লকডাউনে বাতিল হলো রাজশাহীগামী সব ট্রেন ও সাগরদাড়ি এক্সপ্রেস

আগের সংবাদ

ঢাকার পার্শ্ববর্তী ৭ জেলায় ৩০ জুন পর্যন্ত কঠোর লকডাউন

পরের সংবাদ

চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির পরিকল্পনা করা হয় যেভাবে

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২১ , ৩:৩৩ অপরাহ্ণ আপডেট: জুন ২১, ২০২১ , ৩:৫১ অপরাহ্ণ

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার চুরি করার চেষ্টা চালায় উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা। দীর্ঘ সময় নিয়ে তারা পরিকল্পনাটি করেছিল এবং পুরো প্রক্রিয়াটিকে তারা এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে নির্বিঘ্নে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া যায়। তবে, ছোট কিছু ভুলের কারণে বাইবেলের চরিত্র ল্যাজারাসের সঙ্গে মিলিয়ে নাম দেওয়া ‘ল্যাজারাস হাইস্ট’টি সম্পূর্ণরূপে সফল হয়নি। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ বিলিয়ন ডলার ২০১৬ সালে চুরির পরিকল্পনা করে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা। যদিও তারা মাত্র ৮১ মিলিয়ন ডলার সরাতে সক্ষম হয়। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র এবং বিচ্ছিন্ন দেশটি কীভাবে এলিট সাইবার ক্রিমিনাল টিম তৈরি করল সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে হয়েছিল এ ঘটনা, এ নিয়ে তদন্তে নানা বিষয় উঠে আসে।

ঘটনার শুরু একটা প্রিন্টারের ত্রুটি থেকে। সেই সময় এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে তেমন কিছুই মনে হয়নি। বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবেই ভেবে নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু এটি সাধারণ কোনো প্রিন্টার ছিল না। যে প্রতিষ্ঠানের প্রিন্টার এটি, সেটিও সাধারণ কোনো ব্যাংক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক হলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এ ব্যাংকের কাঁধে এমন একটি দেশের মূল্যবান মুদ্রার মজুদ তদারকির দায়িত্ব, যেখানে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের বাস। সেখানে রিজার্ভ চুরিতে একটি প্রিন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের ১০ তলার অত্যন্ত সুরক্ষিত জায়গায় ছিল। কোটি কোটি ডলারের ট্রান্সফার ব্যাংকের বাইরে ও ভেতরে প্রবাহিত হওয়ার রেকর্ড ছাপানো হতো এটি দিয়ে।

যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে দেখলেন প্রিন্টার কাজ করছে না, তখন তারা ভেবেছিলেন এটি সাধারণ ঘটনা। প্রিন্টারের সমস্যার বিষয়ে ডেপুটি ম্যানেজার জুবায়ের বিন হুদা পুলিশকে বলেছিলেন-অন্যান্য দিনের মতো এদিনও প্রিন্টার সমস্যা করছে, আমরা এমনটি ধারণা করেছিলাম। কারণ প্রিন্টারে সমস্যা আগেও হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক যে বড় ধরনের বিপদে পড়তে যাচ্ছে, এটি ছিল তার প্রথম ইঙ্গিত। এরপর হ্যাকাররা ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয় এবং সাইবার হামলা চালাতে থাকে। তাদের লক্ষ্য ছিল-১ বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেওয়া। অর্থ সরানোর জন্য তারা ফেক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ক্যাসিনো, দাতব্য সংস্থা এবং বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। তদন্তকারীদের তদন্তে ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলো কেবল একদিকে নির্দেশ করেছে, তা হলো- উত্তর কোরিয়া সরকার। ১০ পর্বের নতুন প্রতিবেদন রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির দুর্ধর্ষ কাহিনী।

বিবিসি অনুসন্ধানী প্রত্রিবেদনে জানা যায়, ব্যাংকের কর্মীরা যখন প্রিন্টারটি পুনরায় চালু করেন, তখন তারা কিছু উদ্বেগজনক বিষয় লক্ষ করেন। তারা বুঝতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে জরুরি বার্তা গেছে সেখান থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড় করতে ফেডারেল রির্জাভের কাছে নির্দেশনা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দ্রুত যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে বাংলাদেশের লোকাল টাইম এবং যুক্তরাষ্ট্রের লোকাল টাইম। হ্যাকাররা ঘটনা ঘটায় মূলত বাংলাদেশ সময় রাত আটটায়, সে সময় ছিল নিউইয়র্কে সকাল। অর্থাৎ বাংলাদেশে ব্যাংকিং কার্যক্রম তখন বন্ধ, তবে যুক্তরাষ্ট্রে সকাল হওয়ায় তখনো সেখানে ব্যাংকিং কার্যক্রম চলছে। এদিকে পরিদিন মানে শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি শুরু। আবার বাংলাদেশে যখন এতবড় হ্যাকিংয়ের তথ্য উদ্ঘাটন হয় সেদিন শনিবার রাত। পরদিন আবার যুক্তরাষ্ট্র সাপ্তাহিক ছুটি।

