বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা ভাবনা ছাড়া উপায় নেই

আগের সংবাদ

সেলিনা স্নেহের ও ভালোলাগার মানুষ

পরের সংবাদ

বিপ্লবী লীলা নাগ

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২১ , ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১০, ২০২১ , ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

বঙ্গ রাখাল

পুরুষশাসিত সমাজে আমরা সব সময় পুরুষকে বড় করে দেখলেও নারীর অবদানকে করি অস্বীকার। কিন্তু সমাজ গঠনে বা সমাজ পরিবর্তনেও যে নারীর রয়েছে অসামান্য ভূমিকা। তা আমরা কজনই বা মনে রাখি। সমাজকে সামনে এগিয়ে নিতে যাদের অবদান রয়েছে লীলা নাগ তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি আসামের গোয়ালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গিরীশচন্দ্র নাগ অবসরপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তার পিতৃ-পরিবার ছিল তৎকালীন সিলেটের অন্যতম সংস্কৃতমনা ও শিক্ষিত একটি পরিবার। বিশেষ করে পিতার কাছে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের শুরু হয় দেওগরে। তারপর কলকাতার ব্রাহ্ম গালর্স স্কুলে এবং ১৯১১-১৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকার ইডেন হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। এই স্কুল থেকে বৃত্তি নিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ১৯১৬ সালে তার পিতা অবসরগ্রহণ করার পর তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসাম থেকে ঢাকায় আসেন। লীলা নাগ ১৯১৭ সালে কলকাতার বেথুন কলেজে আইএ ভর্তি হন। পড়াশোনায় তার খুব গভীর মনোযোগ ছিল। তিনি খেলাধুলায়ও উৎসাহী ছিলেন। নিয়মিত টেনিস, ব্যাডমিন্টন, হাডুডু চর্চা এবং কলেজের সব অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করতেন। বহুমুখী প্রতিভার কারণে সবাই তাকে পছন্দ করত। শিক্ষকদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় ছাত্রী। কলেজজীবনে জনপ্রিয়তার কারণেই তিনি কলেজের ‘সিনিয়র স্টুডেন্ট’ নির্বাচিত হন। ‘পারিবারে তার নাম রাখা হয় ‘লীলাবতী নাগ’। ‘বুড়ি’ নামেও ডাকতেন মা-বাবা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়ে ‘লীলাবতী নাগ’ ও ‘লীলা নাগ’Ñ দুই নামে তার অন্তর্ভুক্তি হয়েছিল বলে তথ্য দিয়েছেন দীপংকর মোহান্ত, যিনি লীলা নাগের জীবন ও কর্মকাণ্ড বিষয়ে গবেষণামূলক বই লিখেছেন (লীলা নাগ ও বাংলার নারী জাগরণ)। তার দেয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেবুলেশন শিটে আছে, ‘লীলা নাগ, ১৯২৩ সাল, এমএ পরীক্ষা, রোল ১৬, ইংলিশ গ্রুপ-এ’। অধ্যাপক রঙ্গলাল সেন (প্রয়াত) দীপংকর মোহান্তকে প্রামাণ্য তথ্যে জানিয়েছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ১৯২১ সালে ঢাকা হলের সংযুক্ত ছাত্রী হিসেবে নাগের নাম আছে ‘লীলাবতী নাগ। (দীপংকর মোহান্ত, লীলা রায় ও বাংলার নারী জাগরণ, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৯, পৃ. ১৮)।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের বৈপ্লবিক অভিযানের পর বাংলার সব বিপ্লবী নেতৃস্থানীয়দের ইংরেজ সরকার গ্রেপ্তার করেন। এ সময় শ্রীসংঘের নেতা অনিল রায় ও তার এক সহকর্মীরা গ্রেপ্তার হন। কেউ কেউ আবার আত্মগোপনে চলে গেলে শ্রীসংঘের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন লীলা নাগ।

