গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ

আগের সংবাদ

কবিতা

পরের সংবাদ

ধর্ষণের অপপ্রয়াস সাহসী প্রতিবাদ ও অর্জিত প্রতিকার

কাজী হাবিবুল আউয়াল

সাবেক সিনিয়র সচিব

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২১ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৭, ২০২১ , ১১:৪১ অপরাহ্ণ

বছর দুয়েক আগে সিলেটে কতিপয় রাজনৈতিক ছাত্র নেতাকর্মীর দ্বারা সংঘটিত ধর্ষণের একটি ঘটনা এবং কিছুকাল পর নোয়াখালীর কোনো এক গ্রামের গৃহবধূকে অপহরণ করে গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে লেখালেখি, মাতামাতি ও বাদ-প্রতিবাদের উত্তাল ঝড় বয়ে যায় দেশজুড়ে। ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টার অসংখ্য ঘটনা দেশে অতীতেও হয়েছে এখনো নিত্যদিন হচ্ছে। সম্প্রতি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র শিল্পী পরীমনিকে আশুলিয়ার বোট ক্লাবে বিশিষ্ট শিল্পপতি জনৈক নাসির উদ্দিন মাহমুদ কর্তৃক ধর্ষণের ব্যর্থপ্রয়াস নিয়ে গণমাধ্যমে নাটকীয় ঝড় বয়ে গেছে। অভিনয়শিল্পী পরীমনি এবার অকৃত্রিম জীবন্ত অভিনয় করে প্রবল ধনশালী ও প্রতাপশালী দুর্বৃত্তকে প্রাথমিকভাবে হলেও ধরাশায়ী করতে পেরেছেন। তাকে অভিনন্দন, সে যৌন লালসার শিকার গুলশানের ষোড়শী নিষ্পাপ মেয়েটির মতো আত্মহননের পথ বেছে নেয়নি। মিডিয়াকেও আন্তরিক অভিনন্দন। বিচারিক দীর্ঘ নাটকের শেষাঙ্ক অবশেষে কীভাবে পরিসমাপ্ত হবে বলার উপায় নেই। কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ধর্ষকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যায়। বলে রাখা প্রয়োজন, সাধারণ চোখে প্রাপ্ত ছবি থেকে আমার এ লেখা। ঘটনার অন্তর্নিহিত সত্যাসত্য আমার অজানা। তবে দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি, এসব ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন। সমাজের ভূমিকার পাশাপাশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সদিচ্ছার স্বচ্ছ প্রতিফলন অনিবার্যভাবে প্রয়োজন।

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হয়েছিল। সরকার তা করেছিল। তবে এমন ক্ষেত্রে গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল। রকমফের অনুযায়ী ধর্ষণজাত অপরাধের দণ্ডারোপের ক্ষেত্রে প্রকারভেদ হতে পারে। এ বিষয়ে তড়িঘড়ি করে হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে অপরাধবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, দর্শনের অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞানী, মনোচিকিৎসক, আইনজীবী, বিচারকসহ সংশ্লিষ্ট অন্য আরো বিশেষজ্ঞদের, সুচিন্তিত মতামত গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় ছিল। কমিশন গঠন করেও প্রতিবেদন গ্রহণ করা যেতে পারত। এখনো তা করা যেতে পারে। কারণ সমস্যাটি এখনো সমভাবেই বিরাজমান। সংবাদপত্রে দৃষ্টিপাত করলে প্রতিদিনই ধর্ষণের দু-চারটি নির্মম ঘটনা চোখে পড়বেই। কেবল কঠোর নিবর্তনমূলক শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ডই সমস্যার সমাধান নয়। দ্রুতবিচার, আরোপিত দণ্ড কার্যকরকরণ ও ব্যাপক প্রচারের বিষয়টিও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুতবিচারে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ড শুনেই জনগণ পরিতৃপ্ত হয়ে থাকেন। তারপর আপিল, রিভিশন, আপিল বিভাগে পুনর্বার আপিল, আবার রিভিউ ইত্যাদি পর্যায় শেষ করতে আরো ২০-২৫ বছর ব্যয়িত হতে পারে বা কখনই পরিসমাপ্ত নাও হতে পারে।

