×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সাময়িকী

সেলিনা স্নেহের ও ভালোলাগার মানুষ

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২১, ১২:১৫ এএম

সেলিনা স্নেহের ও ভালোলাগার মানুষ
হাসান আজিজুল হক সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক। বয়সে আমার অনেক ছোট হলেও লেখালেখির সময়টা নেহাত কম নয়। তাঁকে ছাত্র অবস্থায় আমি দেখিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সময় তিনি ছাত্র ছিলেন, সেই সময়টায় আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিনি। যতদূর মনে পড়ছে, আমি তাঁকে প্রথম দেখেছি বাংলা একাডেমিতে। ততদিনে তাঁর একটি-দুটি উপন্যাস লেখা হয়েছে এবং ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। আমার পড়াও হয়েছে তখনই। এই উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের উপরে লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে খুব উল্লেখযোগ্য। দু-চারটে নাম করলেই এই উপন্যাসটির নাম করতে হয়। সেন্টিমেন্টাল বলা যায়, আবার মর্মস্পর্শীও বলা যায়। সেলিনাকে আমি বাংলা একাডেমিতেই প্রথম দেখেছি। আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ নূরুল হুদা, সুব্রত বড়ুয়া এরা সকলেই বাংলা একাডেমিতে ছিলেন। এঁদের সূত্রে বা বিভিন্ন কাজে বাংলা একাডেমিতে যেতে হয়েছে বারবার। প্রবন্ধ লেখার জন্য আহ্বান পেয়েছি। আমি, আলী আনোয়ার, সনৎকুমার সাহা, নাজিম মাহমুদ আমরা রাজশাহী থেকে দল বেঁধে গিয়েছি একুশে ফেব্রুয়ারিতে। তখন সেলিনার সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতো। একাডেমির বিভিন্ন বিভাগে কাজ করেছেন তিনি। মাঝখানে দীর্ঘ সময় বাংলা একাডেমির শিশুদের পত্রিকা ‘ধান শালিকের দেশ’ সম্পাদনা করেছেন। পরিচয়ের পর থেকে সেলিনা আমাকে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে সম্মান করেন। কিশোরদের জন্য বাংলা একাডেমি পত্রিকায় লিখতে বলতেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘লালঘোড়া আমি’ লিখেছি, এ দেখে অনেকের ধারণা হয়েছে, শিশুদের নিয়ে আমি লিখতে পারি। কিন্তু আমি তো সত্যিই পারি না। তিনি কিন্তু খুব চাপ দিয়ে বলেছিলেন। আমি শেষ পর্যন্ত কোনো লেখা দিতে পারিনি। তারপর থেকে সেলিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাই তৈরি হয়ে গেল। বাংলা একাডেমির বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেছেন। লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। এক সময় বাংলা একাডেমির মূল বিল্ডিংয়ের দক্ষিণ দিকের ঘরের পাশে বসতেন। মূল বিল্ডিংয়ের দোতলাতেও বসতেন। ততদিনে তাঁর একটার পর একটা উপন্যাস বের হতে শুরু করেছে। তাঁর যোগ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। বাংলাদেশের প্রধান কথাসাহিত্যিক হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। সেলিনার ক্ষেত্রে একটা বড় বলার কথা এই যে, যে কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনায় সাহিত্যের জায়গা থেকে সাড়া দিয়েছেন। এত বিচিত্র বিষয়ে আর কেউ লেখেননি। সাহিত্যের বিষয় সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবজগৎ। আমাদের ইতিহাসের বড় বড় ঘটনা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৪২ সালে সোমেন চন্দ হত্যা, ১৯৩২-এ পাহাড়তলি অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনা, এগুলো সবই আমাদের খুব গৌরবের ইতিহাস। এই গৌরবের বিষয়গুলো