প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ৭২ বছর

আগের সংবাদ

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

পরের সংবাদ

বাঙালির ঠিকানা আওয়ামী লীগ

তানভীর ইমাম

সংসদ সদস্য, সিরাজগঞ্জ-৪

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২১ , ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৩, ২০২১ , ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

আজ ২৩ জুন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৩তম জন্মদিন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরনো ও বৃহত্তম দল। নানা উত্থান-পতন, সংঘাত ও সম্মিলনের মধ্য দিয়ে দলটির আজকের অবস্থান। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠার পর থেকে টানা ৭২ বছর বাংলাদেশের রাজনীতির অগ্রভাগে থেকে সব আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ। সহজ করে বললে আওয়ামী লীগের ইতিহাস-সংগ্রাম, সৃষ্টি, অর্জন ও উন্নয়নের। এই দল প্রতিষ্ঠার সময় সেসময়কার তরুণ নেতা শেখ মুজিব যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। শুরু থেকেই সারাদেশে নেতাকর্মীদের আস্থার প্রতীকে পরিণত হন শেখ মুজিব। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও মানবিক আচরণের কারণে তরুণ মুজিব দ্রুততম সময়ে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র কাণ্ডারি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে দলের সাধারণ সম্পাদক অসুস্থ হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমৃত্যু দেশসেবায় একনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশ যেমন বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের হাতে তৈরি, তেমনি আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশও বঙ্গবন্ধুকন্যা দলের বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনার অদম্য নেতৃত্বেই পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু যে দলের ভিত্তি দিয়েছেন, সেই দলকে বহন করে চলেছেন আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা। বহুবার ঘাতকের বুলেট-বোমার সামনে নিজের জীবনকে বিপন্ন করতে হয়েছে, তবুও দলের রক্ষাকবচ হয়ে থেকেছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, একটি আবেগের নাম। এই দলের সবাই মিলে একটি পরিবার। এ পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি গর্বিত। ৫০ বছরের বাংলাদেশে প্রায় ২১ বছর দেশশাসন করার সুযোগ পেয়েছে দলটি। এই ২১ বছর আওয়ামী শাসনামলের মধ্যে ১৭ বছর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগের পর প্রতিষ্ঠিত হয় ভারত ও পাকিস্তান। ভূখণ্ড বিবেচনায় আমরা পাকিস্তানে। আমাদের ঠিকানা হয় পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশ। শুরুতেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর চলে নানামুখী বৈষম্য। প্রথমে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হনে পাকিস্তানি শাসকরা। তাদের এই অপচেষ্টা রুখে দিতে আওয়ামী লীগের ব্যানারে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে শুরু থেকেই মাঠে নামেন তরুণ নেতা শেখ মুজিব। দেশভাগের আগে, প্রভাবশালী ছাত্রনেতা হিসেবে পুরো ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঢাকায় ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এরপরের বছরেই গঠিত হয় আওয়ামী লীগ। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার দায়ে সেসময় তাকে বন্দি করা হয়। আওয়ামী লীগ গঠনের ব্যাপারে দলের সিনিয়র নেতারা তার মতামত নেয়ার জন্য জেলেও বার্তাবাহক পাঠান। তিনি নিজে মূল দলে থাকার ব্যাপারে মত দেন। তারপর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকালে ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পেয়েই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব জেলায় কমিটি গঠন করার ব্যাপারে তৎপর হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন। সেবার যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নিয়ে এগিয়ে যান বঙ্গবন্ধু।
দলের অন্য সিনিয়র নেতাদের মতো ২১ দফা দাবি নিয়ে অধিক সোচ্চার ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যুক্তফ্রন্টের জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়। সে সময়ে, ৩০ মে ১৯৫৪ থেকে ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫৪ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর, কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিব দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব পেশ করলে, আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালের ৭-১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারিতে আওয়ামী লীগের তাপর্যপূর্ণ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে পাকিস্তান বিভক্তি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিশেষ ইঙ্গিত ছিল। একই বছর ৩০ মে দলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে একই