এলএসডিসহ গ্রেপ্তার পাঁচ শিক্ষার্থী রিমান্ডে

আগের সংবাদ

রাবির সাবেক উপাচার্য সোবহানের তিন ‘সহযোগীর’ ব্যাংক হিসাব তলব

পরের সংবাদ

হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ নিতে বাবুনগরী ও শফীপন্থিদের দৌড়ঝাঁপ

প্রকাশিত: মে ৩১, ২০২১ , ৭:২৩ অপরাহ্ণ আপডেট: মে ৩১, ২০২১ , ৭:৩২ অপরাহ্ণ

বহুল আলোচিত-সমালোচিত হেফাজতে ইসলামের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিরোধ আবারো প্রকাশ্যে আসছে। সংগঠনটিতে চলমান সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। সরকারের গ্রিন সিগন্যালে কোনঠাসা ‘আল্লামা শফীপন্থীরা’ চাঙ্গা ভাব নিয়ে ইতিমধ্যে সারাদেশে কমিটি করার ঘোষণা দিয়েছে। উল্টোদিকে জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে বিলুপ্ত কমিটির নেতারাও ভেতরে ভেতরে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় প্রয়াত আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে ২০১৩ সালে আলোচনায় আসা বিতর্কিত সংগঠনটি খুব শিগগিরই দুটি ভাগে বিভক্ত হওয়ার আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

চলতি বছরের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা করে নেওয়া কর্মসূচি ঘিরে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে হেফাজতের ১৭ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান। এরপর সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক এক নারীসহ নারায়ণগঞ্জে রয়েল রিসোর্টে স্থানীয়দের হাতে আটক হওয়ার পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে একে একে বেরিয়ে আসে হেফাজতের নেতাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নানা কাহিনী। সহিংসতা ও জ্বালাওপোড়াওয়ের অপরাধে সারাদেশে ১৫৪টি মামলা করে পুলিশ। এসব মামলায় সংগঠনটির শীর্ষ অর্ধশতাধিক নেতাসহ প্রায় দেড় হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিতর্ক এড়াতে গত ২৫ এপ্রিল রাতে হঠাৎ এক ভিডিওবার্তায় হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন সংগঠনটির আমির জানুয়েদ বাবুনগরী। এ ঘোষণার পরপরই জোয়ার ওঠে হেফাজতের শফিপন্থি শিবিরে। বাবুনগরীর ঘোষণার এক ঘণ্টার মধ্যেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে হেফাজতের কমিটি ঘোষণা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন শফিপন্থিরা।

তাদের এই তৎপরতাকে হুমকি হিসেবে দেখে কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার তিন ঘন্টার মধ্যে নিজেকে প্রধান রেখে গভীর রাতে পুনরায় পাঁচ সদস্যের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা দিয়ে বসেন বাবুনগরী। এ আহবায়ক কমিটিতে ঠাঁই দিলেন তারই আস্থাভাজন দুই হেফাজত নেতাসহ মোট চার নেতাকে। এ আহবায়ক কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হলেন জুনায়েদ বাবুনগরীর মামা আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। নুরুল ইসলাম জিহাদীকে রাখা হয় সদস্য সচিব পদে। বাবুনগরী ঘোষিত বিলুপ্ত কমিটিতেও জিহাদী ও মুহিব্বুল্লাহ একই পদে ছিলেন। এছাড়া এই কমিটিতে ‘অরাজনৈতিক গ্রহনযোগ্য’ ব্যক্তি হিসেবে মাওলানা সালাহ উদ্দিন নানুপুরী ও অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীকে সদস্য ঘোষণা করা হয়।

এরপর শফীপন্থী আলেমরাও নড়েচড়ে বসেন। তারা প্রয়াত আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানীর নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সরকারের পদস্থ একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব সাক্ষাতে বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের কমিটির বাইরে নতুন কমিটি করতে সরকারের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছেন বলে এই অংশের প্রভাবশালী ও হেফাজতের কয়েকজন উদ্যোক্তা-আলেম সূত্রে জানা গেছে। সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে তারা ইতিমধ্যে কমিটি গঠনের কাজে জেলা সফর শুরু করেছেন। শফীপন্থী হেফাজতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এসব সফরে আহমদ শফীর অনুরাগী আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করবেন। এক্ষেত্রে আগামী ১৫ জুন অবধি সময় নিতে চান তারা।

