রাজনীতি আর সংস্কৃতির মিশেল এক সাংবাদিকতার উপাখ্যান

আগের সংবাদ

ভ্যাটে বিপর্যয় তিন কারণে

পরের সংবাদ

উঁচু ছিলেন সব দিক দিয়েই

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২১ , ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৮, ২০২১ , ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

কামাল লোহানী একজন উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন সব দিক দিয়েই। আশপাশের সবাইকে তিনি ছাপিয়ে ছাড়িয়ে উঠতেন দৈহিক উচ্চতাতে। কিন্তু ভেতরে ছিলেন আরো উঁচুতে। অনমনীয়। বাঙালি মধ্যবিত্তের সাধারণ রোগ নত হওয়া। কামাল লোহানী কখনোই নত হননি। শিরদাঁড়া ছিল অত্যন্ত শক্ত। সুবিধাবাদিতার ধারেকাছে ছিলেন না। আপস ছিল তার চরিত্রবিরুদ্ধ। জীবনের শেষ ক্ষণটি পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রেই ছিলেন। করোনা ভাইরাস তাকে ভেঙে দিতে পেরেছে, কিন্তু নত করতে পারেনি। করোনা হচ্ছে পুঁজিবাদী বড় ব্যাধির সর্বাধুনিক প্রকাশ। এ শুধু মানুষকেই নয়, মানুষের মনুষ্যত্বকে বিপর্যস্ত করেছে। কামাল লোহানীর যুদ্ধটা ছিল এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই। সম্পত্তির সামাজিক মালিকানায় তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তিগত মালিকানার বিপরীতে। করোনা ভাইরাস রোগটির লালনভূমি ও চরিত্রদানকারী যে পুঁজিবাদ, তার পক্ষেই কাজ করছে। পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে সংগ্রামটা আজ চলছে, কামাল লোহানী সেই সংগ্রামেই যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই শেষ পর্যন্ত।

পাকিস্তানের দুষ্ট শাসনকালে পূর্ববঙ্গের মানুষকে লড়তে হয়েছে জাতীয় মুক্তির জন্য। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল সে লড়াইয়েরই অংশ। কামাল লোহানী ওই আন্দোলনে ছিলেন। তখন তিনি ছাত্র। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তার পরিণতি খুঁজে নিয়েছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে। কামাল লোহানী তাতেও ছিলেন। তখন তিনি সাংবাদিক। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কেবল জাতীয়তাবাদী নয়, সমাজতান্ত্রিক উপাদানও ছিল। ভাষার অধিকার একটি সামাজিক অধিকার। ভাষা আন্দোলনের সমাজতান্ত্রিক উপাদান আরো বিকশিত হয় ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানে এবং তারপরে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই যুদ্ধের ভেতর দিয়ে। কামাল লোহানী যেমন অভ্যুত্থানে ছিলেন তেমনি ছিলেন যুদ্ধেও।

তার প্রধান পরিচয় সংস্কৃতিসেবী হিসেবে। নিজে তিনি অতিচমৎকার আবৃত্তি করতেন; অভিনয় করেছেন মঞ্চে, দক্ষ ছিলেন নৃত্যকলাতেও। এবং ছিলেন সংগঠক। আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে তার সমান মাপের সাংস্কৃতিক সংগঠক সত্যি বিরল। ‘ছায়ানট’ যখন গঠিত হয় তখন কামাল লোহানী যে তার সঙ্গে থাকবেন এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। সঙ্গে তিনি ছিলেনও। নেতৃত্বেই ছিলেন। ‘ছায়ানটে’র পেছনে অনুপ্রেরণাটা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী। কিন্তু কামাল লোহানীর ভেতরে যে সমাজতান্ত্রিক অঙ্গীকারটি শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে কাজ করছিল সেটি তাকে আরো এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছে এবং তিনি গেছেনও। তিনি ‘ক্রান্তি’ গড়ে তুলেছেন। সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশকারী সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ। সমাজতান্ত্রিক অঙ্গীকারটি তার ভেতরে শুরু থেকেই ছিল, ধাপে ধাপে সেটি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিক ছিলেন। ওটিই ছিল তার জন্য স্বাভাবিক পেশা। অন্য কোনো পেশাতে তাকে মানাত না, মানায়ওনি। সাংবাদিকদের অনেক গুণের একটি হচ্ছে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব। সাংবাদিককে দ্রুত ও তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোন সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ কোনটি নয় এবং সংবাদের কোন অংশটাকে সামনে আনা চাই, অন্য অংশকে পেছনে সরিয়ে। এই গুণ কামাল লোহানীর যে ছিল তার সাক্ষ্য তার সহকর্মীরা দেবেন এবং দিয়েছেনও। তিনি কয়েকটি দৈনিকের বার্তা সম্পাদক এবং প্রধান সম্পাদক ছিলেন। একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে যোগ দেন এবং বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এসব কর্মক্ষেত্রে তিনি ঈর্ষণীয় সাফল্যের অধিকারী হয়েছেন। কিন্তু বাইরে থেকে আমরা যা দেখেছি এবং দেখে মুগ্ধ হয়েছি, সে হলো বড় ব্যাপারে তার অতিদ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা।

