সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক মূর্ত প্রতীক

আগের সংবাদ

উঁচু ছিলেন সব দিক দিয়েই

পরের সংবাদ

রাজনীতি আর সংস্কৃতির মিশেল এক সাংবাদিকতার উপাখ্যান

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২১ , ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৮, ২০২১ , ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ

আদি ও অনন্তকাল থেকে দেখা যায় সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে সংস্কৃতির ওপর। রাষ্ট্রকাঠামোতে যদি সংস্কৃতি গুরুত্ব না পায়, তাহলে সমাজ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। বাঙালির হাজার বছরের প্রবহমান সামাজিক স্রোতের মূল শক্তিই তার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি যত বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ হবে, ততই এর শক্তি বাড়বে। এই বাংলার সংস্কৃতি বৈচিত্র্যের শক্তিতে বলিয়ান। ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংস্কৃতির শক্তিই বাংলাদেশকে আজ এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। সংহত একটি ভিত দিয়েছে। সংস্কৃতিই বাঙালিকে আলাদা একটা বৈচিত্র্য দিয়েছে, বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলাদেশের রাজনীতি এগিয়েছে সংস্কৃতির হাত ধরেই। বাঙালি তার জন্য আলাদা রাষ্ট্র চেয়েছে, কারণ তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবে যখন মুসলমানদের জন্য রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন এসেছে, তখন দুটি আলাদা রাষ্ট্রের প্রস্তাব এসেছে সংস্কৃতির প্রকারভেদের কারণেই। যদিও ১৯৪৬ সালে দিল্লির অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কংগ্রেসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘স্টেট’ এবং ‘স্টেইটস্’-এর কূটচালে বাঙালি মুসলমানের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের প্রস্তাবটি নিয়ে মুসলিম লীগের প্রগতিবাদী ধারার প্রতিনিধি আবুল হাশিমরা বেশি দূর এগোতে পারেননি। সংস্কৃতির এই সংকট প্রকটভাবে দেখা দিল ১৯৪৭-এ। এমনকি দ্বিজাতিতত্ত্ব¡ তথা মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র গঠনের পরও। ভিন্ন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীকে যোজন যোজন দূরত্বে থেকে রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখা যায় না। এক সত্তার ওপর অন্য সত্তার চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতি দিয়ে রাষ্ট্র এগোয় না। ভারতে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি এখনো একই কাঠামোতে টিকে আছে, কারণ তাদের রাষ্ট্র কাঠামো এমনভাবে নির্মিত হয়েছে, যে কাঠামোতে সবাইকে ধারণ করা যায়। যদিও এই কাঠামো নানা সময় নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তারপরও ধারণ করার অন্তর্নিহিত শক্তিই তাকে রক্ষা করেছে। এখনো যে বিরোধ, বিশেষ করে হিন্দিবলয় বনাম অহিন্দিবলয়ের সংঘাত- মূলত সংস্কৃতিরই সংঘাত।

