দেশে অনুমোদিত কোভিড ভ্যাকসিনের ইতিবৃত্ত

আগের সংবাদ

জীবন-জীবিকাই যেখানে মুখ্য

পরের সংবাদ

মর্টগেজ ভাড়াটে

মযহারুল ইসলাম বাবলা

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২১ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২০, ২০২১ , ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

মর্টগেজ ভাড়াটে বা বন্ধকী ভাড়াটে নামক শব্দের সঙ্গে আমাদের পূর্বপরিচয় নিশ্চয় ছিল না। তাই শোনামাত্র চমকে উঠেছিলাম। এ আবার কেমনতর ভাড়াটে! যার নামের পূর্বে মর্টগেজ বা বন্ধকী শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের সনাতনী অভিজ্ঞতাটি হচ্ছে মাসিক ভাড়া প্রদান সাপেক্ষে মানুষ বাড়ি-ফ্ল্যাট ভাড়া করে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে থাকে। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা জামানত বাবদ অগ্রিম অর্থ বাড়ির মালিকদের প্রদানেরও বিধান রয়েছে। অগ্রিম অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে হেরফেরও হয়ে থাকে। কারো ক্ষেত্রে তিন মাসের ভাড়ার অগ্রিম, কারো ক্ষেত্রে দুই-এক মাসের। এটা তো সত্য, ঢাকা শহরের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিকদের চেয়ে ভাড়াটের সংখ্যাই অধিক। আমাদের বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটেদের স্থায়ী ব্যবস্থায় মর্টগেজ ভাড়াটে সম্পূর্ণ নতুন সংযোজন। না জানা অবধি আমিও অবাক বিস্ময়ে বিষয়টি বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হয়ে মর্টগেজ ভাড়াটে এবং বাড়িওয়ালা উভয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। জেনেছি চমকপ্রদ অভিনব এই ব্যবস্থাটির খবরাখবর।

ব্যবস্থাটি বিগত তিন-চার বছর ধরে পুরান ঢাকায় চালু হয়েছে এবং ক্রমেই এর বিস্তার দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের প্রায় শহরে বন্ধকী ভাড়াটের সন্ধান পাওয়া গেছে। পুঁজির শক্তি এবং পুঁজির ক্ষমতা এতে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। বাড়িওয়ালাদের অর্থের প্রয়োজন মেটাতেই মর্টগেজ ভাড়াটে ব্যবস্থাটি চালু হয়েছে। বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিকদের তিন বা পাঁচ লাখ টাকা একত্রে প্রদান করে মর্টগেজ ভাড়াটে বাড়ি বা ফ্ল্যাটে ওঠে। ব্যবহৃত গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির বিলই তারা কেবল পরিশোধ করে। মাসিক কোনো ভাড়া তাদের দিতে হয় না। এক সঙ্গে নগদ তিন-পাঁচ লাখ টাকা বাড়িওয়ালাকে প্রদানের কারণেই বিনা ভাড়ায় বসবাসের এমন চমকপ্রদ ব্যবস্থা। রীতিমতো দলিল-দস্তাবেজ করেই পরস্পর চুক্তিবদ্ধ হয়। তিন বা পাঁচ বছর মেয়াদে সাধারণত চুক্তি হয়ে থাকে। চুক্তির সময়সীমা অতিক্রমের পর বাড়িওয়ালাকে শুরুতে দেয়া তিন বা পাঁচ লাখ টাকা মর্টগেজ ভাড়াটেকে একত্রে ফেরত দিতে হয়। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদকাল পর্যন্ত মর্টগেজ ভাড়াটে বিনা ভাড়ায় থাকবে। কেবল গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির বিল পরিশোধ করবে। চুক্তির মেয়াদ শেষে লগ্নির পুরো টাকা একত্রে ফেরত নেবে। কোনো কারণে বাড়িওয়ালা অর্থ ফেরত দিতে অক্ষম হলে তাদের মধ্যে পুনরায় নতুন করে চুক্তিপত্র সম্পাদন করে আগের নিয়মেই ফ্ল্যাটে বা বাড়িতে বিনা ভাড়ায় বসবাস করতে পারবে।

