ইন্টারনেটের একক মূল্য বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা

আগের সংবাদ

বাংলা শুধু একটি নামই নয়

পরের সংবাদ

পদায়ন জটে পদোন্নতির বোঝা

প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২১ , ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১২, ২০২১ , ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ

পদোন্নতি পেয়েও ‘পদায়ন জটে’ পড়েছেন সরকারি কলেজের ৪ হাজার শিক্ষক। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এসব শিক্ষকের পদোন্নতি হলেও গত পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের নিজ নিজ পদে পদায়ন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পদোন্নতি পেয়েও ‘ইনসিটু’ থেকে নিচের পদে কাজ করা শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক পদে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন, সহযোগী অধ্যাপক পদে ১ হাজার ৩০০ এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ১ হাজার ৫৫০ জন বলে জানিয়েছেন মাউশির কলেজ শাখার সহকারী পরিচালক দেলোয়ার হোসেন।

এ মুহূর্তে সরকারি কলেজে ৮৫০ জন শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে অধ্যাপক পদে ১৬০, সহযোগী অধ্যাপক পদে ২৯০ এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ৪০০ পদ ফাঁকা। সেই পদ পূরণ না করে এ রকম ‘ভজঘট’ পরিস্থিতিতে নতুন করে আরো হাজারখানেক সহকারী অধ্যাপককে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সব কাজ শেষ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি স্বাক্ষর করলেই শিক্ষকদের নতুন পদোন্নতির আদেশ জারি করবে মন্ত্রণালয়। সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

২০১৫ সালে শিক্ষা ক্যাডারে সাড়ে ১২ হাজার পদ সৃষ্টির যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, তা জনপ্রশাসন আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ‘চরকিপাক’ খাচ্ছে। এতে পদও বাড়ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, যেখানে গত পাঁচ বছর আগে যারা পদোন্নতি পেয়েছিলেন, তাদেরই এখন পর্যন্ত পদায়ন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়; সেখানে নতুন করে পদোন্নতি দেয়া হলে তাদের কোথায় পদায়ন করা হবে- বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তবু যদি পদোন্নতি দেয়া হয়, তাহলে নতুনদেরকেও পূর্বসূরিদের মতোই ‘ইনসিটু’ থেকে নিচের পদে কাজ করতে হবে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে। আর সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতির সংগঠন বিসিএস শিক্ষা সমিতির কিছু সাবেক নেতা এ নিয়ে ‘নোংরা খেলা’ খেলতে চাইছে। শিক্ষকদের আরেক সংগঠন স্বাধীনতা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সংসদ পুরো বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক ভোরের কাগজকে বলেন, কদিন আগেই সরকারি কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিষয়টি চ‚ড়ান্ত করা হয়েছে। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সরকারি আদেশ জারি করা হবে। গেল মে মাসের শেষ সপ্তাহে পদোন্নতি চ‚ড়ান্ত হলেও এখন আদেশ জারি হয়নি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা মন্ত্রণালয় বলতে পারবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন পদোন্নতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। দফায় দফায় এ সচিবের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদোন্নতি ছাড়া অন্য কিছু জানার থাকলে বলুন, উত্তর দিচ্ছি। তবে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শূন্য থাকা পদগুলোর বেশির ভাগই দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কলেজগুলোয়। ওসব জায়গায় কোনো শিক্ষকই যেতে চান না। এতে শহরভিত্তিক কলেজে শুধু পদায়ন হয়।

স্বাধীনতা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সংসদের সদস্য সচিব ও রাজধানীর মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ জাফর আলী ভোরের কাগজকে বলেন, শিক্ষা ক্যাডার বরাবরই বঞ্চিত। এর মধ্যে বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষকদের পদোন্নতি ও পদায়নে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছে না। এতে শিক্ষকরা খুবই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিসিএস শিক্ষা সমিতির সাবেক নেতারা সংগঠনকে অকার্যকর করে রেখেছেন। এতে শিক্ষকরা তাদের দাবিদাওয়া সরকারের কাছে পেশ করতে পারছেন না।

বিসিএস শিক্ষা সমিতির সদ্য বিলুপ্ত হওয়া কমিটির সভাপতি ও ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আই কে সেলিম উল্যাহ খন্দকার ভোরের কাগজকে বলেছেন, পদায়ন বেশি দেখলেই হবে না। কারণ আমাদের প্রাপ্যতা বেশি, কিন্তু সেই প্রাপ্যতা পূরণ হচ্ছে না।

বিসিএস শিক্ষা সমিতি অকার্যকরের কারণে শিক্ষা ও শিক্ষকদের ক্ষতি হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই। মূল জায়গা নড়বড়ে থাকলে সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি সমিতির সাবেক একজন নেতার কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেখানে সমিতির কোনো কর্মকাণ্ড নেই, সেখানে কেউ কেউ শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় সাধারণ শিক্ষকদের কাছে বেচে খাচ্ছেন। কোভিড পরিস্থিতির উন্নতি হলেই আমরা এর একটা বিহিত করব।