এটি বিশেষ ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল একাত্তর সালে। হানাদার খুনিরা যখন অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র মানুষদের ওপর তখন মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সামনের সারির সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা বিপন্ন ও দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। আর সেটা ছিল স্বাভাবিক, কারণ যুদ্ধের জন্য কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না, এমনকি পরিকল্পনাও ছিল অনুপস্থিত। মহাবিপদের সেই সময়টিতে কামাল লোহানী বিলম্ব করেননি সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে। তিনি দেশত্যাগ করেছেন। কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, গিয়ে কোন বিপদে পড়বেন, এসবের কিছুই জানা ছিল না। শুধু জানতেন যেতে হবে। পরিবার পরিজনের টান পিছনে পড়ে রইল তিনি রওনা দিলেন। পথে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন আরেকজন সাংবাদিকে, ফয়েজ আহমদকে। ফয়েজ আহমদ আহত হয়েছিলেন প্রথম রাতের আক্রমণেই এবং তারও সিদ্ধান্ত ছিল দেশত্যাগের। তারা গেলেন; সন্ধান পেলেন প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এবং যুক্ত হলেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের প্রচার ও সাংবাদিকতার কাজে। তারা শরণার্থী ছিলেন না, ছিলেন যোদ্ধা। ফিরেছেন যুদ্ধশেষে। প্রস্তুত ছিলেন নতুন দায়িত্বপালনে।

সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে যেমন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তেমনি সহকর্মীদের সংগঠিত করার কাজে তিনি অসামান্য দক্ষতার ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠনের তিনি সংগঠক ও নেতা ছিলেন। সরকারি পক্ষে নয়, তাকে দাঁড়াতে হয়েছে বিপক্ষে। তার নেতৃত্বে আস্থা ছিল সাংবাদিকদের।

কামাল লোহানীর সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে কয়েকবার। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনের জন্য সাংস্কৃতিক কর্মীরা একটি উদ্যোগ নেন; আমরা দুজনেই সেটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। আয়োজনটি আমরা খুব ব্যাপকভাবে করতে পারিনি; কিন্তু আমি দেখেছি তার কর্মোদ্যোগ। পরিকল্পনাগুলো ছিল নিখুঁত এবং সেটির কৃতিত্ব মূলত তারই। দেখেছি তার ধৈর্য; তার প্রসন্নতা ও আশাবাদ। একই অভিজ্ঞতা আবারো হলো হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের সময়। পরিকল্পনা, উদ্যোগ, নেতৃত্ব, সবকিছুই ছিল কামাল লোহানীর।

কামাল লোহানী লিখতেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বচ্ছ। শরীরে অসুখের আক্রমণ ঘটেছে, যেমনটা ঘটবার কথা; কিন্তু তার কাজে, লেখায়, চিন্তায়, বলায়, কোথাও কোনো দুর্বলতা দেখা দেয়নি। বিশেষ অসুবিধা ছিল তার চোখে। দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। শেষের দিকে তো পড়তেই পারতেন না। চলাফেরাতেও অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু ওই যে মনের জোর সেটা কখনোই হারাননি। আমরা জানতাম তার স্ত্রী রোগভারে অবসন্ন হয়ে পড়ছিলেন; তারপরে তো তিনি চলেই গেলেন। কামাল লোহানী তার স্ত্রীর শুশ্রƒষায় যে মনোযোগ ও সময় দিতেন সেটা জানত কেবল তার অত্যন্ত নিকটজনরা। কিন্তু এ নিয়ে তাকে কখনো বিপদগ্রস্ত মনে হয়নি। আসলে বিপদের মুখোমুখি হয়ে কখনোই কোনো অবস্থাতেই তিনি হতাশ হননি। স্ত্রীর মৃত্যুকেও তিনি মোকাবিলা করেছেন সাহসের সঙ্গে। নিজের অসুখকে তো অবশ্যই।

কামাল লোহানীর প্রকাশনা থেকে এক সময়ে আমরা ‘সময়’ নামে একটি সাপ্তাহিক বের করতাম; তাতে তিনি লিখেছেন। আমাদের ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’তেও তার লেখা প্রকাশ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। তিনি কথা বলতেন গুছিয়ে, বক্তৃতা করতেন উদ্দীপ্ত, কিন্তু সংযত কণ্ঠে। সেসব বৈশিষ্ট্য তার আচরণে যেমন তার লেখাতেও তেমনি পাওয়া যেত।

তার অসংখ্য গুণগ্রাহীর মধ্যে আমিও একজন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়