দেশ যেন টিকা না পায়, লবিস্ট নিয়োগ করেছে তারেক: নানক

আগের সংবাদ

রাজশাহীতে আষাঢ়ে বৃষ্টি

পরের সংবাদ

পরীমনিকাণ্ডে যেসব প্রশ্নের সদুত্তর খুঁজছেন কর্মকর্তারা

প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২১ , ১১:১৭ অপরাহ্ণ আপডেট: জুন ১৫, ২০২১ , ১১:২৩ অপরাহ্ণ

আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনি ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও নির্যাতনের অভিযোগে সাভার মডেল থানায় করা মামলার অনেক প্রশ্নেরই জবাব মিলছে না। পূর্বাপর ঘটনা ও এজাহারের বর্ণনায় রয়েছে নানা অসঙ্গতি। বনানীর বাসা থেকে গভীর রাতে কস্টিউম ডিজাইনার জিমি, ঘনিষ্ঠজন অমি ও ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে কেন উত্তরার উদ্দেশে বের হয়েছিলেন সে প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পাচ্ছে না পুলিশ। বাসা থেকে উত্তরায় যাওয়ার কথা বললেও সেখানে না গিয়ে ভিন্ন পথ ধরে অমির কারণে কেন সাভারের বিরুলিয়ার ঢাকা বোট ক্লাবে গেলেন তারও সুস্পষ্ট জবাব নেই। পরীর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ ও চেনাজানা অমি- যিনি কিনা তার সঙ্গে এক বাসা থেকে বের হলেন; সেই তিনিই কেন বোট ক্লাবে নিয়ে পরীকে হেনস্থায় আরেকজনকে সায় দিলেন- পরীর এমন দাবিরও সদুত্তর মিলছে না। গত সোমবার দুপুরে সাভার মডেল থানায় পরীমনির মামলা রেকর্ড হলেও তা আগের রাতে বনানীর বাসায় গিয়ে লিখে আনে ঢাকার রূপনগর থানা পুলিশ। মামলার মূল দুই আসামি নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমি গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার (১৫ জুন) আদালত তাদের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। মিন্টো রোডে ডিবি অফিসে রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে এজাহারের বর্ণনায় রয়েছে গড়মিল ও অসঙ্গতি। যা জানতে গতকাল বিকালে ডিবি অফিসে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা পরীমনিকে ডেকে কথা বলেন। সে সময়ও তার কথায় আগের বর্ণনার সঙ্গে হেরফের লক্ষ্য করেন কর্মকর্তারা। পুরো সময়জুড়ে তার সঙ্গে ছিলেন নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী।