ব্যক্তি একসঙ্গে সরকার ও সংগঠনের দুটো পদে থাকতে পারবেন না। শেখ মুজিব দলকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এখানে উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী মতবিরোধের কারণে ভাসানী ১৯৫৭ সালের ১৫ মার্চ আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাপ গঠন করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর, বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়, ৮ ডিসেম্বর ১৯৬১ পর্যন্ত। এ সময় সামরিক সরকার দেশে স্বাভাবিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি নিজ বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন বঙ্গবন্ধু। ওই সভায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি এবং সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় সংবলিত প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভায় মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর মাত্র ৫ বছরের মধ্যে, বঙ্গবন্ধুর গতিশীল নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। হাজার বছরের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে বাঙালি জাতি। আওয়ামী লীগের বয়স এখন ৭৩ বছর। রাষ্ট্রক্ষমতায় বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছর, শেখ হাসিনা ’৯৬-২০০১, ২০০৮-২০১৩, ২০১৪-২০১৮ এবং ২০১৮ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে মোট চারবার এবং টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছে জনগণ। সব মিলিয়ে প্রায় ২১ বছর। বাকি ৫২ বছরই দলটি রাজপথে। বাঙালির ঠিকানা, ভাত-কাপড় এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ২৬ বছর। এই দীর্ঘ সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুকে ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেলে কাটাতে হয়। দেশ-জনগণ-দলের জন্য এ ধরনের আত্মত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যার মাত্র সাড়ে ৩ বছর রাষ্ট্রক্ষমতা। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব এমনই ছিল যে, দলমত নির্বিশেষে সবাই তাকে সম্মান করত। পাক সরকার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনঘন মাঠে নেমেছিল ঊনসত্তরে। আর একাত্তরে বিশ্ববাসীও। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে জনগণের ভাত-কাপড়ের অধিকার নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হয়েছে ঘাতকের হাতে। শেখ হাসিনার সরাসরি কেন্দ্রীয় রাজনীতির সময়কাল প্রায় ৪০ বছর। রাষ্ট্রক্ষমতা ১৭ বছর আর রাজপথে ২৩ বছর। শেখ হাসিনা পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু খুনি-উত্তর বাংলাদেশ। তার সামনে একাত্তর ও পঁচাত্তরের ঘাতক সমন্বয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে বহুবার (যা এখনো অব্যাহত) কমপক্ষে দুবার সরাসরি রাষ্ট্রের মদতে ১৯৮৮ (এরশাদ) এবং ২০০৪ (বিএনপি-জামায়াত)। নানা সময়ে দলের প্রভাবশালী অনেকেই ছেড়ে গেছেন। কেউবা ফিরেছেন, কিন্তু দলটির সংগ্রামের ধারা ব্যাহত হয়নি। শেখ হাসিনা সেই ধারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন গভীর আগ্রহ এবং নিষ্ঠায়। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে প্রাধান্য ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন বিশ্বে আজ প্রশংসিত। অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন সবকিছুতেই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ’৭১-এর শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, অনেকের শাস্তি কার্যকর হয়েছে। বহুমুখী ষড়যন্ত্রের পরও নিজস্ব অর্থায়নে আজ পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেলসহ জনমুখী বহু প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। জনগণের দল আওয়ামী লীগের পতাকাতলেই শেখ হাসিনার এই পথচলা। অনেকেই ভেবেছিল ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্ম জনগণের অভিপ্রায়ে জনগণের জন্য। আসলে এই দেশে যা কিছু অর্জন ও প্রাপ্তি তার সব কৃতিত্বই আওয়ামী লীগের- যা কোনোভাবে মুছে ফেলা বা ধ্বংস করা যায় না। যে যাই বলুন না কেন- আওয়ামী লীগ যে সঠিক পথে আছে তার প্রমাণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ঘাতকের টার্গেট এখনো তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার দিকে। এই রাষ্ট্র যে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল তা কখনো অস্বীকার করা যাবে না। বাঙালির যা কিছু অর্জন এবং আগামী দিনের স্বপ্ন তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা কেবল আওয়ামী লীগেরই আছে। কেননা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। আওয়ামী ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন সত্তা। বলা যায়, বাঙালির ঠিকানা আওয়ামী লীগ। ৭৩ বছরের মঙ্গল ও প্রগতির আলোকবর্তিকা হাতে জনগণের নির্ভরতার আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

তানভীর ইমাম : সংসদ সদস্য, সিরাজগঞ্জ-৪।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়