারু হিসেবে পাকিস্তানে রেকর্ড করেছিলেন। বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সভাপতিও ছিলেন তিনি। রানী হামিদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে কায়সার হামিদ বাংলাদেশের একজন তারকা ফুটবলার। বাংলাদেশের ফুটবলার হিসেবে দেশে-বিদেশে তার খ্যাতি রয়েছে। মেজ ছেলে সোহেল হামিদ স্কোয়াশ ফেডারেশনের সম্পাদক ও একজন ক্রিকেটার এবং ছোট ছেলে শাহজাহান হামিদ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। এক মেয়ে জেবিন হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। লেখালেখি করেন তিনি। গতকাল ভোরের কাগজের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় রানী হামিদ তার বর্ণাঢ্য দাবা ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি দাবায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন।

রানী হামিদ ১৯৭৬ সালে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণ করেন, তখন তিনি তিরিশে পা রেখেছেন, কোলজুড়ে চার সন্তান। প্রথমবারেই নবদিগন্ত সংসদের এস এ মহসিন স্মৃতি দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার বর্ণিল দাবাড়ু জীবন। এ সাফল্য তাকে অনুপ্রেরণা এবং উৎসাহ জোগায়। কঠোর অনুশীলনে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন তিনি। পরবর্তীতে নবদিগন্ত সংসদ দাবা ফেডারেশনের উদ্যোগে নারীদের জন্য আয়োজিত প্রতিযোগিতায় পর পর তিনবার ১৯৭৭, ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে চ্যাম্পিয়ন হন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি, একের পর এক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং অর্জিত কৃতিত্ব ছড়িয়েছেন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে। ১৯৮১ সালে প্রথমবার তিনি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন।

এরপর তিনি অংশগ্রহণ করেন চেজ অলিম্পিয়াডে এবং ১৯৮৪, ১৯৮৬ এবং ১৯৯২ সালে পর পর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৩ সালে প্রথম ব্রিটিশ মহিলা দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এরপর এ টুর্নামেন্টে তিনবার শিরোপা জিতেন তিনি। ব্রিটিশ মহিলা দাবা খেলোয়াড়রা যখন বাঙালি নারী রানী হামিদের কাছে পরাজিত হচ্ছিলেন, তখন তাদের মধ্যে এক প্রকার হীনম্মন্যতা কাজ করে। তারা দাবি তোলে, ব্রিটিশ মহিলা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অন্য দেশের নারীরা খেলতে পারবে না। পরে অন্য দেশের নারীদের ব্রিটিশ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন শুধু ব্রিটিশ নারীরা খেলে এবং তারাই চ্যাম্পিয়ন হয়। জাতীয় মহিলা দাবায় ২০ বার চ্যাম্পিয়ন হন রানী হমিদ। ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক ‘ফিদে’ খেতাব অর্জন করেন এবং ১৯৮৫ সালে তিনি ফিদে আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার খেতাব পান।

কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৫তে অর্জন করেন স্বর্ণপদক। তিনি বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে শুধু মহিলা দলই নয়, জাতীয় দলের হয়ে অংশ নিয়ে যে সম্মান পেয়েছেন বিশ্বের খুব কম মহিলা দাবাড়ুরই তা রয়েছে। বর্ণিল ক্রীড়া জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক দাবা খেলার ওপর বই ‘মজার খেলা দাবা’ এবং আরো একটি বই তিনি উপহার দিয়েছেন, নাম ‘দাবা খেলার আইন কানুন’।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম না ওঠা সম্পর্কে ভোরের কাগজকে রানী হামিদ বলেন, ২০১৯ সালে ৩৯তম জাতীয় দাবায় আমি ২০তম শিরোপা জেতার পর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেসে আবেদন করেছিলাম। তাদের তরফ থেকে আমাকে এখনো কিছু জানায়নি। মৃত্যুর পর হয়তো গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠবে। দাবা ফেডারেশনের পক্ষে থেকেও চেষ্টা করা হয়েছে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ কোনো কিছু জানাক আর না জানাক আমি ফের জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। করোনার কারণে ২০২০ সালে জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়নি। শোনেছি এবার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দাবায় স্পন্সর সংকট সম্পর্কে তিনি জানান, দাবায় বড় বড় কোম্পানি স্পন্সর হলে দেশের দাবা আরো এগিয়ে যেত। আশির দশকে বিমান আমার স্পন্সর হওয়ায় আমি বিদেশি গিয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে ব্রিটিশ দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। বর্তমান কমিটি দাবার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। তারা স্পন্সর আনার চেষ্টা করছে। ওয়ালটনকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত তারা বিভিন্ন টুর্নামেন্টে স্পন্সর হচ্ছে। মেয়েরা দাবায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, এ কথা মানতে নারাজ রানী হামিদ। তিনি বলেন, আগের চেয়ে অনেক মেয়ে এখন দাবায় সম্পৃক্ত হচ্ছে। আমরা অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসেছি। এখন মেয়েরা ইউটিউবে দেখে দাবার নানা কৌশল শিখতে পারছে। লাইভ ম্যাচ দেখতে পারছে। অনলাইনে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে। এখন দেখার বিষয় তারা কত দূর যেতে পারে। আগামী দু-এক বছরের মধ্যে দাবায় বাংলাদেশ ভালো ফলাফল পাবে। দাবায় আমাদের পাইপলাইন বেশ সমৃদ্ধ।

রি-এসএস/ইভূ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়