গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি উধাও, দেখভালও নেই

আগের সংবাদ

খালেদার হার্ট ও কিডনির সমস্যা

পরের সংবাদ

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত

প্রকাশিত: জুন ১, ২০২১ , ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ১, ২০২১ , ৯:০৮ পূর্বাহ্ণ

পরাধীন ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তানের কালো অধ্যায় পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই মহান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা ঘটনা, যার কারিগর হিসেবে কেউ আখ্যায়িত হয়েছেন নায়কের অভিধায়; কেউবা আবির্ভূত হয়েছেন খলনায়কের চরিত্রে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সেসব ঘটনা ও তার নায়ক-খলনায়কদের কার কি ভূমিকা, তাই নিয়েই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গ্রন্থ ‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’। সম্প্রতি ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। এ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে ভোরের কাগজের পাঠকদের জন্য।

পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক বিধানকে আমলাচক্র থোড়াই পরোয়া করে। সামরিকতন্ত্রের নগ্ন চক্রান্তে মৌলিক অধিকারের দাবি রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত বলে বিবেচিত হতে থাকল।

১৯৫১ সালে ইরানে তেল জাতীয়করণের ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি নতুন সম্পর্ক গড়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মার্কিন সামরিক প্রভাব বলয়ে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্লুপ্রিন্টকে সামনে রেখে মার্কিনি মিত্র গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে চক্রান্ত করে গণপরিষদে মেজরিটি সদেস্যর আস্থাভাজন, নতজানু ও দুর্বল চিত্ত প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনকে হটিয়ে দেয়া হলো। চরম অসাংবিধানিকভাবে গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ১৯৫৩ সালের এপ্রিলে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভাকে বাতিল করে দেন।

নাজিমুদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের বড় তুণটিই ছিল আসন্ন খাদ্য সংকটের। ১৯৫৩ সালে ফসল ভালো হয়নি- মার্কিন সিআইএ-এর বিশেষজ্ঞ দ্বারা একটানা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ার ফলে খাদ্য

সংকটের আশঙ্কায় ব্যাপকভাবে মজুতদারি বেড়ে যায়। খাদ্যসহ জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে। প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন অত্যন্ত মরিয়া হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খাদ্য প্রার্থনা করেন। যুক্তরাষ্ট্র এক সপ্তাহের মধ্যে খাদ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিলেও খাজা নাজিমুদ্দিনের অপসারণ এবং মার্কিনি বশংবদ বগুড়ার মোহাম্মদ আলী প্রধানমন্ত্রীর পদ দখল না করা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার খাদ্য পাঠাতে বিলম্ব করেছিলেন।

১৯৫০ সালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেবা করার ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার মতো মানসিক শক্তি দুর্বলচিত্ত প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের ছিল না। এটাও ছিল নাজিমউদ্দিনকে সরিয়ে দেয়ার কারণ।

খাজা নাজিমুদ্দিনের বিদায় গ্রহণের পরপরই ১৯৫৩ সালের মে মাসে জন ফস্টার ডালেস পাকিস্তান সফরে আসেন এবং এর পরপরই প্রতিরক্ষা সচিব ইস্কান্দার মীর্জা ও প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খান ন্যাটোর ঘাঁটি তুরস্ক ও তুরস্ক থেকে সামরিক শক্তিসমূহের পারস্পরিক সমঝোতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে উঠল যে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি, গণতান্ত্রিক বিধি বিধান ও প্রথাসমূহকে আমলাচক্র থোড়াই পরোয়া করে। অত্যন্ত অন্যায় অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার কে কে সদস্য হবেন, তাদের কি কি দায়িত্ব দেয়া হবে তাও গভর্নর জেনারেল ঠিক করে দেন। এইভাবে পাকিস্তানে আমলাতন্ত্র অপ্রতিরোধ্য এক রাজনৈতিক চক্র ক্ষমতা কবজা করে। গণতন্ত্রহীনতা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ, উঠতি ধণিক বণিক, ভূস্বামী ও সামরিকতন্ত্রের নগ্ন চক্রান্ত ও খেলায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে গনতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার দাবী দাওয়া রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে থাকল।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী পূর্ববঙ্গের অধিবাসী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে এ অঞ্চলের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক বিধি-বিধানও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিল। কারণ গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের নীতিমালা বাঙালির জন্য অধিকার প্রতিষ্ঠার রক্ষা কবজ হিসেবে কার্যকর থাকবে।
কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিভ্রান্তকর ধর্মান্ধ আবেগে মুসলিম বাঙালি সম্প্রদায়ের মনন ও চিন্তা-চেতনা আচ্ছন্ন ছিল বলেই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসকচক্রের চতুর ও চক্রান্তমূলক পদক্ষেপগুলো বাঙালির মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে সামগ্রিকভাবে ধরা পড়েনি। ধর্মীয় উম্মাদনা ও চেতনা বাঙালির আত্মপরিচয় ও সত্তাকে বিভ্রান্তি ও বিস্মৃতির চোরাবালিতে ঠেলে দেয়। যারা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বাঙালি তার বাঙালিত্ব বিস্মৃত হয়ে মনেপ্রাণে কেবলমাত্র একজন পাকিস্তানি হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে। এই মনোভাব থেকে সে তার নিজস্ব বাঙালি স্বার্থও একে একে পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিতেও কুণ্ঠিত হয়নি। কারণ বাঙালি ভেবেছিল সবাই যখন পাকিস্তানি, মুসলিম এবং ‘ভাই ভাই’ তখন সর্বক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানি ও পূর্ব পাকিস্তানিদের স্বার্থ এক ও অভিন্ন।

সেজন্য ১৯৪৮ সালে মার্চ মাসে বাংলা ভাষার দাবিতে ঢাকায় ছাত্রদের প্রথম শোভাযাত্রায় স্থানীয় অধিবাসীদের ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ও ‘ইসলাম রক্ষার’ ধ্বনি তুলে সশস্ত্র আক্রমণ লক্ষণীয়। ১৯৫০ সালে কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠীর উসকানিতে দাঙ্গা সংঘটিত করতেও তার উৎসাহের অভাব ছিল না। বাঙালির মানস চেতনার এই পশ্চাদপদতা ও ধর্মীয় জাতীয়তার ভিত্তিকে অপসারণ ব্যতীত গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক শোষণের প্রতিকার দাবি ‘শত্রু-চক্রের’ কাজ বলে পূর্ববঙ্গের জনগোষ্ঠীর কাছেও প্রতীয়মান হয়েছে।

আগামীকাল প্রকাশিত হবে
‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মূলধারা’
‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’- বইটি পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনে (ভোরের কাগজ কার্যালয়, ৭০ শহীদ সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা)। এ ছাড়া সংগ্রহ করা যাবে bhorerkagojprokashan.com থেকেও।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়