নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় সময় ও সমকাল

আগের সংবাদ

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক মূর্ত প্রতীক

পরের সংবাদ

সংগ্রামের সারথি

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২১ , ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৮, ২০২১ , ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সকল গণতান্ত্রিক-মানব মুক্তির আন্দোলন-সংগ্রামে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিলেন তেজোদীপ্ত সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার খান সনতলা গ্রামে তার জন্ম। শৈশবে মাতৃহীন কামাল লোহানী বেড়ে ওঠেন কলকাতায় নিঃসন্তান ফুফুর তত্ত্বাবধানে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দামামা, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রক্তাক্ত দেশভাগ প্রত্যক্ষ করেছেন তীক্ষ্ম সন্ধানী চোখে। দেশভাগে ফিরে আসেন পাবনায়। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী কামাল লোহানী জড়িয়ে পড়েন ভাষা আন্দোলন এবং ছাত্র রাজনীতিতে। পাবনার এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র কামাল লোহানী রাজনৈতিক কারণে একাধিকবার গ্রেপ্তার হন এবং কারাভোগ করেন। আপন চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর অনুপ্রেরণায় এবং সহযোগিতায় যোগ দেন দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায়। এখানেই তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। তবে সাংবাদিকতার সীমায় নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে যোগ দিয়েছিলেন রাজনৈতিক সংগঠন অবিভক্ত ন্যাপে। বাম রাজনীতির সংশ্লিষ্টতায় মাকর্সবাদী মতাদর্শে নিজেকে সম্পৃক্ত করে তোলেন। পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে সংঘটিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থেকে বন্দি হয়েছেন। করেছেন আত্মগোপন এবং ছিলেন ফেরারিও। কিন্তু শিরদাঁড়া ছিল শক্ত তাই কখনো আত্মসমর্পণ করেননি। আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্র বদলের অঙ্গীকারে অবিচল কামাল লোহানী মতাদর্শিক আদর্শ বিচ্যুত না হয়ে জীবনভর ছিলেন অবিচল। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদকের প্রায় পাঁচ বছরের দায়িত্ব পালনের পর মতাদর্শিক বিরোধে ছায়ানট ত্যাগ করে গঠন করেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী। ক্রান্তি গণমানুষের অধিকার আদায়ে এবং গণমানুষকে সংগঠিত-সচেতন করার লক্ষ্যে নাটক, গণসংগীত, নৃত্যনাট্য প্রভৃতি সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পালন করত। ক্রান্তির অনুষ্ঠানসমূহ কখনো মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হতো না। পল্টন ময়দানসহ দেশের সকল খোলা মাঠে-প্রান্তরে অনুষ্ঠান করতো ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী। যাতে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন করা যায়, সে লক্ষ্যে। ক্রান্তির লক্ষ্য ছিল গণমানুষকে সংগঠিত করে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল করা। ক্রান্তির নাটকে, নৃত্যনাট্যে অংশ গ্রহণের পাশাপাশি নির্দেশকের দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।