ব্যবস্থাটি পুরান ঢাকা থেকে ক্রমেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরান ঢাকা থেকে ব্যবস্থাটি চালু হওয়ার কারণটিও জেনেছি। নগদ অর্থের তাগিদেই নিরুপায় পুরান ঢাকার বাড়ির অসহায় মালিকদের এমন চুক্তি করতে হয়। পুরান ঢাকার জায়গা বাড়েনি। কিন্তু বেড়েছে পরিবার। পৈতৃক সম্পত্তিতে অংশীদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারায় কারো মালিকানার জায়গার পরিমাণ আধা কাঠা থেকে সোয়া কাঠার ঊর্ধ্বে নয়। নগণ্য সংখ্যক আছে যাদের জমির পরিমাণ তিন-চার কাঠা। সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের জায়গার পরিমাণ আধা কাঠা থেকে সোয়া কাঠা হওয়ার কারণেই এই স্বল্প জায়গায় রাজউকের গৃহনির্মাণ অনুমোদন পাওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া রয়েছে সরু গলি-রাস্তার কারণে রাজউকের অনুমোদন না পাওয়ার পাকা ব্যবস্থা। রাজউকের অনুমোদন লাভের ক্ষেত্রে আরেক অন্তরায় বাড়ি নির্মাণে চারদিকে জায়গা ছেড়ে বাড়ি নির্মাণের শর্তারোপ, যা পুরান ঢাকার জমির মালিকদের ক্ষেত্রে পালন করা অসম্ভব। আধা কাঠা থেকে সোয়া কাঠা জমির চারদিকে জায়গা ছাড়লে তো বাড়ি নির্মাণের ন্যূনতম জায়গাও থাকে না। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বল্প জায়গার মালিকরা রাজউকের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে স্বউদ্যোগে জীবনের সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করে বাড়ি নির্মাণে হাত দেয়। রাজউকের অনুমোদন না থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গৃহনির্মাণ ঋণ সুবিধা পাওয়াও সম্ভব হয় না। বাড়ি নির্মাণে অর্থের ঘাটতিতে অসমাপ্ত নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে অগত্যা তাদের মর্টগেজ ভাড়াটেদের শরণাপন্ন হতে হয়। তিন-পাঁচ লাখ নগদ টাকা গ্রহণ করে মর্টগেজ ভাড়াটেদের ঘর-ফ্ল্যাট বিনা ভাড়ায় বসবাসের জন্য দিতে হয়। পুরান ঢাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বল্প জমির মালিকদের একই দশার কারণে মর্টগেজ ভাড়াটে ব্যবস্থাটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে চলেছে। খুব কম সংখ্যকই ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক অর্থের প্রয়োজন মেটাতে মর্টগেজ ভাড়া দিয়ে থাকে। একজন জানিয়েছে মেয়ের বিয়ের পণের অর্থ প্রদানের জন্য বাধ্য হয়ে নিজেদের দুই রুম মর্টগেজ ভাড়া দিয়ে ছাদে টিনশেডের ঘর তুলে নিজেরা বসবাস করছে। মর্টগেজ ভাড়াটেরাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে বাড়ির মালিকদের নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটানোর সুযোগটি তারা কাজে লাগিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। মানি মেকস মানি অর্থাৎ টাকাই টাকা তৈরি করে। ব্যাংকের সুদও এত অধিক নয়। ব্যবসায় বিনিয়োগে নানা ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেই। নিরাপদ লাভজনক বিনিয়োগ মনে করে তারা মর্টগেজ ভাড়া নেয়াকে।

সাধারণত ভাড়াটেদের ওপর বাড়িওয়ালাদের স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ আছে। তবে মর্টগেজ ভাড়াটেদের তেমন কোনো অভিযোগ নেই বরং তারা অধিক সমীহ ও মর্যাদা বাড়িওয়ালাদের থেকে পেয়ে থাকেন। বাড়িওয়ালাদের আর্থিক দুরবস্থার এই সুযোগ নেয়া নৈতিক কিনা! জানতে চাইলে বলেন, ‘একজন নিরুপায় বাড়ির মালিককে অর্থ দিয়ে উপকার করেছি। বিনিময়ে নিজেরাও লাভবান হচ্ছি। এখানে অনৈতিক কিছু নেই। বরং আমরা অর্থ না দিলে তাদের পক্ষে বাড়ি নির্মাণের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভবপর ছিল না। আর তারা মাথা কুটলেও রাজউকের অনুমোদন না থাকার কারণে আর্থিক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে একটি টাকাও ঋণ পাবে না। নিজেরা লাভবান হচ্ছি সত্য, তাই বলে বাড়ির মালিকও যে লাভবান হচ্ছে না, তাও অসত্য নয়।’