এ বিষয়ে শফীপন্থী একজন গুরুত্বপূর্ণ আলেম বলেছেন, আমরা সারাদেশ সফর শুরু করেছি। সেগুলো শেষ করে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো। আগামী ১৫ জুনের মধ্যে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারবো বলে মনে করি। কেমন কমিটি হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে এই আলেম বলেন, কাজ চলছে। আল্লামা আহমদ শফী ইন্তেকালের আগে যে কমিটি করেছিলেন, ওই কমিটিই আমরা নবায়ন করবো। সামান্য সংস্কার করবো। যারা হুজুরের আদর্শে বিশ্বাসী, ইসলামি তাহজিব তামাদ্দুনের পথে রয়েছেন, তাদের সমন্বয়েই কমিটি হবে। হেফাজতের বাবুনগরীপন্থীদের কমিটিতে রাখা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই কমিটি তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমরা তাদেরকেও রাখবো কমিটিতে, এমন পরিকল্পনা আছে। তবে তাদের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করতে হবে।

তবে কমিটি গঠনের সঙ্গে যুক্ত এই অংশের অন্য একজন আলেম বলেছেন, আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের মৃত্যুর ঘটনায় যাদের নাম এসেছে, তাদের সঙ্গে মিলেমিশে হেফাজতের কমিটি করার কোনো প্রশ্নই আসে না। যাদের হাত আহমদ শফীর রক্তে রঞ্জিত, তাদের সঙ্গে মিল-মিশের কোনো সুযোগ নেই। শফীপন্থী এই আলেম বলেন, কমিটি গঠনে আমাদের উদ্যোগ চলমান আছে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। যোগাযোগ হচ্ছে। আল্লামা শফীর আদর্শের হেফাজতে ইসলাম শিগগিরই হবে।

এদিকে শফীপন্থীদের তৎপরতায় ঘুম হারাম হয়েছে বাবুনগরীপন্থীদের। তারাও অসম্পূর্ণ আহ্বায়ক কমিটির পূর্ণাঙ্গ রুপ দিতে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছেন। সরকারের অঘোষিত শর্ত অনুযায়ী, তারা রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত নেতা খুঁজে পেতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক পদে রয়েছেন এমন নেতাদের বাদ দিয়ে ইতিমধ্যে সংক্ষিপ্ত একটি খসড়া কমিটিও তৈরি করেছেন তারা। খুব শিগগিরই এ কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাবুনগরীর তৈরি করা খসড়া কমিটি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না কোনো নেতা। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জুনায়েদ বাবুনগরী অনুসারী এক নেতা বলেন, বিতর্কিত নেতাদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৩০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটির খসড়া তালিকা তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ইসলামী দলের পদে আছেন এমন কাউকে খসড়া কমিটিতে রাখা হয়নি। ৩০ সদস্যের খসড়া কমিটিতে জুনায়েদ বাবুনগরী আমির, মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদীকে মহাসচিব এবং আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়। কমিটিতে মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান, মুফতি মোবারক উল্লাহ (বি-বাড়িয়া), মাওলানা আনাসসহ (ভোলা) কয়েকজনকে নায়েবে আমির হিসেবে রাখা হয়। ওই কমিটি থেকে বাদ যাচ্ছেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব মানুনুল হক, নাছির উদ্দিন মুনির, সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, কেন্দ্রীয় নেতা জাকারিয়া নোমান ফয়জী, মীর ইদ্রিস, মুফতি হারুন ইজহারসহ নানা ইস্যুতে বিতর্কে জড়িয়ে পড়া হেফাজতের নেতারা। একইভাবে বাদ যাচ্ছেন আল্লামা আহমদ শফীর হত্যা মামলার অভিযুক্ত নেতারাও। যদিও জুনায়েদ বাবুনগরী নিজেই আল্লামা শফী হত্যাকাণ্ডে চার্জশিটভুক্ত আসামি।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির ও নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে হেফাজতে ইসলাম। ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল্লামা আহমদ শফীর ইন্তেকালের কারণে নতুন এ কমিটি করেছিল হেফাজত। এরপর ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী মারা গেলে নায়েবে আমির মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়েছিল হেফাজত।

রি-মির/রর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়