কমছে বই পড়া, বাড়ছে ডিভাইস আসক্তি

আগের সংবাদ

স্মার্টফোন কিনতে ঋণ পাচ্ছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা

পরের সংবাদ

চীনের আগ্রাসন, দক্ষিণ এশিয়ায় দৌড়ঝাঁপ এবং বাংলাদেশের দীর্ঘশ্বাস

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২১ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ৮, ২০২১ , ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়াকেন্দ্রিক নতুন উদ্যোগ কোয়াডের বিষয়ে চীনের অধৈর্য হয়ে ওঠার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। চীনের অধৈর্য হওয়ার কারণ হচ্ছে কোয়াডভুক্ত দেশগুলো যেসব কৌশলগত পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার মধ্যে সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায়ও এগিয়ে থাকার প্রশ্ন রয়েছে। এ অঞ্চলে চীনের ‘প্রতিপক্ষ’ কিংবা ‘ভীতি’ যাই বলা হোক না কেন, তা হচ্ছে মূলত ভারতকে কেন্দ্র করে। ভারতের ‘সুপার পাওয়ার’ হয়ে ওঠা চীন কখনোই মেনে নিতে পারেনি। যেহেতু চীন ও ভারত ঐতিহাসিককাল থেকেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেহেতু ভারতের ওপর চাপ বজায় রাখতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত সুবিধা কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না চীন। কারণ চীনা নেতৃত্ব ভালো করেই জানে, বৈশ্বিক নিরাপত্তার রূপ বদলে দিতে হলে অঞ্চল হিসেবে কৌশলগত দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
চীন সমুদ্রসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ চীন সাগর এবং সেখানকার কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করছে। সেখানে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলোর আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও চীন ওই অঞ্চলকে তার একক বলেই দাবি করছে। যার জন্য ওই অঞ্চলের প্রায় ২০টি দেশের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এছাড়াও ইন্দো প্যাসিফিক, এমনকি বঙ্গোপসাগরেও আধিপত্য বিস্তার করাকে লক্ষ্যের মধ্যে রেখেছে চীন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মিয়ানমার থেকে পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত তাদের নৌ-শক্তির আওতায় আনার উদ্দেশ্য নিয়েই এগিয়েছে। এই লক্ষ্যে ওখানকার পোর্টগুলোকে নেভাল বেসে রূপান্তরিত করার যাবতীয় কাঠামোও তৈরি করে ফেলেছে ইতোমধ্যে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাগর ও সাগরতলের সম্পদ সব দেশের সম্পদ হওয়ায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নৌ-শক্তিতে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়া চীনের আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। চীনের এই আগ্রাসন মোকাবিলা করার জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট কোয়াড সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জোট হিসেবে কোয়াডের উত্থানকে তাই চীন নিজের জন্য হুমকি মনে করছে। অন্যদিকে সমগ্র বিশ্বের ধারণা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যে আচরণ করছে নৌ-শক্তি আরো বাড়িয়ে ইন্দো প্যাসিফিকে এসেও ঠিক একই আচরণ করবে। চীনের এই নৌপথ দখল ও সামরিক আধিপত্য ঠেকাতে একমাত্র কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে চার শক্তির সামরিক জোট কোয়াড।
তবে বসে নেই চীনও। ঠিক এ কারণেই, এশীয় প্রতিবেশীদের নিজস্ব প্রভাববলয়ে টানতে ও ধরে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানকে বাইরে রেখে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে ভারতের যে একটি অলিখিত জোট ছিল, ওই জোট থেকে শ্রীলঙ্কাকে অনেকখানি টেনে পাকিস্তানের পর্যায়ে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে চীন। পাশাপাশি নেপালের রাজনীতি ও সমরনীতিতেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। কারণ ভারতের রাশ টেনে ধরতে পাকিস্তানকে ব্যবহার করার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে নেপাল ও শ্রীলঙ্কাকেও ব্যবহার করতে চাইছে চীন। এই ইকুয়েশনই চীন গত বছর থেকে কাশ্মিরের ওপর পাকিস্তানের ‘দাবির’ প্রতি সমর্থন দেয়া শুরু করেছে। তাছাড়া অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, গালওয়ান উপত্যকায় ভারতকে সংঘর্ষে জড়াতে চীনই উসকানি দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের টিকা-কূটনীতিও যে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজস্ব প্রভাববলয়ে টানতে ও ধরে রাখতে চীনের সেই প্রচেষ্টারই অংশ, সে বিষয়েও খুব একটা রাখঢাক নেই। এরই অংশ হিসেবে ‘ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিন স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি ফর কোভিড ফর সাউথ এশিয়া’ নামক একটি প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি করেছে চীন। সম্প্রতি চীন প্রতি ডোজ সিনোফার্মের টিকা শ্রীলঙ্কার চেয়ে ৫ ডলার কম দামে বাংলাদেশকে দিচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। তবে দাম প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় চীন কিছুটা বেশি দাম দাবি করছে। চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, কোনো অবস্থাতেই যেন দাম প্রকাশ না করা হয়। কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আরো বেশি দামে তারা টিকা সরবরাহ করছে। টিকা রাজনীতিতে আপাতদৃষ্টিতে চীনের বাংলাদেশের প্রতি যে পক্ষপাত দেখা যাচ্ছে সেটাকেও মহৎ কোনো প্রয়াস হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরের বলেই মনে হচ্ছে। কারণ করোনার টিকাকে ইতোমধ্যেই তারা ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে রূপান্তরিত করেছে। ইতোমধ্যে টিকা কূটনীতির মাধ্যমে তাইওয়ানের বিষয়ে প্যারাগুয়ের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে সফল হয়েছে চীন। এছাড়া টিকার চালানের পূর্ব শর্ত হিসেবে ব্রাজিলের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশটির ফাইভ-জির বাজার হুয়াওয়ের জন্য উন্মুক্ত করেছে তারা।
