লাগামছাড়া কিশোর গ্যাং

আগের সংবাদ

মর্যাদার লড়াইয়ে হারেনি পর্তুগাল-স্পেন

পরের সংবাদ

সামরিক একনায়কতন্ত্র

প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২১ , ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ৫, ২০২১ , ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ

পরাধীন ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তানের কালো অধ্যায় পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই মহান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা ঘটনা, যার কারিগর হিসেবে কেউ আখ্যায়িত হয়েছেন নায়কের অভিধায়; কেউবা আবির্ভূত হয়েছেন খলনায়কের চরিত্রে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সেসব ঘটনা ও তার নায়ক-খলনায়কদের কার কি ভূমিকা, তাই নিয়েই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গ্রন্থ ‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’। সম্প্রতি ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। এ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে ভোরের কাগজের পাঠকদের জন্য।

আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই রাজনীতিবিদদের ওপর চরমপন্থা গ্রহণ করেন এবং তাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে পূর্ববঙ্গে সরাসরি এক দালাল গোষ্ঠী সৃষ্টি করেন।

নানা চক্রান্ত, বাধা, নিষেধ, প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হলো। গভর্নর জেনারেল ও শাসনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী প্রথম রাষ্ট্রপতি আবার মন্ত্রিসভা বানালেন, আবার বরখাস্ত করলেন। নানা রকম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের সে এক জঘন্যতম ইতিহাস।

তারপরও ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৫৯ সালের ১৫ আগস্ট ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত হলো পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। দেশে সংসদীয় কাঠামোয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই সম্ভাবনা সামরিক-বেসামরিক আমলাচক্রকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। নির্বাচনে পাঞ্জাবী ক্লিক- এর বাইরে অবস্থানরত, বিরোধী এবং সংগ্রামী রাজনীতিবিদদের নির্বাচনের মাধ্যমে আসন্ন ক্ষমতায় আগমনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামরিক আমলাতন্ত্রের চক্রান্ত কার্যকর করা ব্যতীত অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ তাদের কাছে, পরিষ্কার ধরা পড়েছিল যে, আমলাতন্ত্রের ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত তাদের পক্ষের মেরুদণ্ডহীন রাজনীতিবিদ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তাদের নির্বাচনে জয়লাভের আদৌ সম্ভাবনা নেই।

এই বিবেচনায় ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা দেশব্যাপী সামরিক আইন ঘোষণা করে সংবিধান রহিত, মন্ত্রিসভা বাতিল, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন এবং সেনাধ্যক্ষ জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইনপ্রশাসক নিয়োগ করেন। জেনারেল আইয়ুব ২০ দিনের মাথায় মার্কিন উপদেষ্টাদের পরামর্শে ও মধ্যস্থতায় জেনারেল মীর্জাকে হটিয়ে পূর্ণ ক্ষমতা দখল করেন।

পাকিস্তানে এই সামরিক শাসন জারির নেপথ্যে অত্যন্ত সতর্কভাবেই ক্রিয়াশীল ছিল সে সময়ের কিছু কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যার মধ্যে রয়েছে ইরানে মোসাদ্দেকের ক্ষমতা আরোহন ও তেল সম্পদ জাতীয়করণ নীতি, ইরাকে রাজতন্ত্রের পতন, বাগদাদ চুক্তি নস্যাৎ হওয়া, জনগণের মধ্যে পাকিস্তান-মার্কিন চুক্তির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান গণ-অসন্তুষ্টি, যা ছিল মার্কিন স্বার্থরক্ষার পরিপন্থি।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, পাকিস্তানে যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে বাধ্য। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নব অর্জিত সুযোগ-সুবিধাসমূহ।

রাজনৈতিকভাবে অবশ্য জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা গুরমানী-সোহরাওয়ার্দীর সমঝোতায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। সেজন্য সব বিষয়গত ও বস্তুগত বিবেচনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত জনগণের মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে। সামরিক স্বৈরশাসন পাকিস্তানের বুকে অনড় ও চিরস্থায়ীভাবে বলবত করার ব্যবস্থা গৃহীত হয়।

জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই রাজনীতিবিদদের ওপর নিপীড়ন, অত্যাচার ও নির্যাতনের চরমপন্থা গ্রহণ করেন। রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার, নজিরবিহীন অত্যাচারের পাশাপাশি তাদের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার পন্থাসমূহ উদ্ভাবন করা হয়।

মার্কিন উপদেষ্টা ও দেশীয় অফিসাররা নবতর কৌশলে সরকারের বেসামরিক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করতে তৎপর হলো। উদ্ভাবিত হলো মৌলিক গণতন্ত্র যা ১৯৬২ সনের সংবিধানের ভিত্তি।

মৌলিক গণতন্ত্র না ছিল গণতন্ত্র, না ছিল মৌলিক। বরং এটা ছিল সামরিক স্বৈরশাসনকে পাকাপোক্ত করার এক অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা গণতন্ত্রের মুখোশে চাপানো হলো। এই ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের বাহ্যিক চেহারায় পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনা গ্রামীণ ধনী ও সুবিধাভোগী শ্রেণিকে সম্পৃক্ত করে। কিন্তু গ্রামীণ ভূস্বামী ও গ্রাম্য মোড়লদের ক্ষমতা গ্রাস ও সীমাহীন দুর্নীতি সর্ব মহলেই এই মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা ঘৃণিত বলেই জনসাধারণের নিকট প্রতীয়মান হলো।
জেনারেল আইয়ুব খান অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে নির্দয় অত্যাচার, মৌলিক ও মানবিক অধিকার হরণ করে, রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে পূর্ববঙ্গে সরাসরি এক দালাল গোষ্ঠী সৃষ্টি করে। ঔপনিবেশিক কায়দায় সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক শক্তির সাহায্যে স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ব স্থায়ী করতে জেনারেল আইয়ুব খান সদা উদগ্রীব ছিলেন।

আগামীকাল প্রকাশিত হবে ‘কালো স্রোতের আবর্ত ’
‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’- বইটি পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনে (ভোরের কাগজ কার্যালয়, ৭০ শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা)। এছাড়া সংগ্রহ করা যাবে bhorerkagojprokashan.com থেকেও।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়