বিস্ফোরণের উৎস নিয়ে ধূম্রজাল

আগের সংবাদ

রাজশাহী মেডিকেলে করোনায় রেকর্ড ২৫ জনের মৃত্যু

পরের সংবাদ

কামানের সামনে ঝাঁপ দেয়া

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২১ , ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৯, ২০২১ , ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ

পরাধীন ব্রিটিশ-ভারত থেকে পাকিস্তানের কালো অধ্যায় পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই মহান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা ঘটনা, যার কারিগর হিসেবে কেউ আখ্যায়িত হয়েছেন নায়কের অভিধায়; কেউবা আবির্ভূত হয়েছেন খলনায়কের চরিত্রে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সেসব ঘটনা ও তার নায়ক-খলনায়কদের কার কি ভূমিকা, তাই নিয়েই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গ্রন্থ ‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’। সম্প্রতি ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। এ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে ভোরের কাগজের পাঠকদের জন্য।

১৯৬২-৬৩ সনে আগরতলায় আই বি ফরেন ডেস্কের অপারেটিভদের সঙ্গে মুজিব অংশের একটি মিটিং হয়। মিটিংয়ে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন তার ইঙ্গিত দেয়া হয়। যারা মুভমেন্টকে ত্বরিত গতিতে এগিয়ে নিতে চান সেই অংশের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে যে মিটিং হয়েছিল তার লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কাজ করেছিলেন কর্নেল মেনন, যদিও এটা তার আসল নাম ছিল না।

মেনন মতামত ব্যক্ত করে তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ইতিবাচক কার্যসম্পাদনের জন্য এটা অনেক বেশি পরিমাণে তড়িঘড়ি হয়ে যাচ্ছে। যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তা অর্ধসমাপ্ত ও অকার্যকর। তিনি বলেছিলেন যে এটা হবে কামানের সামনে ঝাঁপ দেয়া। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলের অস্ত্রাগারে হানা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। এটা ছিল একটা ‘ডিজাস্টার’, বিপর্যয়।

ওই আগরতলা মামলায় পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে কয়েকজন বাঙালি গোয়েন্দা অফিসার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই মামলা সাজিয়েছিলেন তাদের মধ্যে এ বি এস সফদার, লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান ছিলেন অন্যতম।

সি আই এ-এর কার্যক্রম : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ষাটের দশকের পূর্ব থেকে পাঞ্জাবি সামরিক ও বেসামরিক আমলা চক্রের বিরুদ্ধে ছিলেন মুখর। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে জনগণের ভাগ্যকে বন্দি করা হয়েছিল। আর এই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সামরিক চক্র অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে; কখনো নেপথ্যে থেকে কখনো বা প্রকাশ্যে। ১৯৫৩ সনে ফস্টার ডালেসের পরিকল্পনা মোতাবেক ‘কম্যুনিজমকে আবদ্ধ রাখার’ জন্য কমিউনিস্ট দেশের চারপাশে কৌশলগত সেনাশক্তি মোতায়েন ও বলয় গড়ে তোলার নীতি গৃহীত হয়। পাকিস্তান ছিল তার অন্তর্ভুক্ত।

যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম বইটির কভার ফটো

রাশিয়া ও চীনের দ্বোরগোড়ায় হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের একটি বিশেষ ট্র্যাটেজিক অবস্থা বিদ্যমান। মার্কিন সামরিক স্ট্র্যাটেজি অনুসারে পাকিস্তানে তাদের এয়ারক্রাফ্ট এবং মিসাইল চীন রাশিয়ার দিকে তাক করে থাকার গুরুত্ব ভৌগোলিক অবস্থানে চমকপ্রদ। মার্কিন নীতির প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থনদানকারী পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে (১২/৯/১৯৫৬) থেকে ১৭/১০/১৯৫৭ সন পর্যন্ত) ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয় শুধু এই অপরাধে যে, পেশোয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের ইউ-২ বিমানকে অবতরণের সার্বভৌম অধিকার দিতে তার অস্বীকৃতি। মার্কিনিদের অনুচর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ও তদানীন্তন প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খান একত্রে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার অবসান ঘটান। চক্রান্তে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উদ্যোগ ও অনুমোদন ছিল। প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট হ্রাসের উদ্যোগ গ্রহণের ফলে নাজিমুদ্দিনকে অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইতোপূর্বে অপসারিত করা হয়।

পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাসাদ ষড়যন্ত্র রাজনৈতিক মঞ্চের নেপথ্যে সক্রিয় আমলাচক্র এবং অতি দ্রুত বেড়ে ওঠা ক্ষমতালিপ্সু সেনাবাহিনীর জেনারেলদের অশুভ আঁতাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপ পাকিস্তানি রাজনীতির স্বাভাবিক ধারাকে বারবার চক্রান্তের আবর্তে টেনে নিয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে শেখ মুজিবের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীর্যক ও ক্রোধের আগুনে ঝলসানো।

অ্যান্থানি মাসকারেনহাসের ভাষায় ‘আমার মনে পড়ে ১৯৫৮ সনের ৭ অক্টোবরে বালুচ রেজিমেন্টের মেসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার আলাপ-আলোচনার কথা, যে দিনটিতে আইয়ুব খানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। মুজিবুর রহমান আক্রোশে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা পেতে হবে। আমাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পদাতিক বাহিনী রয়েছে। আমি অবশ্যই এর তত্ত্বাবধান করব।