বর্তমান বৃহৎ ঢাকার মূল সীমানার মধ্যে পুরান ঢাকা যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত পুরান ঢাকাকে আধুনিক ঢাকার অংশ করার নেই সরকারি কোনো উদ্যোগ। মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গার মতোই পুরান ঢাকা একুশ শতকের রাজধানী ঢাকার মাঝে জরাজীর্ণ তৃতীয় শ্রেণির অমর্যাদার এক জনাকীর্ণ জনপদ। পুরান ঢাকার ব্যাপারে রাষ্ট্রের কর্তারা আগাগোড়াই নির্লিপ্ত ও উদাসীন। অপ্রশস্ত রাস্তার অজুহাতে রাজউক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় না। তাই গৃহঋণ সুবিধাবঞ্চিত পুরান ঢাকার মানুষ বাধ্য হয়েই ইচ্ছানুযায়ী অননুমোদিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণের সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছে। নতুন ও পুরান ঢাকার ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাস্তবতার নিরিখে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা থাকা উচিত বলে মনে করি।

পুরান ঢাকা কালের ঐতিহ্য নিয়ে কেবল নয়, আধুনিক ঢাকার নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়েও জীবন্ত থাকার দাবি রাখে। বিশ্বের সব দেশের রাজধানীতে এবং শহরে পুরান ও নতুন অঞ্চল পাশাপাশি রয়েছে, তবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য নেই। অথচ নতুন ও পুরান ঢাকার সব ধরনের নাগরিক অধিকার ও সুযোগ স্বর্গ-মর্ত্যরে ব্যবধানসম। সব ধরনের রাষ্ট্রীয় কর-রাজস্ব প্রদানের পরও পুরান ঢাকার ভঙ্গুর সড়ক-জীর্ণ ব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে অপরিবর্তিত। পুরান ঢাকার প্রতি রাষ্ট্র ও সরকারের সীমাহীন অবহেলা-উদাসীনতা চরমভাবে দৃশ্যমান। আমরা চাই নতুন ও পুরান এই ঢাকা শহরের মধ্যে নানান ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও নাগরিক অধিকার, সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সব বৈষম্য নিরসন হোক। সব প্রকার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-অধিকার পুরান ঢাকার জন্যও সমানভাবে নিশ্চিত করা হোক।

দেশজুড়ে সর্বত্র চলছে পুঁজির অসীম দৌরাত্ম্য। পুঁজির নীরব শোষণও। পুঁজির শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র ক্রমেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তার করে চলেছে। মর্টগেজ ভাড়াটে ব্যবস্থা সেটাও পুঁজিতান্ত্রিকতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। পুঁজির শোষণের অবিচ্ছেদ্য অংশও। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হয়তো নেই। বিকল্প ব্যবস্থা না আসা পর্যন্ত হরেক ক্ষেত্রে পুঁজির নতুন নতুন দৌরাত্ম্য আমাদের দেখতে হবে এবং ভুগতেও হবে।

বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আমাদের জন্য নিকট ভবিষ্যতে আরো ভয়ানক অর্থনৈতিক শোষণ অপেক্ষা করছে। গণশত্রু এই হীন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এখনই প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হলে; আমাদের আরো চরম মাশুল দিতে হবে। সংগঠিতভাবে যদি বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হই, তাহলে আগত ভবিষ্যতে আরো চরম দুর্ভোগ-দুর্গতির কবলে পড়তে হবে। তাই পুঁজিবাদী এই হীন ব্যবস্থা প্রতিরোধে এখনই সংগঠিত হওয়া সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। এবং সেটা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়