জানা গেছে, এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে পরীমনি তার বনানীর ফ্ল্যাট (বাড়ি নং-১২, রোড নং-১৯/এ) থেকে ৮ জুন বুধবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে কস্টিউম ডিজাইনার জিমি (৩০), তার বন্ধু ও পরীর পূর্বপরিচিত তুহিন সিদ্দিকী অমি (৪০) এবং ছোট বোন বনিসহ (২০) দুটি গাড়ি করে উত্তরার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে অমি তাকে বলেন বেড়িবাঁধের ঢাকা বোট ক্লাব লিমিটেডে তার দুই মিনিটের কাজ আছে। অমির কথামতো তারা ওই ক্লাবে যান। এখানে প্রশ্ন উঠেছে, বনানী থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে কোনোভাবেই বেড়িবাঁধের পাশের ওই বোট ক্লাব পড়ে না। উত্তরা থেকে ওই ক্লাবের দূরত্ব অনেক ও পরীর সেখানে কাজ থাকলে তা না করে আগে কেন দিয়াবাড়ির অদূরের ওই বোট ক্লাবে গেলেন? এজাহারে পরী বলেছেন, ৯ জুন বৃহস্পতিবার রাত অনুমানিক ১২টা ২০ মিনিটে ক্লাবের সামনে তারা গাড়ি দাঁড় করান। কিন্তু বোট ক্লাব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অমি কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। তখন ঢাকা বোট ক্লাবের নিরাপত্তারক্ষীরা দরজা খুলে দিলে অমি ভিতরে যান ও আবার বের হয়ে অনুরোধ করে বলেন, এখানকার পরিবেশ অনেক সুন্দর তোমরা নামলে নামতে পারো। ইতোমধ্যে পরীর ছোট বোন বনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার কথা বললে তারা ঢাকা বোট ক্লাবে প্রবেশ করে বারের কাছের টয়লেট ব্যবহার করেন। প্রশ্ন উঠেছে, ওই ক্লাবে প্রবেশ করে আশপাশে আরো টয়লেট থাকলেও তারা কেন বারের পাশের টয়লেট ব্যবহার করলেন? ক্লাবের স্টাফরা বলছেন, পরীমনি সেখানে প্রবেশের সময় মদ্যপ ও বেসামাল ছিলেন। ক্লাবের সিসিটিভি ফুটেজেও তেমনি দেখা যায়। ক্লাবে প্রবেশের আগেই তারা মদপান করেন। পরীর কস্টিউম ডিজাইনার জিমি ছিলেন হাফপ্যান্ট পরা। ক্লাবের ড্রেসকোড অনুযায়ী তার সেখানে ঢুকতে পারার কথা নয়। পরীর কারণে তিনিও সেখানে নিয়ম ভেঙে ঢুকেছেন। আর পরী, জিমি, অমি, ববি সবাই ঘনিষ্ঠ বিধায় তারা একসঙ্গে পরীর বাসা থেকে বের হন। সবাই যখন ঘনিষ্ঠজন এবং অমিও তার প্রিয়ভাজন; তখন তাদের সামনে বা উপস্থিতিতে নাসির উদ্দিন মাহমুদ কিভাবে পরীকে হেনস্থা বা ধর্ষণ চেষ্টা করেন? অমিই বা কিভাবে নাসিরকে সহায়তা করেন?

এজাহারে পরী বলেছেন, টয়লেট থেকে বের হতেই আবাসন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ (৫০) তাদের ডেকে বারের ভেতরে বসার অনুরোধ করেন ও কফি পান করতে দেন। তারা বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলে অমি ও নাসির মদপান করার জন্য জোর করেন। এ অবস্থায় নাসির জোর করে পরীর মুখে মদের বোতল ঢুকিয়ে তা পান করানোর চেষ্টা করেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, মদপান না করলে তিনি মাতাল হলেন কি করে? কারণ বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূরে আযম মিয়া ভোরের কাগজকে বলেছেন, বুধবার রাত ৩টার দিকে (বৃহস্পতিবার) পরীমনি, তার সঙ্গে একজন পুরুষ ও অপরজন মহিলাসহ থানায় যান। তারা সেখানে ১৫-২০ মিনিট অবস্থান করেন। তখন পরী মদ্যপ অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ করেন। পরে পুলিশ তাকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যায় ও পাকস্থলী ‘ওয়াশ’ করানো হয়। পরীতো নিজেই বলছেন তাকে মদপান করানোর চেষ্টা করানো হয়েছিল। তাই প্রশ্ন উঠেছে, জোর করে পান করানোর চেষ্টার সময় যে পরিমাণ মদ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে তাতে বেসামাল হওয়ার কথা নয়। আর বনানী থানার আশপাশে অনেক হাসপাতাল থাকলেও থানা পুলিশ কেনই বা তাকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে গেল? এছাড়া বোন বনি ও জিমির সঙ্গে হাসপাতাল থেকে পরী তার বনানীর বাসায় পৌঁছানোর পরও প্রায় অচেতন ছিলেন বলেও দাবি করেছেন। জোরপূর্বক মুখে মদ ঢালা হলে কী কেউ অচেতন হন এ প্রশ্নেরও জবাব মিলছে না। এজাহারে পরীর দাবি, তিনি সামনের দাঁতে ও ঠোঁটে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। নাসির তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করাসহ শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতরস্থানে স্পর্শ করে ও জোর করে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্লাবের ফুটেজে দেখা যায়, পরী বার থেকে মদের বোতল নিতে চাইলে স্টাফদের সঙ্গে তার বিতণ্ডার একপর্যায়ে তিনি নাসিরের দিকে বোতল ছুড়ে মারেন। পরে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। পরী বলছেন, তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল দিতে গেলে তার ব্যবহৃত ফোনটি টান মেরে ফেলে দেন এবং পুনরায় ফোনটি উঠিয়ে কল দিতে চাইলে আবারো ফোনটি টেনে ফেলে দেন নাসির। এক্ষেত্রে ফোনের গ্লাস ভেঙে যাওয়া বা স্পট পড়ার কথা। তার ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার দাবি উঠেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, ৯ জুন বৃহস্পতিবার ভোররাতে পরীমনি বাসায় গিয়ে পরে আর কেন অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলেন না? ঢাকা বোট ক্লাবের সভাপতি, পুলিশপ্রধান ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, পরী চাইলে ডিএমপি কমিশনার কিংবা তাকে ফোনে বা এসএমএস করেও বিষয়টি জানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি কেন তা করেননি এ প্রশ্নের জবাব তিনিও খুঁজছেন। অন্যদিকে বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানাতে তিনি কেন কালক্ষেপণ করলেন সে প্রশ্নেরও জবাব মিলছে না। পরী ওই রাতে উত্তরায় কার কাছে কেন যাচ্ছিলেন তার কোনো বর্ণনাও নেই এজাহারে। ওই রাতের ঘটনা তিনি শিল্পী সমিতির নেতাদের কাছে পুরোপুরি খোলাসা করে কেন পুলিশি সাহায্য চাননি তা নিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় বইছে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন।

