প্রযুক্তিনির্ভর বজ্রপাত নিরোধক জরুরি

আগের সংবাদ

এই যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী হবে?

পরের সংবাদ

তালেবান-মার্কিন চুক্তি : কিছু প্রশ্ন, কিছু প্রত্যাশা

প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২১ , ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১৪, ২০২১ , ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ অবসানের ঘোষণা এসেছে ইতোমধ্যে। দীর্ঘ ২০ বছর পর ১ মে থেকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরুর ঘোষণা এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছ থেকে। কথা মতো ১ মে শুরু হয়েছে সেনা প্রত্যাহার। আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিনি প্রায় ২ হাজার ৫০০ আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে ন্যাটো জোটও তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। আফগানে চলা এই স্থায়ী যুদ্ধে আমেরিকার প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে; প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানে এ যুদ্ধে প্রায় ৩৮ হাজার সামরিক-বেসামরিক মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। প্রায় ৭২ হাজার আফগান নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে।
২০০১ সালে নিউইয়র্কেও টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত আফগানিস্তানের মাটিতে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে যুদ্ধ করে আসছে আমেরিকা। পাকিস্তানের এবোটাবাদে আলকায়দা নেতা উসামা বিন লাদেনকে হত্যার মাধ্যমে আমেরিকা মনে করেছিল, তারা বোধ হয় সন্ত্রাসবাদের ইতি টানতে পেরেছে। কিন্তু আফগানিস্তানের বাস্তবতা সব সময়ই অন্য কথা বলেছে। তালেবান সেখানে সব সময়ই শক্তিশালী ছিল। সুযোগ পেলেই তালেবানরা আফগান সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা করে চলেছে। তাই আমেরিকান সেনাদের আর আফগান ছাড়া হয়নি। পৃথিবীর কারো সন্দেহ থাকার কোনো সুযোগ নেই যে, তালেবান একটি উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তালেবান নিজেকে রাজনৈতিক দল মনে করলেও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রাজনৈতিক দলের কোনো বৈশিষ্ট্যই তারা ধারণ করে না। এমনটা আমেরিকাও মনে করে। শুধু মনে নয়, ২০০১ সাল থেকে এ কথা তারা বারবার ঘোষণা করেছে। তালেবানের শক্তি ধ্বংসের কাজটি আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনী কিংবা আমেরিকান বাহিনী কেউ সম্পূর্ণভাবে করতে পারেনি। কখনো কখনো হয়তো তাদের সামর্থ্যরে কিছুটা ক্ষতি করা গেছে মাত্র। তাই আমেরিকার সেনাদের আর আফগানিস্তান ছেড়ে দেয়ার কথা মনে আসেনি কখনো। ২০ বছর ধরেই তারা সেখানে আছে। কিন্তু এবার বাইডেন ক্ষমতায় এসেই এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পেরেছেন। তারা এ সিদ্ধান্তটি গত ২০ বছরে নিতে পারল না কেন- এ প্রশ্নটি জাগছে বিশ্ববিবেকের কাছে। ২০০১ সালে তালেবানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যা ছিল, ২০২১ সালে এসেও তা-ই আছে। সেদিন যা সত্য ছিল, আজো তা সত্য আছে। তবে আজ কেন এ সিদ্ধান্ত? কিন্তু তারপরও ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন এবং তালেবানদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি হওয়ার পর থেকে ১৪ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব সেনা সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট। খুবই সহজ সমীকরণে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তালেবানকে মেনেই নিল শেষ পর্যন্ত। তাদের সঙ্গেই হলো তাদের চুক্তি। তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে করে কি ক্লান্ত আমেরিকা? চুক্তিটি হয়েছিল ট্রাম্প শাসনামলে। বাইডেন প্রশাসনও মেনে নিল চুক্তিটি।
আমেরিকার সঙ্গে তালেবানের এ চুক্তি আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় রকম সুফল এনে দেবে- এমনটা কোনো বোকাও ভাববে না। এটি আমেরিকার প্রস্থানের একটি উপলক্ষ মাত্র। এ চুক্তির ফলে এবং আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনাদের চলে যাওয়ার পরে আফগান সাধারণ নাগরিকরা কতটুকু শান্তিতে থাকবে সেটিই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এ চুক্তির ফলে তালেবানদের সাহস, দৌরাত্ম্য এবং বিচরণ অনেকটাই বেড়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। মার্কিন-তালেবান চুক্তিটি তালেবানদের একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবেই গণ্য করার সুযোগ রয়েছে। আমেরিকা কোনো দেশেই জোর করে বেশি দিন থাকতে পারেনি। তবে আফগানিস্তানে তাদের অবস্থান ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। সেখান থেকেও তারা ন্যক্কারজনকভাবে এবং সমস্যার সমাধান না করেই বিদায় হচ্ছে।
