উঁচু ছিলেন সব দিক দিয়েই

আগের সংবাদ

রেড ডেভিলদের কাছে পাত্তা পেল না ডেনিশরা

পরের সংবাদ

ভ্যাটে বিপর্যয় তিন কারণে

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২১ , ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৮, ২০২১ , ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ

* লকডাউনের প্রভাব * ভ্যাট অব্যাহতি * ভ্যাট ফাঁকি * ঘাটতি ১৪ হাজার কোটি টাকা

করোনাকালীন লকডাউন, ভ্যাট অব্যাহতি ও ভ্যাট ফাঁকির কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সার্বিক ভ্যাট আদায়। লকডাউনে ভ্যাট অফিস খোলা থাকলেও কাক্সিক্ষত হারে ভ্যাট আদায় সম্ভব হয়নি। এই কারণে চলতি অর্থবছরের শেষে এসে রাজস্ব আহরণে কিছুটা গতি এলেও ভ্যাট আদায় খুবই শ্লথ। আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আহরণের গড় প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৮৪ হাজার ৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু ভ্যাটেই রাজস্ব ঘাটতি ১৩ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে দেশের ভ্যাট কমিশনারেটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের কমিশনারেটগুলোর মধ্যে ভ্যাট আদায়ে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট। মে মাসে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটের রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মাইনাস ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ভ্যাট আদায়ে একই পরিস্থিতি যশোর ভ্যাট কমিশনারেটে। আলোচ্য সময়ে যশোর ভ্যাট কমিশনারেটের প্রবৃদ্ধি মাইনাস ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মাইনাস প্রবৃদ্ধি ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা পশ্চিমে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি মাইনাস ১ দশমিক ১৩ শতাংশ। ভ্যাট আদায়ে ১২টি ভ্যাট কমিশনারেটের মধ্যে পিছিয়ে রয়েছে বারবার ভ্যাট আদায়ে শীর্ষে প্রচারকারী কুমিল্লা ভ্যাট কমিশনারেট। আলোচ্য সময়ে কুমিল্লা ভ্যাট কমিশনারেটের ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। অথচ ভ্যাট আদায়ের গড় প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ১৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৭ দশমিক ৩১ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে কুমিল্লা ভ্যাট কমিশনারেট। তবে কমিশনারেটগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাস শেষে ভালো করেছে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাট। আলোচ্য সময়ে এলটিইউর ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভ্যাটে জটিলতা এখনো বিদ্যমান। করোনার আগে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াকালীন সময়েও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বিশেষ করে ভ্যাট অব্যাহতি, ভ্যাট ফাঁকি ও ঠিকমতো অনলাইন কার্যক্রম চালু না হওয়ায় ভ্যাট আদায়ে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া লকডাউনের কারণেও ভ্যাট আদায়ে প্রভাব পড়েছে। এসব কারণে রাজস্ব ঘাটতিও বেড়ে চলছে। ভ্যাট আদায়ে গতি আনতে লটারি চালুর পরও গতি হারিয়েছে ভ্যাট। টানা লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেক মানুষ। যার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে ভ্যাট আদায়ে। তবে এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আহরণ একটু বেশি হয়ে থাকে। তবে করোনাকালীন সময়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একেবারে অসম্ভব বলেও মনে করেন মাঠ পর্যায়ের এনবিআরের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার কারণেই শুধু ভ্যাট আদায় কমেছেÑ এই তথ্য সম্পূর্ণ ঠিক নয়। কারণ ভ্যাট অব্যাহতির কারণেও এনবিআর বিশাল অঙ্কের ভ্যাট প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো ভ্যাট ফাঁকি। সাধারণ ভোক্তারা ভ্যাট দিলেও সরকারি কোষাগারে ঠিকমতো ভ্যাটের এই অর্থ জমা হচ্ছে না। আর করোনার কারণে হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকানপাট বন্ধ থাকার কারণেও ভ্যাট আদায় কমেছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। যদিও এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয় ২৯ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে নির্ধারণ করেছে। চলতি অর্থবছরের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা কাটছাঁট করার পর এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১১ মাসে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ৪৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। অর্থবছরের বাকি রয়েছে এক মাস। এই সময়ে এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ভ্যাট আদায়ের শ্লথগতির বিষয়ে কথা হয় এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ড. মান্নান শিকদারের সঙ্গে। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, করোনার কারণে ভ্যাট আদায়ের গতি কিছুটা শ্লথ ছিল। করোনার মধ্যেও সারাদেশের ভ্যাট অফিস খোলা ছিল। লকডাউনে হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকার কারণে ভ্যাট আদায় কিছুটা কম হয়েছে। তবে চলতি মাসে ভ্যাট আদায় বেড়েছে। আগামী মাসে অর্থাৎ বছর শেষে আমরা ভ্যাট আদায়ে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারব। ইলেক্ট্রনিক ফিজিক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের এই ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা ইতোমধ্যে সাড়ে ৩ হাজার ইএফডি বিভিন্ন মার্কেট শপিং মলে বসিয়েছি। জুনের মধ্যে ১০ হাজার ইএফডি বসানোর প্রক্রিয়া চলছে। এতে ভ্যাট আদায় কিছুটা বাড়বে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

সূত্র আরো জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এনবিআরের আয়কর ও ভ্রমণ করের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা বা ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬৫ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১১ মাসে আয়করে রাজস্ব ঘাটতি ১১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। আমদানি-রপ্তানিতে ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৬ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা, আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬৮ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১১ মাসে আমদানি-রপ্তানিতে রাজস্ব ঘাটতি ১৮ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে আমদানি-রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়