এখানে হ্যাকাররা আরও একটি বুদ্ধি খাটায়। একবার যখন তারা ফেড থেকে অর্থ স্থানান্তর করতে পারে, তখন তাদের এটি অন্য কোথাও পাঠানোর প্রয়োজন ছিল। তারা এই জায়গা হিসেবে ফিলিপাইনের ম্যানিলাকে বেছে নেয়। কারণ ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছিল লুনার ইয়ারের প্রথম দিন। এশিয়ায় ছুটির দিন। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের ছুটি ও সময়ের ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে পাঁচটা দিন হাতে পেয়েছিল হ্যাকাররা। ধারণা করা হয়, কয়েক বছর ধরে এ হ্যাকিংয়ের পরিকল্পনা করেছিল ‘লাজারাস গ্রুপ’। যে পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেম নিয়ন্ত্রণে নেয় ‘লাজারাস গ্রুপ’ ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মচারীর কাছে একটি সিভি ইমেল করা হয়েছিল। ওই সিভিতে চাকরিপ্রার্থী তার নাম রাসেল আহলাম বলে অভিহিত করেন। সেই সঙ্গে ইমেইলে অনুরোধ ছিল যাতে তার সিভি এবং কভার লেটার ডাউনলোড করে যেন পড়া হয়। এফবিআইয়ের তদন্তকারীদের মতে এ রাসেলের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এটি একটি কেবল নাম, যা ব্যবহার করে সেই লাজারাস গ্রুপ ইমেইল করেছিল। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মী কৌতুহলবসত ডাউনলোড করে পড়েছিলেন। ফলে ওই সিভির ভিতরে ভাইরাস দ্বারা বাংলাদেশ ব্যাংকের পিসি আক্রান্ত হয়। এরপরই ব্যাংকের সিস্টেমে লাজারাস গ্রুপ গোপনে কম্পিউটার থেকে কম্পিউটারে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল ভল্ট যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেখেছিল তার দিকে কাজ শুরু করে দেয়। পুরো এক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে অবস্থান করে দুর্ধর্ষ এ হ্যাকিংয়ের পরিকল্পনা করে।

আসলে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সমস্যায় জর্জরিত, সেটিই যেন প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল এ চুরির মাধ্যমে। বিবিসি জানায়, হ্যাকাররা এর কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছিল। এটি ছিল এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী সাইবার হামলা ছিল। হ্যাকারদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি ডলার চুরি করা। অর্থ সরাতে হ্যাকাররা নকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, দাতব্য সংস্থা, ক্যাসিনোসহ বিস্তৃত নেটওয়ার্ক যে ব্যবহার করেছিল।

অভিযুক্ত হ্যাকার পার্ক জিন হিয়ক। এ ঘটনায় আরও দুজন হ্যাকারের নাম উঠে আসে তদন্তে। তারা হলেন কিম ইল ও জন চ্যাং হিয়ক। ছবি: ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট

ভয়ংকর এ হ্যাকার কারা
বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, এ অর্থ চুরির বিষয়ে তদন্তকারীদের তদন্তে ডিজিটাল যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়, তাতে এটাই স্পষ্ট- উত্তর কোরিয়া সরকারের পুরো মদদেই এ ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের বরাতে বিবিসি জানায়, এমন একটি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটানোর জন্য অনেকদিন ধরে সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে এগিয়েছে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা। উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের এ গ্রুপ লাজারাস নামে পরিচিত বিশ্ব হ্যাকিংয়ের গ্রুপের কাছে। এ গ্রুপ সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। এদিকে এফবিআই এক সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি অঙ্কন করেছে, তার নাম পার্ক জিন হিয়ক, তবে ওই ব্যক্তি পাক জিন-হেক এবং পার্ক কোয়াং-জিন নামেও কাজ করেন। তিনি ল্যাজারাস গ্রুপের অন্যতম সদস্য। এছাড়া এ ঘটনায় আরও দুজন হ্যাকারের নাম উঠে আসে তদন্তে। তারা হলেন কিম ইল ও জন চ্যাং হিয়ক।

কে এই পার্ক জিন হিয়ক
পার্ক জিন হিয়ক একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার। উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি থেকে স্নাতক করেছেন তিনি। এর পর চীনের বন্দর দালিয়ান শহরে উত্তর কোরিয়ার একটি সংস্থা চোসুন এক্সপোতে কাজ করতেন। এ সংস্থা অনলাইন গেমিং ও জুয়ার প্রোগ্রাম তৈরি করে। এফবিআই বিবিসিকে জানিয়েছে, পার্ক জিন হিয়ক হলেন দিনের আলোতে একজন সহজ সরল কম্পিউটার প্রোগ্রামার আর রাতের অন্ধকারে দুর্ধর্ষ হ্যাকিং তার পেশা। পার্ক জিন হিয়ক হলেন উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার তরুণের মধ্যে এমন একজন, যাকে ছোটবেলা থেকেই সাইবারযোদ্ধা বানানোর জন্য তৈরি করা হয়।

আর-এমএস/এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়