সংগ্রামের সারথি

আগের সংবাদ

রাজনীতি আর সংস্কৃতির মিশেল এক সাংবাদিকতার উপাখ্যান

পরের সংবাদ

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক মূর্ত প্রতীক

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২১ , ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৮, ২০২১ , ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে আমার বয়সের অনেক ফারাক। দেখা-সাক্ষাৎও হতো না খুব একটা। আমার নিজের একটা ছোট্ট, বলা চলে, একেবারেই অতিসাধারণ বলয় আছে, সেখানেই আমি নিজের মতো করে থাকি। রাষ্ট্রের কাছে, ক্ষমতাধরদের কাছে, নিজের জন্য তেমন প্রত্যাশা নেই; যদি থাকে তা এতটুকুনই যে তারা যেন গণতান্ত্রিক হন, সুবিবেচক হন, তারা যেন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হন, গণমানুষের মঙ্গল সম্পাদন করেন।

দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বেদনাদায়ক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেককাল সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, যে বাংলাদেশ লাখো শহীদের রক্তের দামে কেনা, সেই বাংলাদেশকে পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক ও আধা-সামরিক শাসকরা ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিপথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে, যা লাখো শহীদের রক্তের সঙ্গে বিশ^াসঘাতকতা। এরপরও বলি, লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা যে একেবারেই হতো না তাও সত্যি নয়। দেখা হতো কখনো কোনো আলোচনা সভায়, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিকাশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কোনো অনুষ্ঠানে। মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতার ওপর আমার একটি গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানে মন খুলে অনেক কথাই বলেছিলেন তিনি।

মনে পড়ে, ২০০১ সালে লোহানী ভাই, আমি এবং আরো কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মিলে মুক্তিযুদ্ধের পর আগরতলায় প্রথমবারের মতো আয়োজন করেছিলাম ‘মুক্তিযুদ্ধ উৎসব’। সে ছিল এক ঐতিহাসিক মিলনমেলা দুই ভূখণ্ডের মানুষদের। ত্রিপুরার সরকার এবং গণমানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ, আবারো নতুন করে ১৯৭১ সালের পর।

আমি জানি, লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ থাক না থাক আমার মনের দেখা-সাক্ষাৎ ছিল। এই মানুষটির প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। তিনি বিদায় নিলেন সাতাশি বছরে। কিন্তু শারীরিক সংকটের পরও আমৃত্যু তিনি ছিলেন কর্ম ও মননে তরুণ, যে তারুণ্য কামাল লোহানীর প্রজন্মের বেশির ভাগই পাননি। কাশফুলের মতো সাদা চুল। তার এই সাদা চুল যে কবে দেখা শুরু করেছিলাম, মনে পড়ে না! ঢাকায় যখন প্রথম আসি সেই তখন থেকেই দেখে চলেছি সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি। কলকাতার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও জয়বাংলা সাপ্তাহিকের অফিসে আসা-যাওয়া করতেন এই পোশাকেই।

মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদান রাখেন লোহানী ভাই। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও ঐতিহাসিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক তিনি। শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, এম আর আখতার মুকুল, সন্তোষ গুপ্ত, সিকান্দার আবু জাফর, কামাল লোহানী, ফয়েজ আহমদ, আমিনুল হক বাদশা, সলিমুল্লাহসহ আরো কিছু নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিকে আমি দেখেছি কলকাতার বালুহক্কাক লেনের অফিসে দিন-রাত কাজ করতে। মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতায় এদের কারো অবদান খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের এই দুই গণমাধ্যমের সঙ্গে রণাঙ্গন থেকে যুক্ত থাকার সুবাদে এদের সবাইকে বেশি করে জানার সুযোগ ঘটেছিল আমার।

১৯৮০ সালের কথা। জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রবল প্রতাপে দেশ শাসন করছেন। স্বাধীনতাবিরোধীরা রাতারাতি পুনর্বাসিত হতে শুরু করেছে তার নতুন রাজনীতির কল্যাণে। সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের সবকিছু পাল্টে যেতে শুরু করেছে। রাজাকাররা প্রবল প্রতাপে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে। রাজনীতিতে কেনাবেচা শুরু হয়েছে। একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পরাজিতরা ছাড়া সে পাল্টে যাওয়া কেউই আশা করেনি।

কিন্তু এরপরও জীবন থেমে থাকেনি। অফিস-আদালত চলেছে। যানবাহন চলছে। সরকারি আদেশ-নির্দেশের বাইরে কিছু লিখতে না পারলেও পত্রপত্রিকা প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা সেদিনের নবীন সাংবাদিকরাও কাজ করে চলেছি। প্রতিরাতে কারফিউর মধ্যে রিকশায় বাড়ি ফেরার সময় রাইফেল উঁচিয়ে পুলিশ-মিলিটারি থামিয়ে দিচ্ছে, পরিচয় জানাতে হচ্ছে। আমরা না হয় উতড়ে গেছি ‘কারফিউ পাস’ আছে বলে, বিপন্ন হয়েছেন সাধারণ মানুষ। বলাবাহুল্য, জেনারেল জিয়ার আমলের ‘নৈশ কারফিউ’ যেন শেষ হওয়ার ছিল না! চলেছে বছরের পর বছর!

স্বাধীনতা-উত্তরকালের সাংবাদিকতারও একনিষ্ঠ মানুষ লোহানী ভাই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালের সামরিক শাসন কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ ছিল অবধারিত। সেসব আন্দোলনের সাধারণ কর্মী আমরা। কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। প্রায় আমৃত্যু চালিয়ে গেছেন তার চিন্তা ও চেতনাকে ক্ষুরধার কলমে।

কয়েক বছর আগে ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’সহ মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েকটি কালজয়ী গানের রচয়িতা পশ্চিমবঙ্গের কবি গোবিন্দ হালদারের একটি অপ্রকাশিত ডায়েরি হাতে আসে আমার কবিকন্যা গোপার সহযোগিতায়। আমি তখন ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত’ নামে তিন খণ্ডের একটি বৃহৎ গবেষণা গ্রন্থ রচনায় যুক্ত। চারদিক থেকে সম্ভাব্য সব তথ্য সংগ্রহ করে চলেছি। গোবিন্দ হালদারের সেই ডায়েরিতে কামাল লোহানীর কথা বহুবার উল্লেখ আছে। … লোহানী সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের ঘটনাটি আজো বেশ মনে পড়ে। কামাল লোহানী আজ নেই আমাদের মাঝে। তার প্রতি আমার এই বয়োকনিষ্ঠের বিনম্র শ্রদ্ধা।

লোহানী ভাই, আপনি যে তারুণ্য ধারণ করে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছেন, সে তারুণ্যের প্রতি আমার অকুণ্ঠ ভালোবাসা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়