মুজিবের কৌশল

আগের সংবাদ

নরসিংদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের নিহত ৫, আহত ৭

পরের সংবাদ

টেকসই পুঁজিবাজারের তাগিদ

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২১ , ৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২০, ২০২১ , ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ

সুশাসনে নজর: বিএসইসি চেয়ারম্যান, অতিমূল্যায়িত হচ্ছে কিছু কোম্পানির শেয়ার।

ভালোই চলছে দেশের পুঁজিবাজার। প্রতিদিনই নিত্যনতুন রেকর্ড গড়ছে লেনদেন ও সূচক। কিন্তু কতটা টেকসই হয় বাজারের এই অবস্থা- তা নিয়ে শঙ্কিত অনেকেই। কারণ করোনাকালে ব্যবসা না বাড়লেও বিমা কোম্পানির শেয়ার দরে টানা উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। বছরের পর বছর লোকসানে থাকা বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার দরও বাড়ছে। এমনকি উৎপাদনে না থাকলেও দর বাড়ছে- এমন কোম্পানিও রয়েছে পুঁজিবাজারে। অন্যদিকে ‘ব্লুচিপ’ হিসেবে পরিচিত ভালো মৌলভিত্তির বেশ কিছু শেয়ারের দর অবমূল্যায়িত হয়ে আছে দীর্ঘদিন। তাই কেউ কেউ ‘সিঁদুরে কালো মেঘ’ দেখছেন। তবে অধ্যাপক শিবলী রুবায়েত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশনের তদারকিতেও আস্থা রাখছেন অনেকেই। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজারের এই উত্থানকে টেকসই করার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ইস্যুর ক্ষেত্রে কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা থেকে শুরু করে কোম্পানির অডিট এন্ড অ্যাকাউন্টস, সুশাসন সব কিছুই দেখা হচ্ছে। আগের মতো কাগুজে কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারছে না। এছাড়া যারাই অনিয়ম করার চেষ্টা করছে তাদের কড়া শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। সর্বোপুরি পুঁজিবাজারের সুশাসনের বিষয়ে বেশি নজর দেয়া হচ্ছে। যার কারণে বহুদিন পর কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে বাজার। তবে এই বাজারকে টেকসই করতে আরো যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তা অবশ্যই নিতে হবে। মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে যাতে আইন সবার জন্য সমান হয়, সেবিষয়ে খেয়াল রাখারও তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত স্বল্প মূলধনী একটি বিমা কোম্পানি হলো প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স। আহামরি কোনে ব্যবসা না হলেও প্রায় প্রতিদিনই এই কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ছে। এক

বছর আগে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ১৯.৪ টাকা। আর গত বৃহস্পতিবার প্রতিটি শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৮৯ দশমিক ২০ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে সাড়ে আটশ শতাংশেরও বেশি। যদিও কোম্পানিটির শেয়ার দর এত বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। শুধু প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স নয়, এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে সাড়ে ছয়শ শতাংশ।

করোনা মহামারির মধ্যেই এক বছরের ব্যবধানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও ফান্ডগুলোর মধ্যে ৭০টির শেয়ার দর বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। আর ৫০ শতাংশের বেশি দর বেড়েছে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে বিমা খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে উল্লম্ফন ছিল সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি উৎপাদন বন্ধ থাকা, লোকসানি কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরও ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

