জেনেভায় পুতিন-বাইডেন শীর্ষ বেঠক আশার বাণী শোনাবে কি বিশ্বকে

আগের সংবাদ

এ হান্ড্রেড পার্সেন্ট চেঞ্জ

পরের সংবাদ

নারীতে আপত্তি অসাংবিধানিক

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২১ , ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৬, ২০২১ , ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গার্ড অব অনার’ নিয়ে সংসদীয় কমিটির সুপারিশে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হলে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তাদের বাদ রাখতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের নারী অধিকার কর্মীরাও। এ ধরনের সুপারিশ কোনো সংসদীয় কমিটি করতে পারে কিনা, তা নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়েছে। এমনকি খোদ জাতীয় সংসদেই সুপারিশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাসীন দল ও জোটের সাংসদরা।

সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায় সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকেন। কফিনে সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। দেশের অনেক জায়গায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন নারী কর্মকর্তা, আর সেখানেই আপত্তি তুলেছে সংসদীয় কমিটি। মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার ক্ষেত্রে গত রবিবার নারী ইউএনওর বিকল্প ব্যবস্থার সুপারিশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

এ সময় কমিটি নারীর বিকল্প একজন পুরুষ ম্যাজিট্রেট বা সমমানের কর্মকর্তা দিয়ে গার্ড অব অনার দেয়ার সুপারিশ করে। এ ধরনের সুপারিশ অসাংবিধানিক ও নারীসমাজের প্রতি অসম্মানজনক বলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় দেশের নারী সংগঠন ও নারীনেত্রীরা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে- মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনারে নারী ইউএনওর বিকল্প ব্যবস্থা করার সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব সংবিধানবিরোধী। তারা এ প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করেন। অবিলম্বে এ প্রস্তাব প্রত্যাহার করা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানান তারা।

এ বিষয়ে গতকাল ভোরের কাগজের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির সদস্য ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বার কাজী ফিরোজ রশীদ। তিনি বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার দেয়ার সময় সাধারণত সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনওরা উপস্থিত থেকে ফুলের মালা দেন বা সম্মান প্রদর্শন করেন। কিন্তু স্থানীয় এলাকা থেকে অনেক সময় এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। কেননা ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী নারী ইউএনওরা যেহেতু কবরস্থানে যান না, সে কারণে এসব ক্ষেত্রে নারী ইউএনওর বিকল্প কোনো পুরুষ ম্যাজিস্ট্রেট বা সমমানের পুরুষ কর্মকর্তারা যাতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনারে উপস্থিত থাকেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছি আমরা। এছাড়া দিনের বেলায় গার্ড অব অনারের ব্যবস্থারও কথা বলেছে কমিটি। তবে সংসদীয় কমিটির এমন সুপারিশ দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংবিধানের ১৯-এর ৩ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন’। আর ২৯-এর ২ উপধারায় বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষ বা ধর্মীয় বিবেচনায় কারো প্রতি বৈষম্য দেখানো যাবে না।

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে গতকাল মঙ্গলবার সংসদীয় কমিটির এ প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন জাসদ সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এবং সরকারদলীয় সাংসদ নারী ও শিশুবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ সুপারিশের প্রসঙ্গ টেনে শিরীন আখতার বলেন, আমি বিস্মিত, হতবাক ও ব্যথিত- এমন বিষয় আমার সহকর্মীরা উত্থাপন করতে পেরেছেন। সংবিধানে বলা আছে, নারী-পুরুষে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। সেই দেশে যখন এই ঘটনা ঘটে, তখন আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই।

এ বিষয়ে শিরীন আখতার আরো বলেন, সংসদীয় কমিটিতে যুক্তি এসেছে নারী যেহেতু জানাজায় অংশ নিতে পারে না, সেজন্য গার্ড অব অনারে নারী যেন না থাকে। তিনি বলেন, জানাজা ও গার্ড অব অনার এক নয়। আমি এ রকমও শুনেছি, এক জেলায় একজন স্মারকলিপি দিয়েছে কোনো হিন্দু যাতে মুসলমান মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান না জানায়। যখন দেশজুড়ে মৌলবাদের আস্ফালন দেখা যাচ্ছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাছ থেকে এমন সুপারিশ এসেছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করি, যাতে এ রকম কলুষিত সিদ্ধান্ত না নেয়া হয়।

নারী ও শিশুবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন দেশে নারীর উন্নয়নে এত কিছু করছেন, নারী ও পুরুষের সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতির জন্য কাজ করে চলেছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদেরই সংসদ সদস্যরা কীভাবে নারী ইউএনওদের এভাবে অসম্মানিত করতে পারেন। নারী ইউএনওরা কেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনারে অংশ নিতে পারবেন না। এটা সমগ্র নারীর প্রতি অসম্মান। এতে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাপ্রাপ্ত হবে।

তিনি ইসলামের নামে নারীদের ক্ষমতায়নের বিরোধিতার তীব্র সমালোচনা করেন। চুমকি বলেন, কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় কমিটির এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া যায় না। আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাব তিনি যেন বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন। এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ভোরের কাগজকে জানান, আমাদের সংবিধানে নারী ও পুরুষকে সমানাধিকার দেয়া হয়েছে। তাই গার্ড অব অনারে নারী ইউএনও থাকতে পারবেন না, এমন সুপারিশ নিতান্তই অবান্তর, যা সংবিধানের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্র্ষিক।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে। তাই কে নারী, কে পুরুষ, তা পৃথক করার কোনো বিষয় নেই; এখানে পদাধিকারটাকেই আগে ধরতে হবে। তাই এ নিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন হলো কিনা, এসব প্রশ্ন অবান্তর। কেননা কোনো সংসদীয় কমিটি কী বলল, কী সুপারিশ করল, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমাদের নেই। অনেকে অনেক কথা বলতে পারে, তবে তা গ্রহণযোগ্য কেন হবে? আমরা তো সমানাধিকারে বিশ্বাসী। আর যারা সংসদীয় কমিটিতে এসব কথা বলেছেন, তাদের এ বিষয়ে বলার এখতিয়ার কতটুকু তাও ভাবতে হবে। আসলে সংসদে অনেক কিছুই হচ্ছে বা হয়, সবটাই কি সংবিধানসম্মত? এমন প্রশ্ন তোলেন এ আইনবিশারদ।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়