উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে

আগের সংবাদ

বাঙালির ঠিকানা আওয়ামী লীগ

পরের সংবাদ

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ৭২ বছর

অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর

উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২১ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৩, ২০২১ , ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

আজ ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ দলটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত সবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতির ওপর অর্থনীতি, রাজনীতি, বাংলাভাষা, সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, নানা কালাকানুনের মাধ্যমে শোষণ, জুলুম, নির্যাতন আর নিপীড়ন চালাতে থাকে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অতি অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বর্তমান পাকিস্তান বহাল রেখে বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, জুলুম, নির্যাতন আর নিপীড়ন থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। তিনি আরো বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালি জাতি প্রকৃতপক্ষে এক ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে অন্য আরেক ঔপনিবেশিক শাসনের শিকার হচ্ছে।
এমন একটি পরিস্থিতিতে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরের বছরই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরের বছর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালির ঐক্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ। জাতির পিতার সুযোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হয় বাংলার জনগণের। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাত ধরেই বাঙালি জাতি ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা উপস্থাপন, ’৬৮-এর আগরতলা মামলা প্রতিহতকরণ, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ সব শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সফলতা লাভ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক, অবিস্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন। ইউনেস্কো এই ভাষণকে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’র অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতির পিতার সুযোগ্য নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১- এই ২৪ বছরের বঙ্গবন্ধু ১৪ বছরের বেশি সময় কারাগারে বন্দি ছিলেন।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু দ্রুত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন শুরু করেন এবং সফলভাবে অর্থনৈতিক এবং অর্থনীতির বাইরের উভয় খাতের গভীরে প্রথিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং আওয়ামী লীগের মাধ্যমে এদেশের প্রত্যেক মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বিদ্যুৎ, কৃষি ও সমবায়, শিল্প ও বিজ্ঞান, গৃহনির্মাণ, অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্প ব্যবস্থাপনা জাতীয়করণ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের আবিষ্কার বিশ্বে ডিজিটাল বিপ্লবে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি হয়ে উঠে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বঙ্গবন্ধু তাই ডিজিটাল বিপ্লবে শামিল হওয়ার দূরদর্শী চিন্তা থেকে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এজন্য প্রথমেই তিনি ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশকে আইটিইউর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। স্যাটেলাইট স্থাপন করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় তিনি দেশের প্রথম উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধু গৃহীত ও বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলোই ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল প্রেরণা। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার আধুনিক রূপ আজকের এই ডিজিটাল বাংলাদেশ।
সেই স্বপ্নের ঘোর কাটতে না কাটতেই বাঙালির জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংসতম ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী মহল সপরিবারে হত্যা করে আমাদের জাতির পিতাকে। সেদিন দেশের বাইরে থাকায় আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা।
স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে পুরো পরিবারকে হারিয়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১- এই ৬ বছর প্রবাসে নির্বাসিত ও কষ্টের জীবন কাটাতে হয় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার দেশে ফেরা ছিল নিষিদ্ধ। ১৯৮১ সালে ফেব্রুয়ারির ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। একই বছরের ১৭ মে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। দেশে ফেরার পর থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে নিরলসভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে দলকে সরকারে আনেন তিনি। দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
২০০৯ থেকে বর্তমান পর্যন্ত টানা এক যুগ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে প্রধানমন্ত্রী ও তার সুযোগ্য পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগে। এক মনে ও ধ্যানে পিতার অঙ্গীকার পূরণে নির্ভীক চিত্তে সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিকতা- এ তিনটি বিষয়ের ওপর গভীর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নীত করেছেন। উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পৌঁছানোর লক্ষ্যে তার প্রদত্ত ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এ বাংলাদেশকে আগামী ১০০ বছর পরে আমরা কেমন দেখতে চাই তার পরিকল্পনাও করে রেখেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। সেই লক্ষ্যে তিনি ভিশন ২১০০ ঘোষণা করেছেন এবং ২১০০ সালের মধ্যে এর ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বে পৌঁছানোর জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে রাষ্ট্রের জনগণকে মানুষ হিসেবে সম্মান দেয়া, দ্বিতীয়ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, তৃতীয়ত একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করা এবং সর্বক্ষেত্রে আইনের শাসনের প্রসার ঘটানো। এ বিষয়গুলো যদি বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা সহজ হবে। শিক্ষায় বর্তমানে যে বাজেট তা দিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার দিকে যাওয়া সহজ হবে না। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় যদি যেতে হয় তাহলে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ২০ শতাংশ অথবা ডিজিপির ৪ শতাংশ ব্যয় করতে হবে যা বঙ্গবন্ধু ’৭০-এর নির্বাচন পূর্ববর্তী ভাষণে বলেছিলেন। তাই আজকের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাছে আমাদের প্রত্যাশা সেই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ২০ শতাংশ যেন ব্যয় করা হয় এবং প্রযুক্তি শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হয়। কারণ প্রযুক্তি শিক্ষা এবং প্রযুক্তি পেশায় মানুষ ততদিন যাবে না যতদিন সমাজে সে মানুষ হিসেবে সম্মানিত না হবে।

অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়