১০০ শতাংশের বেশি দর বাড়া শীর্ষে থাকা ৫০টি কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- পাইনিওর ইন্স্যুরেন্স, বিডি ফাইন্যান্স, ঢাকা ডাইং, গেøাবাল ইন্স্যুরেন্স, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইন্স্যুরেন্স, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ন্যাশনাল ফিড, নর্দান ইন্স্যুরেন্স, প্রিমিয়ার ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স, ম্যাকসন স্পিনিং, পিপলস ইন্স্যুরেন্স, অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স, শাইনপুকুর সিরামিক, রূপালি ইন্স্যুরেন্স, প্রগতী ইন্স্যুরেন্স, ইসলামিক ইন্স্যুরেন্স, ফনিক্স ইন্স্যুরেন্স, সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, জনতা ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন ইন্স্যুরেন্স, জিল বাংলা সুগার, ডেল্টা স্পিনিং, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স, কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্স, নিটল ইন্স্যুরেন্স, আরডি ফুড, বেক্সিমকো ফার্মা, জিবিবি পাওয়ার, আরামিট সিমেন্ট, বিডি থাই, কাট্টালি টেক্সটাইল, বিজিআইসি, মুজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং, বে-লিজিং, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, সন্ধানী ইন্স্যুরেন্স, কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্স, কেয়া কসমেটিকস ও আমান কটন ফেব্রিকস লিমিটেড।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারের স্বাভাবিক উত্থান বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই ২০ টাকার শেয়ারের দাম ২০০ টাকা হওয়ায় বাজারের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অশনি সংকেত দিচ্ছে। এখনই পদক্ষেপ না নিতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বেন বিনিয়োগকারীরা। আর ‘বড় দান মেরে’ কেটে পড়বে কারসাজি চক্র।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে আইটেম দেয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে কয়েকটি চক্র। এই চক্রের কবল থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রক্ষায় মাঠে নেমেছে বিএসইসি। কমিশনের একটি টিম চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সময়ে পুঁজিবাজার নিয়ে পরিচালিত ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপগুলো খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক পেইজ ও তিন শতাধিক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পেইজগুলোকে আইনের আওতায় আনতে বিটিআরসিকে পর্যায়ক্রমে চিঠি দিচ্ছে কমিশন। এর আগে পুঁজিবাজারে গুজব সৃষ্টিকারী চক্র ধরতে গত ২৪ মে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে বিএসইসি। বিএসইসির পরিচালক রাজিব আহমেদের নেতৃত্বে কমিটির রয়েছেন সিডিবিএলের এপ্লিকেশন সাপোর্ট বিভাগের প্রধান মো. মঈনুল হক, ডিএসইর সিস্টেম এন্ড মার্কেট অ্যাডমিন বিভাগের প্রধান আবু নূর মুহাম্মদ হাসানুল করিম ও ডিএসইর সার্ভেইল্যান্স বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার মো. মাহফুজুর রহমান। তদন্ত কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

টেকসই পুঁজিবাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স ইন্ড্রাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান ভোরের কাগজকে বলেন, বর্তমান কমিশনের কিছু ইনোভেটিভ আইডিয়ার কারণে বাজার ভালো করছে। মনিটরিং এন্ড কম্পøায়েন্সে জোর দেয়া হয়েছে। কোনো আগাম খবর ছাড়াই সিকিউরিটিজ হাউসে গিয়ে তথ্য নেয়া হচ্ছে। এটা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এই আইন যেন সবার জন্য সমান হয়। তাহলে বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরালে বাজার টেকসই হবে বলেও মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা। তিনি আরো বলেন, আগামী জুলাই থেকে পুঁজিবাজারের বাইরের কোম্পানিগুলো ৩০ শতাংশ করে করপোরেট ট্যাক্স দেবে। আর পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে দিতে হবে সাড়ে ২২ শতাংশ। এই করপোরেট করহারের ব্যবধান অন্তত ১০ শতাংশ করা উচিত। তাহলে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে আগ্রহী হবে। এছাড়া বাজারে তালিকাভুক্তি শর্ত আরো সহজ করা উচিত। তাহলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে চাপও কমবে আমরা পাবলিক কোম্পানি হিসেবে এসে মূলধনও সংগ্রহ করতে পারব।

ডিএসই ব্রোকারেজ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (?ডিবিএ) সাবেক সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট হয়েছে কোম্পানির বাজেট। এবার করপোরেট কমানো হয়েছে। কোম্পানি যত ভালো করবে, বাজার তত ভালো করবে। এছাড়া ব্যাংকের ইন্টারেস্ট অনেক কম, যার কারণে পুঁজিবাজার ভালো আছে। তবে ভবিষ্যতে যদি ব্যাংকের সুদের হার বেশি হয়, তাহলে বাজারে এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজার বড় হচ্ছে। তবে পুঁজিবাজারকে ভালো এবং টেকসই করতে হলে সুশাসনে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা এই বিষয়টাকে প্রধান্য দিয়ে কাজ করছি। যদি কোম্পানিগুলো ভালো না করে তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে কীভাবে প্রতিযোগিতা করবে। আমাদের পুঁজিবাজারে উৎপাদনশীল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে। তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অডিট এন্ড অ্যাকাউন্টস থেকে শুরু করে কোম্পানির গুড গর্ভনেন্সে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আর যেসব কোম্পানির হিসাব বা তথ্যে গরমিল রয়েছে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে এসেছি। যার প্রভাব পড়েছে বর্তমান পুঁজিবাজারে।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়