সেলিনা অসাধারণভাবে তাঁর এক একটি উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন। সোমেন্দ চন্দ, মুনীর চৌধুরী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের কিশোর-যৌবন নিয়ে ‘পূর্ণ ছবির মগ্নতা’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। মোটকথা সেলিনা খুব ভালোভাবে তাকিয়েছেন বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিকে। তাঁর ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ বা এ জাতীয় উপন্যাসগুলোতে বাংলার উত্থান-পতনের ইতিহাস পাওয়া যায়। বলা যেতে পারে, সেলিনা আমাদের খুব স্মরণ করেছেন। আমাদের বাঙালি জাতিকে স্মরণ করেছেন। বাঙালি জাতির কৃতী ও কীর্তি সবটাই সেলিনা মোটামুটিভাবে তাঁর সাহিত্যে নিয়ে এসেছেন। আমি দেখেছি, সামাজিক গুরুত্ব নেই এমন জিনিস নিয়ে সেলিনা প্রায় লেখেনইনি। বরং তাৎক্ষণিকভাবে লেখার জন্য কিছু কিছু লেখার মানটা হয়তো অনেকটাই নেমে গেছে। তেমন ভালো হয়নি। কিন্তু সাড়া তিনি দিয়েছেন। বাংলাদেশের ছিটমহল নিয়ে তাঁর খুব ভালো কাজ আছে। তিনি নিজে বারবার সেখানে গিয়েছেন। ছিটমহলের নিজস্ব সমস্যা, তাদের শূন্যতাবোধ পায়ের তলায় মাটি নেই, মাথার উপরে আকাশটাও ঠিক নেই, এই বিষয়টা নিয়ে সেলিনা লিখেছেন এবং এখনো লিখছেন। ছিটমহলের সমস্যা নিয়ে সম্প্রতি বেরিয়েছে ‘ভূমি ও কুসুম’ নামে তাঁর বড় একটি উপন্যাস। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা, সোমেন চন্দকে নিয়ে লেখা, মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, ছিটমহল নিয়ে, মধ্যযুগের বাংলাকে নিয়ে, এমনকি বিখ্যাত উর্দু কবি গালিবকে নিয়ে লেখার সাহস করা, এটা সোজা কথা নয়। পড়তে হয় ব্যাপক, জানতে হয়। সেটা সেলিনার একটা বড় দিক। কাজেই সেলিনার সৃষ্টির যে পালাটা, সে পালাটা এখন রীতিমতো ওজনদার। আমার কেবলি সেলিনাকে মনে হয় খুব কম বয়সী। আরো বহুকাল লিখবেন। সেদিন সেলিনাকে বয়স জিজ্ঞাসা করেছিলাম। আমার নিজের বয়োকনিষ্ঠদের বয়স হয়েছে বলে আমার কিছুতেই মনে হয় না। যখন শুনলাম, তাঁর বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে , তখন খুব অবাক হলাম! কোন দিক থেকে সময় চলে যাচ্ছে। সেলিনার লেখা কিন্তু থামেনি। ক্রমাগত লিখছেন। আর একটা কাজ সেলিনা করেছেন, নারীদের নিয়ে তাঁর আগ্রহ শুধু বাংলাসাহিত্য নিয়ে নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাহিত্য সম্পর্কেও তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে। সেখানে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোর সাথে তিনি যুক্ত আছেন। সার্কের সঙ্গে তিনি যুক্ত আছেন। ইন্ডিয়ার সব অঞ্চলের লেখকদের ভালো করে চেনেন। তামিল নাড়ুর বা কেরালার লেখককে ভালো করে চেনেন। এসব যোগাযোগগুলো রেখেছেন এবং একটি জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশের বাইরে বিরাট পরিসরে তাঁকে পাচ্ছি। আমি সেজন্য তাঁর প্রশংসা করি। নারীদের নিয়ে এত কাজ তিনি করেছেন যে, আর কেউ করেনি তেমনভাবে। তাঁকে লেখিকা বললে চটে যান। সব জিনিস নিয়ে লিঙ্গভেদ কেন? এজন্য আমি তাঁকে লেখকই বলি। যাই হোক, সব মিলিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সেলিনা আমার খুব স্নেহের ও ভালোলাগার মানুষ, সে জন্য সাহিত্যের জায়গা থেকেও আমার অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন তিনি পাবেন। আগামী ১৪ জুন তাঁর জন্মদিন। আগাম শুভেচ্ছা রইল তাঁর প্রতি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App