ডেল্টার সামাজিক সংক্রমণ

আগের সংবাদ

সামরিক একনায়কতন্ত্র

পরের সংবাদ

লাগামছাড়া কিশোর গ্যাং

প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২১ , ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ৫, ২০২১ , ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ

এলাকাভিত্তিক তালিকা করছে র‌্যাব।

রাজধানীসহ দেশের সব শহরের পাশাপাশি গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ কোনো অভিযান না থাকায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর চিত্র এখন অভিন্ন। ঢাকার ভেতরে উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও পুরান ঢাকায় এবং ঢাকার পাশে সাভার-আশুলিয়ায় এরা লাগামহীন। এ দলে ধনীর বখে যাওয়া দুলাল ছাড়াও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও রয়েছে। পাড়ামহল্লায় মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংসহ তুচ্ছ ঘটনায় তারা মারামারি ও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে। মোটরসাইকেল নিয়ে দিচ্ছে মহড়া। উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এর প্রতিকার চেয়ে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করেও প্রতিকার মিলছে না। এ অবস্থায় র‌্যাব সারাদেশে কিশোর গ্যাং সদস্য ও তাদের প্রশ্রয়দাতাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে।

ঢাকায় কর্মরত পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে জানা গেছে, দেশে কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়। রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোররা। সারাদেশে কিশোরদের গ্রুপগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে শতাধিক গডফাদার। রাজনৈতিক নেতার প্রভাবে তারা এলাকায় মাস্তানি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটাচ্ছে। একেকটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসলেও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। অনেক ঘটনায় জড়িত কিশোররা গ্রেপ্তার হলেও তাদের নেপথ্য মদতদাতারা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

পুলিশ বলছে, এরা কিশোর বলে দণ্ডবিধিতে পুলিশ এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সের কেউ অপরাধ করলে তাকে দণ্ডবিধিতে কোনো বিচারের আওতায় আনা যাবে না। তাদেরকে আটক করে শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠাতে হবে। অথচ ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ১১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর বয়সীদের মধ্যে ‘অ্যাডভেঞ্চার ফিলিং’ বা ‘হিরোইজম’ ভাব দেখা যায়। কিশোর বয়সে এমন একটা পরিবেশে বেড়ে ওঠে- সেখানেই অপরাধী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। তারা এই বয়সে এমন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে বা ফলো করে, সেখান থেকেই তারা অপরাধের দিকে ধাবিত হয়। গ্যাং কালচার থেকে মুক্তি কোথায়? যে জায়গাগুলো থেকে আমাদের মুক্তি আসতে পারে, সেই জায়গাগুলোয় আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেই না। যখন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন পরিবার বা অভিভাবক শ্রেণী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসন থেকে নানা ধরনের বক্তব্য বা ব্যবস্থার কথা শুনি। ঘটনাগুলো যখন কমে যায় বা সহনশীল হয়ে যায়, তখন আমরা সবকিছু ভুলে যাই। আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। পরবর্তীতে গ্যাং কালচার বা কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণ এটাই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম চলমান থাকে না।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার এ কে খন্দকার আল মঈন ভোরের কাগজকে বলেন, র‌্যাবের সব ব্যাটালিয়ন এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি চলছে অভিযানও। এর সঙ্গে পাড়ামহল্লায় যেসব রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের প্রয়োজনে কোমলমতি কিশোরদের আশকারা দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে, তাদেরও তালিকা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এছাড়া সারাদেশে শতাধিক কিশোর গাং থাকার তথ্য র‌্যাবের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, যারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের একটা নামের তালিকা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কেউ যদি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে ওই কিশোরের অভিভাবকদের ডেকে এনে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে। কোনো কিশোর অপরাধ করলে, তাকে বিদ্যমান আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

র‌্যাব ও পুলিশের পরিদর্শক পদমর্যাদার একাধিক কর্মকর্তা জানান, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়া ছেলেদের দেখলে সহজেই চেনা যায়। তাদের চালচলনে বখাটের একটা চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের পরনে থাকে টি-শার্ট, জিন্স প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস, চুলে অভিনব স্টাইল। তারা পাড়া, মহল্লা, অলিগলি ও ফুটপাতে জমিয়ে আড্ডা দেয়। পকেটে থাকে বেনসন সিগারেটের প্যাকেট। বড়-ছোট মান্য না করে হরহামেশা তারা প্রকাশ্যে সিগারেট ফুঁকে। উচ্চ স্বরে গান করে- হিন্দি, ইংরেজি গান। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো বয়স বিবেচনা নেই। ইভটিজিং থেকে শুরু করে তীর্যক বাক্য ছুড়ে দেয়। রাত বাড়লেই অভিজাত এলাকায় শুরু হয় এমন ডিসকো পোলার মোটর ও কার রেসিং। এলাকাভেদে এদের রয়েছে পৃথক গ্রুপ। একেকটি গ্রুপকে ‘গ্যাং’ বলা হয়। লাড়া দে, ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার, ফিফটিন, বø্যাক রোজ, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার- এ রকম শতাধিক নামে গ্রুপের কয়েক হাজার কিশোর পুরো রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