১৯৩৯ খিস্টাব্দে লীলা নাগ বিয়ে করেন আরেক বিপ্লবীÑ অনিল রায়কে। বিয়ের পর তার নাম হয় লীলা রায়। তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক অগ্রবর্তী সৈনিক। তবে তিনি শুধু রাজনীতিতেই তার কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ১৯২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেস ও বাংলার অন্যান্য বিপ্লবী দলগুলো সুভাষচন্দ্র্র বসুর চারপাশে সমবেত হতে থাকে। স্বামী অনিল রায়, আরেক বিপ্লবীকে নিয়ে লীলাও উপস্থিত হন সেখানে। নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনে বাংলার নারী আন্দোলনের ইতিহাস বলার সময় লীলা প্রথম মঞ্চে ওঠার মাধ্যমে তার বিপ্লবী জীবনের পথ প্রসারিত হয়। নেতাজির অনুরোধে তার প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক ফরওয়ার্ড ব্লকের সম্পাদনার ভার নেন লীলা নাগ। প্রীতিলতার মতো সুপরিচিত নারী বিপ্লবীরাও এই দীপালি সংঘের মাধ্যমেই বিপ্লবের কঠিনতর শিক্ষা নিয়েছিলেন লীলা নাগের কাছ থেকে। ১৯৩০ সালে লীলা নাগের নেতৃত্বে গঠিত ‘মহিলা সত্যাগ্রহ কমিটি’র উদ্যোগে ঢাকার নারীরা ‘লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে’ যোগ দেন। এ আন্দোলনে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন আশালতা সেন। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে প্রকাশ্য গণসংগ্রামের আড়ালে লীলা নাগ বৈপ্লবিক সংগ্রামের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। নারী শিক্ষা মন্দিরের ঊষা রায়, লীলা নাগের সহযোগী ছিলেন। তার ওপরও এই শ্রীসংঘের কাজের দায়িত্ব চলে আসে। লীলা নাগ ও ঊষা রায়ের কাজের সহায়ক ছিলেন দুই আত্মগোপনকারী সহকর্মী। শহীদ অনিল দাশ ও অনিল ঘোষ।

লীলা নাগ দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করার পর দলে দলে দীপালি সংঘের মেয়েরা শ্রীসংঘে আসতে শুরু করেন। ঢাকার ইডেন স্কুল ও কলেজ এবং কলকাতার ১১, গোয়াবাগানে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রীসংঘ এবং ছাত্রীভবনই ছিল শ্রীসংঘের মেয়ে সদস্য পাওয়ার উৎসভূমি। এ মেয়েরাই পরে শ্রীসংঘের সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। এদের মধ্যে রেণু সেন, হেলেনা দত্ত, অশ্রুকণা সেন, আশা রায়, উমা দেবী, সুশীলা দাম গুপ্ত, লাবণ্য দাশগুপ্ত, প্রমীলা গুপ্ত, সুরমা দাশ, ছায়াগুহ, প্রভা চৌধুরী, গৌরী সেনের নাম উল্লেখযোগ্য। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লীলা নাগ অন্তরীণ থাকেন। এ সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন রমা সেন, সুলতা ঘোষ, মাধুরী বসু, যুঁথিকা মিত্র, কুলু চৌধুরী, সুলেখা ঘোষ, অঞ্জলি রায়, হাসিকণা রায়, আরতি গুপ্ত, সতীদত্ত গুপ্ত, বাসনা ঘোষ, চন্দ্রা বসু, অনিমা সেন, মিলন সেন, শান্তি বসু, সাগরিকা ঘোষ, উমা সেন, বাসনা মুখার্জি, বীণা সেনগুপ্তা, অমিতা চৌধুরী, পুষ্পরেণু বসু, সুহাসিনী সেন, নীলিমা মিত্র, কণা সেনগুপ্তা, লীলা সেন, বন্দনা গুপ্ত, অলকা চৌধুরী, দীপ্তি চৌধুরী, বিউটি ঘোষ, শান্তি চক্রবর্তী, সান্ত¦না দাশ শর্মা প্রমুখ।