শিক্ষা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষকদের চাওয়া হচ্ছে, প্রতি বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে দুবার পদোন্নতি হবে। এজন্য ব্যাচভিত্তিক অথবা যোগ্যতাভিত্তিক কিংবা শূন্যপদের বিপরীতে শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মাউশির পরিচালকের (কলেজ ও প্রশাসন) দপ্তর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠাবে। কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষকের অভিযোগ মাউশির কলেজ ও প্রশাসন দপ্তর সেই কাজ ঠিকমতো করে না। যদিও মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠায়, তাতে কেন শিক্ষকদের পদোন্নতি দিতে হবে, তা নিয়ে কোনো কঠিন যুক্তি থাকে না। এতে অনেক সময় পাঁচ সদস্যের পদোন্নতি কমিটি মনঃপূত না হয়ে আইনের বিভিন্ন ধারামতে কাজ করে যায়। এতে অনেক সময় শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় সুবিধা পান না।

শিক্ষকরা এটাও বলেছেন, প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে পর্যাপ্ত পদ না থাকা সত্ত্বেও সুপার নিউমারি করে তারা ঠিকই পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে তা সম্ভব হয় না। কারণ সুপার নিউমারি করতে গেলে পদোন্নতি সভায় যে রকম যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়, তা মাউশির পরিচালকের (কলেজ ও প্রশাসন) প্রস্তাবনায় থাকে না। শিক্ষকরা এটাও বলেছেন, মাউশি মহাপরিচালক আলঙ্কারিক পদ। সব কাজ করেন পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন)। কিন্তু পরিচালকের কাজে অসন্তুষ্ট শিক্ষা ক্যাডারের বেশির ভাগ সদস্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেছেন, সরকার নতুন করে শূন্যপদের বিপরীতে সহযোগী অধ্যাপক পদে হাজারখানেক শিক্ষককে পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত মনঃপূত হয়নি মাউশির পরিচালকের (কলেজ ও প্রশাসন)। গত ৩০ মে সাবেক বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী রাজধানীর পল্টনের মেহেরবা প্লাজায় বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির অফিসে প্রায় ৩ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। সেখানে ২২ থেকে ২৬ ব্যাচের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, অন্য সব ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেয়া হলেও শিক্ষা ক্যাডারে হয় বিষয়ভিত্তিক। সে হিসেবে ২২ থেকে ২৬ ব্যাচের ৩ হাজার ৩০৮ জন সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির যোগ্য রয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পদোন্নতি সভার বৈঠকে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ম অনুসারে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও মনে করছে, করোনার মধ্যে যেখানে প্রায় দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, সেখানে তিন হাজার শিক্ষকের পদোন্নতির দাবি তোলাই অবান্তর। সবাইকে পদোন্নতি দিতে হলে প্রায় দুই হাজার সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করতে হবে, যা সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রী, সচিবসহ প্রায় সবাই শূন্য থাকা হাজারখানেক পদে পদোন্নতি দেয়ার পক্ষে। অথচ শিক্ষা অধিদপ্তরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে বসে শাহেদুল খবির চৌধুরী সরকারের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি তিনি বৈঠক করে শিক্ষকদের উসকে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষকরা বলেছেন, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির এখন কোনো কমিটি নেই। অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী ছিলেন বিদায়ী কমিটির মহাসচিব। আসন্ন নির্বাচনে তিনি আবার প্রার্থী হতে পারেন। প্রার্থী হলে যাতে তিনি অনায়াসে ভোটে জিতে যেতে পারেন, সেজন্য পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে সমিতির অফিসে গিয়ে সাধারণ শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠক করেন। মূলত শিক্ষকদের কল্যাণে কাজ না করে এখন তাদের আবেগ নিয়ে খেলতে চাইছেন মাউশি পরিচালক।

জানতে চাইলে অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, পদোন্নতি সভার আগে আমরা সংশ্লিষ্টদেরকে বলেছি পদোন্নতিযোগ্য ৩ হাজার ৩০৮ জনকেই পদোন্নতি দিতে হবে। তিনি বলেন, নতুন করে পদোন্নতি দিলেও সরকারের আর্থিক কোনো ক্ষতি হবে না। শিক্ষকদের শুধু পদ পরিবর্তন হবে এবং এটা দেয়া উচিত। তাতে সব শিক্ষক উপকৃত হবেন বলে জানান তিনি।

সাড়ে ১২ হাজার পদ সৃষ্টি এবং মাউশিতে দুজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব : ২০১৩ সালে শিক্ষা ক্যাডারে নতুন করে ১২ হাজার ৫১৯টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেয়া হলেও তা সাত বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালির মধ্যেই পুরো বিষয়টি ‘চরকিপাক’ খাচ্ছে। একই সঙ্গে মাউশিতে আরো দুই অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টির বিষয়টিও ঘূর্ণায়মান।

শিক্ষকরা বলেছেন, শিক্ষা ক্যাডারে যদি সাড়ে ১২ হাজার পদের সৃষ্টি হতো, তাহলে আরো বহু শিক্ষকের পদোন্নতি হতে পারত। একই সঙ্গে মাউশিতে আরো দুজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি হলে কাজের গতি বাড়ত। এতে শিক্ষকসহ সাধারণ মানুষ বেশি সেবা পেতেন। কিন্তু প্রস্তাবগুলো ঘুরছে। কবে বাস্তবায়ন হবে, তা কেউ বলতে পারছে না। শিক্ষকরা বলেছেন, এ না হওয়ার পেছনে মাউশির পরিচালকের (কলেজ ও প্রশাসন) দায় রয়েছে। কারণ দুই অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি হলে পরিচালকের খবরদারি কমে যাবে। এজন্য তিনি পদ সৃষ্টির বিষয়ে ধীরগতিতে চলছেন।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়