১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। তার পূর্বে ফেব্রুয়ারি ’৬৬ আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে ওই দাবিনামা অনুমোদিত হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শেখ মুজিব সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে জনসভা করে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং আওয়ামী লীগের দলীয় সংগঠনকেও মজবুত করতে তৎপর হন। তার অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উপায়ান্তর না পেয়ে ১৯৬৬ সালের ৭ অথবা ৮ মে তারিখে ভোর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে। তারপর থেকে তিনি জেলখানাতেই আবদ্ধ থাকেন।

২০ মাস ১০ দিন জেলে থাকার পর এবং জেলে থাকা অবস্থাতেই, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে প্রধান অভিযুক্ত আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামা দায়ের করে। বলা হয়, কয়েক বছর আগে থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সহযোগিতায় পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

১৯৬৮ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার একটি প্রেসনোট জারি করে। এ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু সংখ্যক সরকারি কর্মচারীকে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপের জন্য আটক করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসেই নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ও সিএসপি আহমদ ফজলু রহমান এবং অন্যান্য কয়েকজনকে বন্দি করা হয়েছিল।

ওই প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাঁচ দিন পর ৬ জানুয়ারি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার আরেকটি পূর্ণাঙ্গ প্রেসনোট জারি করে। প্রেসনোটে বলা হয়, ‘একটি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে গত মাসে পূর্ব পাকিস্তানে ২৮ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ষড়যন্ত্রটি গত মাসে উদ্ঘাটিত হয়। ধৃত ব্যক্তিরা পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। প্রেসনোটে আরো বলা হয়, এ ব্যাপারে তদন্ত সমাপ্তির পথে এবং বিচার শিগগিরই শুরু হবে।

৬ জানুয়ারি প্রেসনোটে মোট ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এক নম্বর অভিযুক্ত ছিলেন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। এর ১১ দিন পরে ১৮ জানুয়ারি আরেকটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে জানানো হয়, শেখ মুজিবুর রহমানকেও এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। ৬ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে শেখ মুজিব ছাড়া আরো ছয়জনকে এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

১৯৬৮ সালের ১৯ জুন মামলা শুরু হলে দেখা গেল, মোট ৩৫ জনকে মামলায় জড়িত করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেনের পরিবর্তে শেখ মুজিবুর রহমানকেই মূল অভিযুক্ত ঘোষণা করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য অভিযুক্ত’ নামক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।

প্রচলিত আইনে অভিযুক্তদের বিচার করার বিধান ছিল না বলে ওই আইন সংশোধন করে ‘ফৌজদারি আইন, সংশোধনী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) প্রেসিডেন্টের অর্ডিন্যান্স জারি করা হয় ১৯৬৮ সালের ২১ এপ্রিল তারিখে। এ আইনের বলে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, যে-সংস্থা এমন ধরনের মামলার বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ অভিযুক্ত হয়েছেন।

এ বিশেষ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন অবসরপ্রাপ্ত পাঞ্জাবি বিচারপতি এস এ রহমান। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মুজিবুর রহমান খান ও বিচারপতি মকসুমুল হাকিম। প্রখ্যাত পাঞ্জাবি উকিল এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মঞ্জুর কাদির সরকার পক্ষের উকিল নিযুক্ত হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে, ১৯ জুন ১৯৬৮ তারিখে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সিগন্যাল মেস প্রাঙ্গণে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হবে।

১৯ জুন ’৬৮ তারিখে ‘আগরতলা মামলা’ শুরু হয়। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বিচার অনুষ্ঠিত হলেও এটা ছিল প্রকাশ্য বিচার। আদালত কক্ষে অভিযুক্তদের আত্মীয়স্বজন ছাড়াও সাংবাদিক ও প্রচার মাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছিল।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ভেবেছিল যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা মাত্র পূর্ব বাংলার জনসাধারণ শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে চলে যাবে। এ কারণেই পাকিস্তান সরকার প্রকাশ্য বিচারের ব্যবস্থা করেছিল। তৎকালীন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী জাফর স্বয়ং কামরুদ্দীন আহমদের কাছে এ অভিমত প্রকাশ করেছিলেন।

কিন্তু আগরতলা মামলার অভিযুক্ত আসামিদের বক্তব্য এবং মামলার কার্যবিবরণী, সাক্ষীদের জেরার বিবরণ প্রভৃতি যতই প্রকাশিত হতে লাগল ততই পূর্ব বাংলার মানুষ ধারণা করতে শুরু করল যে, এটা একটা সাজানো মামলা এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দেয়ার উদ্দেশ্যেই এই মামলা সাজানো হয়েছে।

আগামীকাল প্রকাশিত হবে ‘গণআন্দোলন’
‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’- বইটি পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনে (ভোরের কাগজ কার্যালয়, ৭০ শহীদ সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা)। এছাড়া সংগ্রহ করা যাবে bhorerkagojprokashan.com থেকেও।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়