খ্যাপাটে প্রকৃতি : কিসে নিষ্কৃতি?

আগের সংবাদ

উচ্ছেদে কি সমাধান?

পরের সংবাদ

রোহিঙ্গা ইস্যু, মিয়ানমারের ছায়া-সরকার ও রাখাইনের পরিস্থিতি

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২১ , ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৬, ২০২১ , ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার পর রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সবকিছু এমনিতেই সংকটের মধ্যে পড়েছে। তার ওপর সিভিলিয়ানদের নিয়ে নবগঠিত ছায়া-সরকারের একটি বিবৃতি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অবস্থান এবং পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এটাকেই বলে ‘হিতে বিপরীত’ হওয়া, যদিও এর মধ্যে কতআনা ‘হিত’ আছে আর কতআনা ‘বিপরীত’ আছে সেটাও বিশ্লেষণের বিষয়।

২০২০ সালের ৮ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত এবং ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সামরিক বাহিনী কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত সাংসদরা মিলে মিয়ানমারের সিভিলিয়ানদের প্রতিনিধি হিসেবে ২০২১ সালের ১৬ এপ্রিল জান্তা সরকারের প্যারালাল একটি ছায়া-সরকার গঠন করে, যার নাম দেয়া হয় ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট অব মিয়ানমার’ (এনইউজি)। জান্তা সরকার এ ছায়া-সরকার এবং গঠন-প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। অবশ্য জেনারেল মিন অং হ্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার সু কির নেতৃত্বাধীন ছায়া-সরকারকে বৈধ বলে ঘোষণা করবে এটা কেউ ভাবেনি কিংবা ভাবার কোনো কারণ নেই। উইন মিন্টকে প্রেসিডেন্ট, সু কিকে স্টেট কাউন্সিলর (হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট) এবং মান উইন খাইন থানকে প্রধানমন্ত্রী করে এনইউজির একটি কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে যেখানে সু কির নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি’র বাইরেও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এবং তাদের ‘রাইভাল’ গ্রুপ যেমনÑ আরাকান আর্মি, কাচিন, শান, কারেন, থায়াং প্রভৃতিকে সম্পৃক্ত করে একটা ইনক্লুসিভ নীতির ভিত্তিতে এ ছায়া-সরকারের রূপরেখা দাঁড় করানো হয়। ফলে এ ছায়া-সরকার গোটা মিয়ানমারে সাধারণ মানুষের কাছে একটা ক্রম-গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিকভাবেও এনইউজি বিভিন্ন দেশ ও ফোরামে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। তারই সূত্র ধরে জুনের ৩ তারিখ রোহিঙ্গাদের বিষয়ে এনইউজির অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে তিন পৃষ্ঠার একটা বিবৃতি প্রকাশ করা হয় যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী একটা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। সে বিবৃতিতে চারটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

এক. রোহিঙ্গাদের এ বিবৃতিতে ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়, যা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়েছে বলেই অনেকে মনে করছেন।

দুই. ২০১৭ সালে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, সেটা এখানে স্বীকার করা হয়েছে। ফলে অনেকে এটাকেও একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছে কেননা রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের কথা স্বীকার করা প্রকারান্তরে রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রের সহমর্মিতা প্রতিভাত হয়।

তিন. বিবৃতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে পালিয়ে যাওয়া ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

চার. ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিল করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ারও এক ধরনের প্রতিশ্রুতি এ বিবৃতিতে দেয়া হয়।

এসব প্রতিশ্রুতির ফর্দ দেখে সাদা চোখে পুলকিত হওয়ার অনেক রসদ পাওয়া যাবে কেননা এতে করে মনে হবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান মিয়ানমারের ছায়া-সরকারই দিয়ে দিয়েছে! কিন্তু বিষয়টি আদতেই অত সোজা নয়। কেননা যে ছায়া-সরকারের নিজেদেরই কোনো ভবিষ্যৎ নেই, সে আবার অন্যের ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয় কীভাবে? বরঞ্চ ছায়া-সরকারের এ বিবৃতি রাখাইনের জটিল পরিস্থিতি আরো জটিলতর করে তুলছে। কেননা এ বিবৃতির কারণে ছায়া-সরকার যেমন রোহিঙ্গা ছাড়া রাখাইনের অধিকাংশ জনগণের সমর্থন হারাচ্ছে তেমনি রোহিঙ্গারাও নতুন করে অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন টেনশন নিয়ে দিনতিপাত করছে।