ধর্ষণ নতুন অপরাধ নয়। আদিকাল থেকেই হয়ে আসছে। আদম-সন্তান কাবিল আকলিমাকে জোরপূর্বক বিবাহ করার মানসে ভ্রাতা হাবিলকে হত্যা করেন। সীতাহরণ নিয়ে রাম-রাবণের লঙ্কা যুদ্ধ এবং হেলেনের অপহরণ নিয়ে ট্রয়নগরী ধ্বংস হয়েছিল। ধর্মগ্রন্থ বা পৌরাণিক এসব কাহিনীতে কেবল প্রীতি-ভালোবাসা নয়, যৌনলিপ্সা বা ধর্ষণের পরোক্ষ উপাদানও রয়েছে। যুগে যুগে রাজা-বাদশা, সম্রাট-সুলতান, জমিদার, আমির-ওমরাহরা হেরেমে অগণিত উপ-পত্নী বা রক্ষিতা রাখতেন। আজো তা হয়। পদ্ধতি খানিকটা ভিন্ন। রাজতন্ত্র বা সামন্তবাদী যুগের অবসান হলেও পুুঁজিবাদী গণতন্ত্রের আড়ালে পুঁজি আর অর্থের শক্তিতে সেই রাজতন্ত্র বা সামন্তবাদ ভিন্ন অবয়বে বহাল রয়েছে। শহরের চারপাশে অধুনা গড়ে ওঠা অসংখ্য বিলাসবহুল বাগানবাড়ির নেপথ্য উদ্দেশ্যে সেই সত্যই প্রতিভাত হয়ে ওঠে। নিন্দিত পতিতাবৃত্তি তুলে দেয়া হলেও আলাল ও দুলালবাবুদের মনোরঞ্জনের জন্য আধুনিক যৌনকর্মীরা ঠাঁই নিয়েছেন শহরের নামি-দামি হোটেল, ক্লাব আর গুলশান-বনানীর লাখ টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে।

বলা নিষ্প্রয়োজন যে, দেশে আইন ও শাস্তির অপর্যাপ্ততা নেই। অভাব বা অদক্ষতা রয়েছে আইনের প্রয়োগ বা দণ্ড কার্যকরকরণে। দুর্বলতা রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে। কোনো এক টিভি চ্যানেলে ডা. জাফরুল্লাহ বলছিলেন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে ৫০ বছর কারাদণ্ডের বিধান করা যেতে পারে। মন্দ নয়। উত্তম প্রস্তাব। তবে ২, ৩, ৫ বছর পর যে তিনি সরকার বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে জেলগেটে ফুলের মালা গলায় দিয়ে বেরিয়ে আসবেন না তার কি কোনো নিশ্চয়তা থাকবে। বিগত ২০-২৫ বছরে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির এবং ফোজদারি কার্যবিধি আইনের ৪০১ ও ৪০২ ধারায় সরকারপ্রধানের ক্ষমাপ্রদর্শনের ক্ষমতাকে খানিকটা সীমিত করে বিধান করতে হবে যে, ধর্ষণের অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি এবং সরকারপ্রধানের সেই এখতিয়ার থাকবে না। মৃত্যুদণ্ডের সুবিধা হচ্ছে একবার কার্যকর হয়ে গেলে ক্ষমাপ্রদর্শনের সুযোগ আর অবশিষ্ট থাকে না।