বাইডেনের এ সিদ্ধান্ত আমেরিকার অভ্যন্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। স্বয়ং ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস বলেছেন, সিদ্ধান্তটি ঘোষণা করার আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি। রিপাবলিকান তো বটেই, ডেমোক্র্যাটদেরও একাংশ এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে। আমেরিকার এ সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক মহলে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি এ সিদ্ধান্তে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করেছে কূটনৈতিক মহল। ভারত সেখানে একধাপ এগিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয় টেনে এনেছে। ভারত মনে করছে, আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার হলে সেখানে জেঁকে বসবে তালেবান; আর তাতে লাভবান হবে পাকিস্তান। ভারতের মাথাব্যথা সেখানেই। তুরস্কের আয়োজনে ইস্তাম্বুলে শুরু হওয়ার কথা আফগানিস্তানে শান্তি ফেরানো সংক্রান্ত আলোচনা চক্র। সেখানে যোগ দেয়ার কথা ভারত, পাকিস্তান, আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ ২০টি দেশের। তারপরও ভারত তার মাথাব্যথার কথা জানিয়েছে আমেরিকাকে। ভারত আমেরিকাকে জানিয়েছে, আফগানিস্তানে তালেবান নেতৃত্বে হিংসা কমানোর প্রতিশ্রুতি যতক্ষণ না বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করার কাজটি আমেরিকার জন্য সঠিক হবে না। আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় তুরস্ককে শামিল করার আমেরিকান ঘোষণাকেও ভারত আপত্তির চোখে দেখেছে।
মার্কিন এবং ন্যাটো সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সংকটাপন্ন হতে পারে। তাদের অনুপস্থিতি আফগানিস্তানকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তালেবানই শুধু আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় সমস্যা, তা নয়। তালেবান ছাড়াও আফগানিস্তানে আরো অনেক সশস্ত্র গ্রুপ বিদ্যমান আছে। আমেরিকার সঙ্গে তালেবানের শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ঠিক দুদিন পরই তালেবান যোদ্ধাদের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলা করা হয়েছিল। অন্য সশস্ত্র গ্রুপ যেন বলে দিল- শুধু তালেবানই নয়, আফগানিস্তানে আমরাও আছি। তবে এ কথাও ঠিক যে, তালেবানের শক্তিই সেখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শক্তি। আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তান পুনরায় তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তালেবান ইতোমধ্যে ১৯৯৬-২০০১ সময়ে সরাসরি আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। সে সময়ের আফগানিস্তানে চলা সহিংসতা আজো বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষকে তাদের ব্যাপারে ভীত করে। বহু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর দেশ আফগানিস্তানকে পুনরায় গৃহযুদ্ধের একটি অবস্থা উপহার দিতে পারে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার। প্রথমে তালেবান এবং পরে স্বার্থভিত্তিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি আফগানিস্তানে আত্মনির্ভরশীল ও স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হিসেবে কাজ করেছে এ যাবৎকাল পর্যন্ত। ফলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত সহজ-সরল আফগানরা স্বনির্ভর স্বাধীন রাষ্ট্রের বিনির্মাণ কখনো করতে পারেনি। আফগানিস্তানের মানুষকে আজ তাই নতুন করে তাদের নীতি বদলানোর পথে কাজ করতে হবে। দেশটি তাদের। তাদেরকেই এর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে। পশ্চাৎপদ এবং অন্যায্য মানসিকতা পরিত্যাগ করে তালেবানসহ সব আফগানকেই বিদেশি রাষ্ট্রের পাহারা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিজস্ব ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে। জোর দিতে হবে আফগান জনগণের মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নের পরিক্রমার ওপর। এ কাজটি যে বিদেশিদের দিয়ে সম্ভব নয়, গত ২০ বছরে আমেরিকান সেনার উপস্থিতি নিশ্চয়ই আফগানদের এ শিক্ষা প্রদান করেছে। আমেরিকানরা দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে ঠিকই, কিন্তু তার এক কপর্দকও তালেবানসহ আফগান জনগণের আধুনিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করেনি। আত্মনির্ভরশীল হতে পারলেই আফগানিস্তান কাজে লাগাতে পারবে তার বিপুল পর্যটন সম্ভাবনার সুযোগ। ফল ও কৃষিপণ্য উৎপাদনে রয়েছে তাদের বিপুল সম্ভাবনা। মার্কিন-তালেবান চুক্তি সে পথে কতটা কাজে লাগবে, তা কেবল ভবিষ্যতের আফগানিস্তানই বলে দেবে। কেননা চুক্তিটির কোনো পর্যায়েই আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকদের কোনো ভূমিকা নেই। যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আখ্যা দিয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করলেও সেই তালেবানের সঙ্গেই শান্তি চুক্তি করে বসল ঠিক ২০ বছর পর। কিন্তু শান্তি চুক্তিটি যখন করল, তখন তালেবান আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় বলবৎ নেই। তাহলে এ চুক্তি এবং তার ফল কী করে আফগানিস্তানে শান্তির পরশ দেবে- তা-ই ভেবে চলেছে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ মহল।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়