ভ্যাট আদায়ে জটিলতা দূর করুন

আগের সংবাদ

‘সুন্দরবন’ ও ‘পদ্মা’য় পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম যাচ্ছে

পরের সংবাদ

‘গার্ড অব অনার’ রাষ্ট্রীয় রীতি, ধর্মীয় নয়

স্বপ্না রেজা

কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

প্রকাশিত: জুন ১৯, ২০২১ , ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৯, ২০২১ , ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ

ইতোপূর্বে এমন একটি আওয়াজ উঠেছিল- নারীর পিরিয়ড বা মাসিক হয় তাই সে বিবাহ পড়াতে পারবেন না। কাজি হতে পারবেন না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল মসজিদে বিয়ে পড়ানো হয়। মসজিদে নারীর প্রবেশ এই মাসিক বা পিরিয়ডের কারণে বারণ ধর্মীয় দৃষ্টিতে। পবিত্রতা ও অপবিত্রতার বিষয়কে দৃশ্যমান করা হয়েছে। মাসিক বা পিরিয়ড যে একজন নারীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য যা মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখে, রাখছে তা বিশ্বাস করবার ও বুঝবার ন্যূনতম শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের হয়নি। মাসিক বা পিরিয়ডের সময়কে নারীর জন্য একটি লজ্জাকর ও অপবিত্রতার সময় এমন মনোভাব পোষণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থারই চপেটাঘাত, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। মাসিক নারীর কাল নয়, বরং অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যিনি বা যারা নারীর পিরিয়ডকে লজ্জা বা অপবিত্রতার মোড়কে উপস্থাপন করেছেন, করছেন সেইসব পুরুষ যে এই রক্তদলা থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, বেমালুম ভুলে গিয়েছেন এবং যাচ্ছেন। এই আধুনিক যুগে, উন্নয়নের শিখরে উঠে নারীকে সেই সত্যই প্রমাণ করে চলতে হচ্ছে প্রতিনিয়তই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এমন একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন একজন নারী, যার স্বপ্ন ছিল বিবাহ ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার। তিনি আদালত পর্যন্ত গিয়েছেন। জানি না সেই ঘটনার পরবর্তী ফলাফল কী। তার সাংবিধানিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত হয়েছে। আদৌ হয়েছে কিনা। হলে নিশ্চয়ই জানা সম্ভব হতো। কারণ এটা হতো নারীর প্রতি বিশাল এক প্রতিবন্ধকতার বিজয়। নারীরা যে কতভাবে, কত কৌশলে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত তা যেন এক একটা ঘটনায় বের হয়ে আসে বছর বছর ঘুরে।
৫০ বছর বাংলাদেশের। জন্মশতবার্ষিকী মহান নেতা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। যাঁর ডাকে, আহ্বানে নিরস্ত্র বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে মাত্র ৯ মাসে। মুক্তির চেতনা এতটাই প্রবল, দুর্বার ছিল যে, পাকছাড়া হয়েছিল এ মাটি। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে এসেছিল বাঙালিরা। আজ স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরেও যে প্রশ্নটা ঘুরেফিরে জাগে যে, সত্যিই কী পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়েছিল। উত্তরটা যদি এভাবে দেয়া হয় যে, মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন ও সব অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কেবল বাঙালি পুরুষদের, নারীদের হয়নি তাহলে কী অযৌক্তিক কিছু বলা হবে? বোধহয় না। এমন বোধের সমর্থনে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা রয়েছে। লেখার শুরুতে উল্লিখিত ঘটনা সব নারীর সব বিষয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়াকেই ইঙ্গিত করে।
সম্প্রতি সংসদে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কোনো নারী কর্মকর্তাকে না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। ধর্মের অজুহাত দেখানো হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এমন একটি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির থেকে প্রস্তাবটা উঠেছে যে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের মাঝে অবস্থান করে। ফলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে নড়েচড়ে বসতে হয়েছে। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই প্রস্তাব তোলা হয়েছে যা নারীর প্রতি প্রচণ্ড রকম অবমাননা এবং সরকারের নীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানকে অগ্রাহ্য করবার ধৃষ্টতা প্রদর্শিত হয়েছে যা সাংসদরা করতে পারেন কিনা ভেবে দেখা দরকার। জানি না যারা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অধিষ্ঠিত হন, তাদের কেউ কেউ কতটা সংবিধান বুঝেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হন। আদৌ জানেন কি না যে, সাংসদের কাজ কী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীইবা তারা কতটুকু। বর্তমান সরকারপ্রধান যেখানে ধর্মের নামে ও সামাজিকতার কথায় নারীকে পশ্চাৎপদ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সবসময়ই সোচ্চার এবং যেখানে সরকারপ্রধান বলেন যে, আমাদের এই সমাজকে যদি আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, ঠিক এমন এক অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার ব্যবস্থায় নারী কর্মকর্তার উপস্থিতির ক্ষেত্রে আপত্তি সুপারিশ আকারে উঠে কী করে! তবে কী আমাদের বুঝতে হবে যে, মাননীয় সরকারপ্রধানের চিন্তা, চেতনাকে এ জাতীয় সাংসদরা বুঝতে পারেন না? আমরা তো গর্ব করে বলি যে, মাননীয় সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার কারণেই আজ প্রশাসনের বেশকিছু জায়গাজুড়ে নারী প্রশাসক তাদের কর্মদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। সফলতার সঙ্গে তারা কাজ করছেন। সেখানে ধর্মের অজুহাতে নারীকে পেছনে টেনে আনবার পাঁয়তারা কেন! আর গার্ড অব অনার একটি রাষ্ট্রীয় রীতি, ধর্মীয় তো নয়, তাহলে? আবার ইউএনও, ডিসি তো কোনো ব্যক্তি নন, সরকারের এক একটি প্রতিষ্ঠানের, তাহলে?
অবাক হতে হয় যখন দেখি এমন একটি প্রস্তাবে অন্য সাংসদরা, পুরুষ কিংবা নারী কেউই আপত্তি তুলেননি। এই সুপারিশ বা প্রস্তাবে যে নারীকে অবমাননা করা হয়েছে, সংবিধানের বিরোধিতা করা হয়েছে তা তারা মহান সংসদে বসে আদৌ বুঝতে সক্ষম হননি। একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা সম্ভব হলো যে, এই কমিটির সভাপতি যিনি একসময় মন্ত্রী ছিলেন এবং নিরাপদ সড়ক ইস্যুতে যথেষ্ট বিতর্কিত হয়ে উঠেছিলেন, তিনি বলেছেন যে, গার্ড অব অনার দেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা সম্মান জানিয়ে থাকেন। জানাজার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির একটা বিষয় আছে। নারীদের জানাজায় অংশ নেয়াও নিষেধ, এ রকম একটি ধর্মীয় বিষয়ও আছে। সেই জায়গা থেকে চিন্তা করে নারী কর্মকর্তাদের গার্ড অব অনার ব্যবস্থায় না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। সভাপতির কথা শুনে নতুন করে বাকরুদ্ধ হইনি। কারণ তিনি ইতোপূর্বে অনেক বিস্ময়কর কথা বলে বিতর্কিত হয়েছেন। জনগণ তার কথায় কষ্ট পাওয়ার ইতিহাস আছে।
যাই হোক, এমন একটি ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন মুক্তিযোদ্ধা মন্তব্য করেছেন যে, কোনোদিন না মুক্তিযুদ্ধকে কেউ ধর্মযুদ্ধ বলার প্রস্তাব উত্থাপন করে বসেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঘাটতি বা অভাব পরিস্থিতিকে সেই দিকে নিয়ে যাচ্ছে কি না ভাবতে হবে। আর মৃক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনিও মনে করেন এই সুপারিশ প্রাসঙ্গিক নয়। কেউই প্রস্তাব করতেই পারে। যদি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব আসে, তাহলে তারা সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর এমন প্রতিক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের প্রতি আপসহীন শ্রদ্ধাবোধ দৃশ্যমান হয় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান পরিপন্থি এমন প্রস্তাবকে মন্ত্রী যদি গোড়াতেই নির্মূল করতেন, সংসদে উপস্থাপন হতে না দিতেন, তাহলে আশ^স্ত হতাম, স্বস্তি পেতাম এই ভেবে যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষিত হচ্ছে, সংবিধান অর্থবহভাবে কার্যকর হয়ে উঠছে। বুঝতাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধান ও নারীর মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করবার অধিকার রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি, দেয় না। মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখা যায়, চাইলে কী কেউ এমন প্রস্তাব করতে পারেন, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যায় না, সংবিধানকে সমর্থন করে না এবং নারীকে অবমূল্যায়ন করে, নারীর মর্যাদা নষ্ট করে? নিশ্চয়ই না। রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়, সংবিধানবিরোধী হয়, এমন কাজ ও চিন্তা নিশ্চয়ই রাষ্ট্র কামনা করে না। করবে না। ভাবুন তো একজন সাংসদের চিন্তা, চেতনা যদি বাংলাদেশের সংবিধানসম্মত না হয়, তাহলে দেশ সুরক্ষিত হবে কীভাবে? আর জনগণ কোন আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে? প্লিজ ভাবুন!

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়