ধর্ষণের অপরাধের ক্ষেত্রে জৈবিক চাহিদা, রিপু বা সহজাত প্রবৃত্তির বিষয়টিকে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে কিনা সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারত। বিষয়টি কেবল মানবিক নয়, এটি প্রাণবিক বা পাশবিক একটি প্রবৃত্তিও বটে। প্রাণী বা পশুর আচরণেও বিষয়টি পরিদৃষ্ট হয়ে থাকে। দণ্ডবিধিতে বর্ণিত বিভিন্ন অপরাধ যথাÑ চুরি, ডাকাতি, হত্যা, প্রতারণা, জালিয়াতি ইত্যাদির সঙ্গে ধর্ষণের অপরাধের মৌলিক প্রভেদ রয়েছে। এক্ষেত্রে অপরাধীর দৈহিক ও মনস্তত্ত্বের জটিল রসায়নের একটি বিষয় রয়েছে। সব প্রাণীতেই কম-বেশি এই জৈবিক চাহিদা বা রিপুর প্রভাব রয়েছে। মানুষও প্রাণী। অসংখ্য ছবি ও গ্রন্থে দেখা যায় অতীতে ধনাঢ্য সম্রাট-রাজা-বাদশা-জমিদাররা ভোগের উদ্দেশ্যে হেরেমে কত শত নারীকে প্রতিপালন করতেন। তাদের ধর্ষণের প্রয়োজন হতো না। হেরেমের নারীদের প্রহরার জন্য কিশোর, তরুণ ও যুবকদের নির্মমভাবে খোঁজা হতো। কী মুসলমান রাজা-বাদশা-জমিদার, কী হিন্দু রাজা-বাদশা-জমিদারÑ এক্ষেত্রে সবাই অভিন্ন দর্শনে দীক্ষিত ছিলেন। কথায় বলে, দেবতাদের জন্য যা লীলা খেলা মানুষের বেলায় তা পাপ। এটাই কার্ল মার্কসের সেই শ্রেণি চরিত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের একটি।

২০১৭ সালের কোনো এক সময় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে রূপা নামের একটি নিরীহ মেয়ে যাত্রীকে বাসের চালক ও কন্ডাক্টাররা নির্মমভাবে গণধর্ষণ করে হত্যা করে সড়কের পাশে মৃতদেহ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। দুর্বৃত্তরা গ্রেপ্তার হয়েছিল। দ্রুত বিচারে ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। তারপর আর কী হয়েছে, জানা নেই। কিন্তু ধর্ষণ থেমে নেই। অবিরাম চলছে। বিষয়টিকে কেবল আবেগ দিয়ে দেখলে হবে না। বস্তুনিষ্ঠ ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে মনুষ্য রক্তে প্রবহমান জটিল রসায়নজাত পাশবিক রিপুর বস্তু ও তত্ত্বের এই দ্বান্দ্বিক অবস্থানের গবেষণালব্ধ প্রতিকার উদ্ভাবন বাঞ্ছনীয়।

২০২০ সালে জারি হওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাম্প্রতিক বিকল্প বিধান সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন হলেও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার সব স্তরে যদি সরকারি আইনজীবীদের দ্বারা আন্তরিক ও নিষ্ঠার সঙ্গে মামলা পরিচালনা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এক পর্যায়ে ধর্ষকরা আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে আসবেন। দেশের সরকারি প্রসিকিউশন সিস্টেম এখনো অস্থায়ী এবং দলীয়। কেবল মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। জনগণকে দেখতে হবে মৃত্যুদণ্ড বিচারিক প্রক্রিয়ায় দ্রুত চূড়ান্ত হয়েছে এবং কার্যকর করা হয়েছে। অধিকন্তু পরীমনির মতো বলিষ্ঠ প্রতিবাদ এবং মিডিয়ার ভূমিকার পাশাপাশি, দ্রুত দণ্ডারোপ, প্রতিকার, প্রতিরোধ ও নিবারক ব্যবস্থার ওপরও সমভাবে গুরুত্বারোপ করতে হবে। ধর্ষণ সমূলে হয়তো কখনই উৎপাটিত হবে না, তবে সমন্বিত প্রয়াসে ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে পারে।

কাজী হাবিবুল আউয়াল : সাবেক সিনিয়র সচিব।

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়