জানা গেছে, র‌্যাবের পক্ষ থেকে রাজধানীতে সক্রিয় এলাকাভিত্তিক ৫০টি গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট তালিকা করা হয়েছে। এই ৫০টি গ্যাংয়ের ৫০ জন গডফাদার রয়েছে। যেসব গ্যাংয়ের তালিকা করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েজ, বিগ বস, নাইন স্টার, নাইন এমএম বয়েজ, এনএনএস, এফএইচবি, জিইউ, ক্যাকরা, ডিএইচবি, ব্ল্যাক রোজ, রনো, কে-নাইন, ফিফটিন গ্যাং, পোটলা বাবু, সুজনা ফাইটার, আলতাফ জিরো, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, তুফান, থ্রি গোল, শাহীন-রিপন এবং নাজিম উদ্দিন গ্যাং। মিরপুর এলাকার যেসব গ্যাংয়ের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে বিহারী রাসেল গ্যাং, বিচ্ছু বাহিনী, পিচ্চি বাবু ও সাইফুল গ্যাং, ‘সি’ বøকের সাব্বির গ্যাং, ‘ডি’ ব্লকের বাবু-রাজন গ্যাং, ‘চ’ ব্লকের রিপন গ্যাং, শাহীন-রিপন গ্যাং এবং নাজিম উদ্দন গ্যাং। তেজগাঁওয়ের মাঈনুদ্দিন গ্যাং, কাফরুলের নয়ন গ্যাং, তুরাগের তালাচাবি গ্যাং, ধানমন্ডির নাইন এমএম, একে ৪৭, ফাইভ স্টার গ্রুপ, রায়েরবাজারের স্টার বন্ড গ্রুপ ও মোল্লা গ্রুপ, মোহাম্মদপুরের গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ, আটিপাড়ার শান্ত গ্রুপ ও মেহেদী গ্রুপ, খ্রিস্টান পাড়ার সোলেমান গ্যাং, ট্রান্সমিটার মোড়ের রাসেল ও উজ্জ্বল গ্যাং, হাজারীবাগের বাংলা ও গেন্ডারিয়ার লাভলেট, হাতিরঝিলের লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল-চিনে ল, টিকটক-খাইছি, কোপাইয়া দে ও ঝিরঝির গ্রুপ, বংশালের জুম্মন গ্যাং, মুগদার চান-জাদু, ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভান্ডারি গ্যাং, চকবাজারের টিকটক গ্যাং ও পোটলা সিফাত গ্যাং এবং শ্যামপুরের ফইন্নী গ্রুপ। গত ২২ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপের ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা স্থানীয় ‘পাটালি’ ও ‘অ্যালেক্স ইমন’ গ্রুপের সদস্য।

অন্যদিকে ঢাকার পাশে সাভার, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ছাড়াও সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনায় রয়েছে অর্ধশত কিশোর গ্যাং গ্রুপ। চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে অন্তত ছয়টি গ্যাং। চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার, ফয়েস লেক, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক গ্রুপ।

খুলনা শহরে কিশোরদের অন্তত সাতটি গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে ভয়ংকর গ্যাংগুলো হচ্ছে স্টার বয়েজ, হিরো বয়েজ, ডেঞ্জার বয়েজ, গোল্ডেন বয়েজ ও টিপসি। শহরের বয়রা, বৈকালি, মুজগুন্নি, খালিশপুর, আলমনগর মোড়, দৌলতপুরে রয়েছে কিশোরদের সরব উপস্থিতি। সিলেট শহরে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠেছে কিশোরদের সাত-আটটি গ্যাং। উপশহর, টিলাগড়, মদিনা মার্কেট, তালতলা, টুকেরবাজার, দক্ষিণ সুরমার কদমতলী এলাকায় রয়েছে তাদের আধিপত্য।

সাভারে কিশোর গ্যাং নেতা মঞ্জুর হাতে কলেজছাত্র মারুফ খুনের পর সবাই আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে এখন বেপরোয়া। আশুলিয়ার শিমুলিয়া নাল্লাপোল্লা গ্রামে কিশোর গ্যাং মসজিদের মোয়াজ্জিনের পায়ের রগ কেটে দিয়েও বহাল। স্থানীয়রা মানববন্ধন প্রতিবাদ করেও স্বস্তিতে নেই।

এমএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়