এই সংঘাত টিকিয়ে রেখে সমাজ প্রগতি যেমন সম্ভব নয়, তেমনি রাজনীতিও গতিহীন হয়ে পড়ে সংস্কৃতির সংঘাতে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বহু আগে বলে গেছেন, ‘যত মত তত পথ’। সকল পথের গন্তব্য যদি একই হয়, তাহলে পথের ভিন্নতা নিয়ে বিরোধ থাকার কথা নয়। বরং এই ভিন্নতাই সমাজের সৌন্দর্য বাড়ায়। বাংলাদেশের এই ভিন্নতার সৌন্দর্য নিয়ে যারা সাংস্কৃতিক আন্দোলন করেছেন, তারা জানতেন, এই ভিন্নতাই বাঙালির সংস্কৃতির প্রাণশক্তি। রাজনীতি যারা করেন, তাদের এটা উপলব্ধি করতে হবে, সংস্কৃতির ভিন্নতা এড়িয়ে নয়, তাকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। রাজনীতিকে যে সংস্কৃতি নিয়ে এগোতে হয়, তার বড় দুটি উদাহরণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন আপাদমস্তক বাঙালি, পোশাকে-আশাকে, বিশ্বাসে, চিন্তায়। বাংলা এবং বাংলার মাটি, বাংলার সংস্কৃতিতে তিনি থাকবেন সব সময় আচ্ছন্ন। তার সারা জীবনের বিশ্লেষণে এ বিষয়ে উচ্চারণ ছিল একেবারেই স্পষ্ট, যা আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলতেন, আমি বাঙালি, তারপর আমি মুসলমান। এই সাহসী উচ্চারণটি করার মতো রাজনৈতিক নেতা এখন খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সংস্কৃতিনির্ভর স্বাধীনতা আন্দোলন। এই বাংলার মানুষের জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড চাই, রবীন্দ্রনাথ চাই, নজরুল চাই, লালন চাই, জারি সারি ভাওয়াইয়া চাই। পহেলা বৈশাখ চাই, কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের নিজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের জীবনধারা চাই। এই প্রবল আকাক্সক্ষায় একটি জাতিগোষ্ঠী অকাতরে জীবন দিয়ে ৯ মাসে অর্জন করেছে তাদের নিজের মাতৃভূমিকে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শত নির্যাতন করে একজন কিশোরকে জয় বাংলা বলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সেই কিশোরকে মেরে ফেলতে হয়েছে। এই প্রবল দেশাত্মরোধ তো সংস্কৃতির প্রবহমান ধারা থেকে নির্মিত।

বাংলাদেশে যে কয়েকজন মানুষ সংস্কৃতির এই ধারা নির্মাণে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, তাদের অন্যতম শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী, আমাদের প্রিয় লোহানী ভাই। তিনি জানতেন, সংস্কৃতির এই শ্রোতধারা প্রবহমান করা ছাড়া বাঙালির রাষ্ট্র নির্মাণ করা যাবে না। তাই রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক মিশেল পথ নিয়েই অগ্রসর হয়েছেন তিনি। ইতিহাস বলে, রাজনীতি যখন সংস্কৃতির পথ থেকে কক্ষচ্যুত হয়েছে, তখন বিপথে গেছে সেই পথ। লোহানী ভাইদের সংগ্রাম ছিল সেই পথকে বিপথ থেকে পথে আনা। এ কথা অনিবার্য সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনকে সঠিক পথে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেছে যে সাংস্কৃতিক সংগঠকগণ, তাদের মধ্যে অন্যতম আমাদের প্রিয় লোহানী ভাই। দেশের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন এই সংস্কৃতির স্রোতটি তৈরি করার জন্য। তাদের লক্ষ্য ছিল যাতে রাজনীতি বিপথে না যায়। সাংবাদিকতা করেছেন, দু’হাতে লিখেছেন মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। কিন্তু বিশ^াসের জায়গাটি ছিল দৃঢ়। তিনি জানতেন, সংস্কৃতি ছাড়া এ জাতির রাজনৈতিক মুক্তি নেই। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী ও উদীচী নিয়ে তিনি সেই জাগরণটি তৈরি করে গেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনকে দিয়ে গেছেন অনুপ্রেরণা। কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজনের আহ্বান তিনি কখনোই ফেরাননি। তাই তার মতো সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মিশেল এক সাংবাদিকতার উদাহরণ মেলা খুবই কঠিন। কারো সংস্কৃতি আছে তো রাজনৈতিক বোধ নেই। কারো রাজনীতি আছে, কিন্তু বোধে বিশ্বাসে সংস্কৃতির ‘স’ও নেই। আবার ইদানীং অনেক সাংবাদিক আছেন, যাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতির চিন্তার কোনোটাই নেই। তাই শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী, আমাদের জন্য অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। ভোরের কাগজ একবার তাকে আজীবন সম্মাননা দিয়ে নিজেরাই গর্বিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব- কী নামে অভিহিত করবেন তাকে। যে নামেই ডাকি না কেন তাকে, সংকটে তার অভাব অনুভূত হবে প্রবলভাবে। যেভাবে তিনি হাল ধরতেন অতীতে, সেই মানুষটা তো চলে গেলেন পরপারে। কিন্তু সংকট কী চলে গেছে? বরং মনে হয় তা আরো প্রবল হয়েছে। তাই এই বাস্তবতায় তার নির্মিত পথকে অনুসরণ করাই হবে তার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা জানানো।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়