লীলানাগ গ্রেপ্তার হন ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর। এ যেন আরেক ইতিহাস। কেননা তিনিই ছিলেন ভারতবর্ষে বিনাবিচারে আটককৃত প্রথম নারী। ১৯৩২ সালে শ্রীসংঘের বিপ্লবীরা অপারেশন থেকে ফেরার পথে উন্মত্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়েন অনিল দাস। জেলে থাকা অবস্থায় পুলিশের অত্যাচারে অনিল দাসের ভয়াবহ মৃত্যুসংবাদ তাকে শোকে অধীর করে তুলেছিল। এ সময়ই নাগের সঙ্গী ছিল ‘মহুয়া’, রবিঠাকুরের বই এবং সেতার। চমৎকার সেতার বাজাতে পারতেন লীলা নাগ। টানা ৬ বছর কারাভোগে পর আলোর মুখ দেখেন লীলা নাগÑ এ সময় বিপ্লবীদের কাছে তিনি যেন কল্পলোকের রানী। কবিগুরু, সুভাস বসুসহ অনেকেই আশীর্বাদ পাঠালেন। কিছুদিন তিনি বৃদ্ধ পিতা-মাতার কাছে থেকে আবারো নামলেন বাইরে। ১৯৩৮ সালে পুনরায় সবার আনন্দবার্তা নিয়ে মাসিক জয়শ্রী পুনরায় প্রকাশিত হয়। এ সময়েই অনিল রায়ের সঙ্গে পূর্ণ ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং ১৯৩৯ সালে অনিল চন্দ্র বায় এবং লীলা নাগ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মালেকা বেগম তার এক লেখায় বলেছেনÑ ‘১৯৩১ সালে প্রকাশ করেন জয়শ্রী নামক নারীদের পত্রিকা। এই পত্রিকার বিস্তার ঘটল সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টির প্রসার ঘটানোর প্রয়াসে। তার সাধনা ছিল নতুন সমাজ, নতুন জীবন, নতুন মানুষ গড়ে তোলার। রাজনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, ব্রিটিশদের শাসনমুক্ত হওয়ার স্বাধীনতার স্বপ্ন যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, তখন ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শান্তি কমিটি। দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর নিরাপত্তা-সংকটের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায়ের জনস্রোত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে বাস্তুত্যাগী হতে শুরু করলে, তিনি পশ্চিমবঙ্গে তাদের জন্য আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পুনর্বাসনের কাজে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে উঠে এসেছে ওই সময়কার সমাজবাস্তবতায় একজন নারীর পক্ষে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ করা কতটা সাহসের বিষয় ছিল, সেই দিকটিও।’ লীলা নাগ ১৯১৭ সালের ২ অক্টোবর বাবাকে লিখেছিলেন : আমার ক্ষুদ্র শক্তি যদি একটি লোকেরও উপকার করতে পারতো, তবে নিজেকে ধন্য মনে করতুম। সত্যি বলছি, এ আমার বক্তৃতা নয়, এটা আমার প্রাণের কথা, এই আমার রফবধষ… আমার উদ্দেশ্য নয়, এই পৃথিবীতে লোকপ্রিয় হওয়া কিন্তু এই পৃথিবীতে খাঁটি হওয়া।

১৯২৬ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ব্রাহ্মসমাজ প্রাঙ্গণে কবি রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনাসভার বিবরণীতে তিনি লিখেছেন : সমবেত বোধ হয় দশ পনেরো হাজার বা তার চেয়েও বেশি সংখ্যক মেয়েরা সুসজ্জিত সুশৃঙ্খল পরিবেশে কবি গুরুকে তাদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এসে মিলিত হলেন। ছোট্ট ছোট্ট সুসজ্জিত মেয়েরা পুষ্পনন্দনে অর্ঘ্য সাজিয়ে কবিকে বরণ করল : ‘ওহে সুন্দর মরিমরি।’ কবি ওদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গুন গুন করে গান করলেন। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। তারপর তার সে আশ্চর্য কণ্ঠে তিনি শুরু করলেনÑ ‘সমস্ত এশিয়াতে মেয়েদের এত বড় সভা দেখিনি কোথাও…।’ আনন্দে মন ভরে উঠল। মেয়েদের আহ্বান জানালেন ‘গৃহকে তোমরা আপন করেছ বাহিরকেও তোমাদের আপন করতে হবে। বাইরকে আপন করে আত্মীয়-পরের গণ্ডী দূর করতে হবে।… সমস্ত সমাজের মাঝে, কাজের মাঝে, ভাবনার মাঝে এগিয়ে এসে তোমাদের অংশ নিতে হবে। তবেই সমস্ত সহজ হবে সার্থক হবে।’

১৯৬৪ সালের ২৫ মার্চ ‘পূর্ববাংলা বাঁচাও কমিটি’র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার সময় আইনভঙ্গ করার অপরাধে কলকাতায় লীলা নাগকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৬ সাল থেকে লীলা নাগের স্বাস্থ্যহানি ঘটতে থাকে এবং ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সকালবেলা চৈতন্যহীন অবস্থায় তাকে পিপি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৩ দিন পর চৈতন্য ফিরে এলেও তার বাকশক্তি ফিরে আসেনি। শরীরের ডানপাশ সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। আড়াই বছর চৈতন্যহীন থাকার পর ১৯৭০ সালের ১১ জুন এই মহান বিপ্লবী মহামানবের জীবনাবশান ঘটে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়