করোনা ভাইরাস দুনিয়াকে নতুন মেরুকরণের মুখোমুখি করে দিয়েছে। এটির শুরু চীন থেকে। চীনের বিরুদ্ধে এ ভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ এখন মুখে মুখে। কিছুদিন আগে লি-মেং ইয়ান নামে চীনের একজন শীর্ষ ভাইরোলজিস্ট ‘সার্স করোনা ভাইরাস’ নিয়ে চীনের বেশকিছু গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে করেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেনÑ চীনের সামরিক বিজ্ঞানীরা ২০১৫ সাল থেকেই এই ভাইরাসকে ‘জৈব অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ নিয়ে চীনের আগ্রহের কেন্দ্র আসলে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়। মূল কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সংযুক্তি, ক্রমবিকাশমান কৌশলগত ও সহযোগিতামূলক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককেও চীন পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এমনকি ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটন ও টোকিওর সহযোগিতা বৃদ্ধির মনোভাবও চীনের দৃষ্টি এড়ায়নি। চীন নিজের স্বার্থে ভারতের রাশ টেনে ধরতে বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুত্ব রাখতে চায়। এ কারণে চীন বাংলাদেশকে অবকাঠামোগত প্রকল্পের জন্য ঋণ গ্রহণে ব্যাপকভাবে প্রলুব্ধ করেছে। তবে চীনের এসব ঋণের সুদ সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে দেশটি নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালায়। ‘সিএফজিডি’ নামে একটি গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ মতে, আটটি দেশ শিগগিরই চীনের এ ধরনের ঋণ ষড়যন্ত্রের শিকার হতে যাচ্ছে। দেশগুলো হলোÑ জিবুতি, কিরগিজস্তান, লাওস, মালদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, পাকিস্তান ও তাজিকিস্তান।
চীন আসলে কখনো কারো বন্ধু হতে পারে না। ইতিহাস অন্তত তাই বলে। বাংলাদেশের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়ানো রোহিঙ্গা সমস্যা জিইয়ে রাখতেও ভূমিকা রাখছে দেশটি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যখন পশ্চিমা বিশ্ব মিয়ানমারের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, তখন প্রতিবেশী দেশটিতে বড় বিনিয়োগের ঝাঁপি নিয়ে হাজির হয়েছে চীন। কাগজে-কলমে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের সঙ্গেই চীন ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে চললেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর যে ধরনের চাপ সৃষ্টি করার কথা, নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের কারণে তা করছে না। মিয়ানমার যেহেতু চীনের প্রেসক্রিপশনে চলে তাই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের অদৃশ্য চাবি চীনের হাতেই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এই নিয়ে যে পদক্ষেপই নিতে চেষ্টা করুক না কেন, তাতে সবসময়ই বাদ সাধে স্থায়ী সদস্য চীন। গোটা বিশ্ব যেখানে এই গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, সেখানে চীন স্বীকারই করে না রাখাইনে গণহত্যা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে চীনের তৈরি যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেই পাকিস্তান বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। সে সময় পাকিস্তানকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছে চীন। তখন চীন ভারতীয় সীমান্তে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন করেছিল বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়া ভারতের প্রতি চাপ প্রয়োগ করতে। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার পরও চীন নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে বঙ্গবন্ধু লাহোরে ওআইসির সম্মেলনে যোগ দেন। তারপরই মূলত চীন ভেটো তুলে নেয়। তবে বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকাবস্থায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার মাত্র ১৬ দিনের মাথায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় দেশটি।
চীন তার অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কাউকে মাথা ঘামাতে না দিলেও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোকে স্বভাবে পরিণত করেছে। মানবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো বৃহৎ এই দেশটি সবসময়ই নিজেদের ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে মরিয়া। নিজের প্রয়োজন ছাড়া চীন কখনো কারো দিকে বন্ধুত্বে¡র হাত বাড়ায় না, এটা প্রমাণিত। তাই চীনের খপ্পরে পড়ে কোনো অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত যাতে বাংলাদেশ না নেয় সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সচেষ্ট হওয়ার সময় এসেছে।

মর্তুজা হাসান সৈকত : কবি ও লেখক।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়