বিষয়টি আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা যাক। ছায়া-সরকারের বিবৃতিটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই অল আরাকানিজ সরিডারিটি কমিটি (এএএসসি) একটি পাল্টা বিবৃতি প্রকাশ করে, যা রাখাইনে এক নতুন টেনশন তৈরি করে। উল্লেখ্য, এএএসসি হচ্ছে আরাকানের বিভিন্ন সিভিল সোসাইটগুলোর নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নেতা ও রাজনীতিক এবং আরাকান লিবারেশন পার্টির সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট। এখানে আরো মনে রাখা জরুরি যে, রাখাইনের জনগণের ওপর এএএসসির একটা ভালো প্রভাব আছে। এএএসসির মুখপাত্র ল্যাফটেনেন্ট কর্নেল খাইং খেয়া হ্লাই বলেছেন, ‘বাঙালি ইস্যুটি রাখাইনে খুবই বিপজ্জনক ইস্যু এবং এটার সঙ্গে রাখাইনের জনগণের একটা ভিন্ন মাত্রা সেনসিটিভিটি আছে। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা ছায়া-সরকার একটি সদ্য গঠিত বেসরকারি কাঠামোর সরকার। রাখাইনের বিদ্রোহী গ্রুপ, বিভিন্ন অংশীজন ও বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির সঙ্গে কোনো ধরনের সংলাপ না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা রাখাইনের পরিস্থিতি খারাপ করে তুলতে পারে।’ এ বক্তব্যে একটা পরোক্ষ হুমকি আছে।

এখানে বলে রাখা জরুরি যে, আরাকান লিবারেশন পার্টি ২০১৫ সালের অক্টোবরে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে একটা যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে বর্তমানে এর রাইভালরা এক ধরনের সিভিলিয়ান জীবন-যাপন করছে। কিন্তু রাখাইনের পরিস্থিতি খারাপ হলে এরা যে কোনো সময় আবার অস্ত্র হাতে তুলে নিতে পারে। তাছাড়া রাখাইনে অবস্থিত আরাকান আর্মি এখনো সশস্ত্রভাবে সক্রিয়। এর বাইরেও রাখাইনের বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্কও চরমভাবে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব পোষণ করে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, রাখাইনে অবস্থিত অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোও চরমভাবে রোহিঙ্গাবিরোধী একটি সেন্টিমেন্ট পোষণ করে। এ রকম একটি জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতায় মিয়ানমারের ছায়া-সরকারের রোহিঙ্গাদেরকে ‘রোহিঙ্গা’ বলে স্বীকৃতি দেয়া, তাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ ধরনের বিবৃতি প্রকাশ প্রকারান্তরে রাখাইনের পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলছে। কেননা ছায়া-সরকার গঠিত হয়েছে কেন্দ্রে কিন্তু রাখাইনের স্থানীয় অংশীজনের সঙ্গে কোনো ধরনের বোঝাপড়া না করে ওপর দিয়ে চাপিয়ে দেয়া কোনো নীতি কিংবা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনের পরিস্থিতি যে আরো কঠিন ও সংকটময় করে তুলবেÑ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এটা সহজেই বোধগম্য যে, মিয়ানমারের ছায়া-সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুটিক ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এক ধরনের সহানুভূতি এবং সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। কেননা ২০১৭ সালের আগস্টের রোহিঙ্গাদের ওপর যে জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে, সেজন্য বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গাদের সপক্ষে এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিপক্ষে একটা বিশ্বজনমত তৈরি হয়েছে। এখন যদি মিয়ানমারের ছায়া-সরকারের রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সংবেদনশীল হয় এবং সামারিক বাহিনীবিরোধী একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, তাহলে এ ছায়া-সরকার খুব স্বাভাবিক কারণেই আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করবে। কিন্তু ছায়া-সরকারের আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু যে একটা ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটা রাখাইনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুমান করা যায়। কেননা ছায়া-সরকারের এ বিবৃতি প্রকারান্তরে রাখাইনে নতুন করে একটি রোহিঙ্গাবিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে বসবাস করা কঠিন করে তুলবে। জটিল পরিস্থিতি আরো জটিলতর করে তুলবে। তাছাড়া সশস্ত্র যুদ্ধরত আরাকান আর্মিও ছায়া-সরকারের বিবৃতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ কয়দিন আগেও জান্তাবিরোধী আন্দোলনের রোহিঙ্গা এবং আরকানীরা একসঙ্গে জান্তাবিরোধী জোট করতে পারে কিনা সে সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ছায়া-সরকারের এ চিঠি রোহিঙ্গাদের রাখাইনে শান্তিতে বসবাসের এবং অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সহবাসের সম্ভাবনাকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

পরিশেষে বলব, বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানো। সামরিক সরকারের আমলে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতিই হয়নি। ছায়া-সরকারের এসব ট্রাম-কার্ড ট্রিক্স দেয়া রাজনীতির কারণে রোহিঙ্গারা পুনরায় সেনাবাহিনীর নতুন টার্গেটে পরিণত হয় কিনা, সেটাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। নাকি এসব বিবৃতির মাধ্যমে ছায়া-সরকার রাখাইনের পরিস্থিতি আরো রোহিঙ্গাবিরোধী করে তুলে তাদের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা চিরতরে বন্ধ করে রাখাইনে অল আরাকানিজ সরিডারিটি কমিটির (এএএসসি) জোর সমর্থন আদায়ের পরিকল্পনা করছে সেটাও হিসাবে বাইরে রাখা যাবে না। কোনো সম্ভাবনাকেই খাটো করে দেখার সুযোগ নো। কেননা পলিটিক্সে সময়মতো ল্যাং মারার কৌশল প্রয়োগের মধ্যেই বিজয় নিহিত থাকবে। আর রোহিঙ্গারা সবসময় এ ল্যাং মারা পলিটিক্সের শিকার।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়