এদিকে ঢাকার একাধিক সোশ্যাল ক্লাবের কর্মকর্তারা আজ জানিয়েছেন, রাত ১১টার পর কোনো ক্লাবে ড্রিংকস (মদ, বিয়ার) সার্ভ করা হয় না। কিন্তু পরীমনি প্রায়ই বিভিন্ন ক্লাবে দলবল নিয়ে মধ্যরাতে গিয়ে মদ চেয়ে থাকেন। এক ক্লাবে পান করে আরেক ক্লাবে যাওয়া তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে।

আরেকটি ক্লাবেও বিশৃঙ্খলা করেন পরীমনি : দুই সপ্তাহ আগে ৩ জুন মধ্যরাতে (বৃহস্পতিবার) পরীমনি গুলশানের একটি অভিজাত ক্লাবে ঢুকে মদ্যপ অবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। ক্লাব কর্তৃপক্ষ তার উশৃঙ্খল আচরণ থামাতে বললে তিনি আরো উত্তেজিত হয়ে উঠেন। বেগতিক পরিস্থিতিতে পরী নিজেই গুলশান থানায় কল করে পুলিশ ডাকেন। থানা থেকে দুটি পিকআপ সেখানে পৌঁছে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বুঝতে পারেন পরী নিজেই অপরাধী। তখন পুলিশ তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। ওই রাতে পরীর সঙ্গে ছিলেন তার প্রাক্তন স্বামী তামীম ও বেসরকারি ‘সময় টিভি’র শেয়ার হোল্ডার আখতার বাবু। গুলশান পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, সাভার কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী পরীমনির ওই কলেজের ইংরেজি বিভাগের এক প্রভাষকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। সেই সংসার টিকে মাত্র দুইদিন। চলচ্চিত্রে নাম লেখানোর পর উঁচু শ্রেণিতে তার উঠাবসা। কিন্তু অভিনয়ের কারণে তিনি যে সম্মানি পান তা তার জীবনযাত্রার সঙ্গে বেমানান। ব্যক্তিগত সফরেও ঘুরে বেড়ান হেলিকপ্টারে। অভিনয়ের কাজ ছাড়াও উড়ে যান দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ ভিন দেশে।

আরআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়