সাংবাদিকতা তার পেশা ছিল কিন্তু সাংবাদিক কামাল লোহানী পেশার ক্ষেত্রেও মতাদর্শে ছিলেন অবিচল। সাংবাদিক ইউনিয়ন তখন ছিল একটি। তিনি দুবার যুগ্ম সম্পাদক এবং ১৯৭০ সালে সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৪ সালে সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাংবাদিক ইউনিয়ন তখন সাংবাদিকদের স্বার্থরক্ষার একমাত্র সংগঠনরূপে ছিল সক্রিয়। শাসক দলের লেজুড়বৃত্তিতে নিজেদের বিকিয়ে দেয়ার ন্যায় ঘৃণিত অপর্কীতি থেকে সাংবাদিক ইউনিয়ন ছিল যোজন-যোজন দূরবর্তী। মতাদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও সাংবাদিক ইউনিয়ন ছিল সকল সাংবাদিকের মিলন কেন্দ্র। নিজেদের এবং সমষ্টিগত মানুষের স্বার্থরক্ষার আশ্রয়স্থল। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈনিকদের বিদ্রোহ প্রসঙ্গে তার রচিত সাহসী প্রতিবেদন ‘বিদ্রোহ ন্যায় সঙ্গত’ প্রকাশের পর চারদিকে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, সংগঠকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংঘবদ্ধ করে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ গঠনেও তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু করলে তিনি আগরতলা চলে যান এবং সেখান থেকে ফুটবলার প্রতাপ শঙ্কর হাজরাসহ একত্রে কলকাতায় গমন করেন। আগরতলায় তাকে আশ্রয়সহ কলকাতায় যেতে সাহায্য করেন বর্তমান সিপিএম ত্রিপুরা রাজ্য কমিটির সম্পাদক কমরেড গৌতম দাস। বামপন্থিদের সহায়তায় কমরেড নৃপেন চক্রবর্তীর নির্দেশে কমরেড গৌতম দাস ৯ মাসব্যাপী নিরলস দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত জয় বাংলা পত্রিকায় যুক্ত হলেও; আমিনুল হক বাদশার অনুপ্রেরণায় স্বাধীন বাংলা বেতারে যোগ দিয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আবৃত্তি, সংবাদ পাঠ, কথিকা রচনা-পাঠ, ঘোষণা, সেøাগান ইত্যাদি প্রচারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্বাধীনতার পর দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসেন। মুজিবনগর সরকারের ঢাকা প্রত্যাবর্তনের রেডিওর ধারাবিবরণী এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ধারাবিবরণীও কামাল লোহানী এবং আশফাকুর রহমান খান দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ বেতারে যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু পাকিস্তানি আমলের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কোনোরূপ পরিবর্তন না হওয়ার প্রতিবাদে বেতার ছেড়ে পুনরায় সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। যোগ দেন দৈনিক জনপদে। ১৯৭৪ সালে সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে জনপদ ছেড়ে দৈনিক বঙ্গবার্তায় যোগ দেন। সাংবাদিক ইউনিয়ন আয়োজিত সাংবাদিক আবেদ খান রচিত ‘জ্বালামুখ’ নাটকের নির্দেশনা-অভিনয়ও করেছিলেন তিনি। ওই বছরই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য পূর্ব জার্মান, হাঙ্গেরি এবং চেকোশ্লোভাকিয়া সফর করেন। ১৯৭৫-এর ১৬ জুন সংবাদপত্র অ্যানালমেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে মাত্র চারটি পত্রিকা বাদে অন্য সকল পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ করে দেয়া হয়। নির্মল সেন এবং কামাল লোহানী বাকশালে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। চাকরিহারা অবস্থায় অত্যন্ত দৈন্য-দশায় তাকে পড়তে হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তার নির্বাহী সম্পাদকের চাকরি নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। ১৯৭৮ সালে দৈনিক বার্তার সম্পাদক নিযুক্ত হন। জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকাতে অনুষ্ঠিতব্য কমনওয়েলথ রাষ্ট্রপ্রধান সম্মেলনে অংশগ্রহণে মনোনীত হলেও; জেনারেল জিয়ার সামরিক সচিবের প্রস্তাবানুযায়ী চিরন্তন পরিধেয় পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহার করে স্যুট-কোট, টাই পরতে অস্বীকার করেন। সামরিক সচিবের সঙ্গে তুমুল বিতর্কের পর স্বইচ্ছায় বিদেশ যাওয়া পরিত্যাগ করেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অসামান্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা অপরিসীম। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বিজয়ের প্রথম বার্তাটি তিনিই লিখেছিলেন এবং বিজয়ের সেই বার্তাটি তিনি পাঠও করেছিলেন। তার লিখিত ও পঠিত বার্তাই বিশ্ববাসী জেনেছিল পাকিস্তানিদের পরাজয় এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম লাভের সংবাদ। কামাল লোহানীর ত্যাগ, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম এবং মতাদর্শিক অবিচল অবস্থানের ক্ষেত্রে তার চরম শত্রুও প্রশ্ন তুলতে পারবে না। মধ্যবিত্ত জীবন-যাপনেও মধ্যবিত্ত শ্রেণি আকাক্সক্ষা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে রাখতে পারেনি বলেই আদর্শ বিচ্যুত হননি। শাসক শ্রেণির সঙ্গে তার সখ্য কখনো ছিল না। তাই বারংবার নিগৃহীত হয়েছেন বটে তবে মেরুদণ্ড সোজা রেখেই জীবন অতিবাহিত করে গেছেন। আমাদের দেশে গুণীজনদের অবদানের স্বীকৃতি-সম্মান আমরা দিতে পারি না। কামাল লোহানীও তার ব্যতিক্রম নন। রাষ্ট্রীয় পদক-সম্মাননা প্রাপ্তির মূলে শাসক দলের সম্পৃক্ততা অনিবার্য। এ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। কামাল লোহানী আমাদের শাসক শ্রেণির অনুগত ছিলেন না বলেই রাষ্ট্রীয় পদক-সম্মাননা যথাসময়ে পাননি। দলবাজির নিকৃষ্ট আবর্তে আমরা আমাদের গুণীজনদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানে ব্যর্থ হই। মতাদর্শিক কারণেই তিনি শাসক শ্রেণির প্রতিপক্ষরূপে জীবনভর অবিচল থেকেছেন। সঙ্গত কারণেই রাষ্ট্রের পদক-সম্মাননা তার জুটেছে অন্তিম সময়ে। তার মৃত্যুতে নিঃসন্দেহে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। এ ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়। তার প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো তখনই সম্ভব হবে, তার আজন্ম আকাক্সিক্ষত ব্যক্তি মালিকানার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেদিন সম্ভবপর হবে। তিনি তার কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের সাথে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন, এটাই প্রত্যশিত।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়