আয়োজকদের খোঁজ নেই, ক্ষুব্ধ হয়ে চলে গেলেন প্রতিমন্ত্রী

আগের সংবাদ

জনপ্রত্যাশার চাপে অর্থমন্ত্রী

পরের সংবাদ

গণতন্ত্রের বিদায় ঘণ্টা

প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২১ , ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৯, ২০২১ , ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ

পরাধীন ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তানের কালো অধ্যায় পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই মহান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা ঘটনা, যার কারিগর হিসেবে কেউ আখ্যায়িত হয়েছেন নায়কের অভিধায়; কেউবা আভির্ভূত হয়েছেন খলনায়কের চরিত্রে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সেসব ঘটনা ও তার নায়ক-খলনায়কদের কার কি ভূমিকা, তাই নিয়েই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গ্রন্থ ‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’। সম্প্রতি ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। এ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে ভোরের কাগজের পাঠকদের জন্য।

জিন্নাহর উত্তরাধিকারী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, গোলাম মোহাম্মদ, ইস্কান্দার মীর্জা ও জেনারেল আইয়ুব। এদের মধ্যে লিয়াকত আলী খান পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খর্বের মতলবে ব্যস্ত ছিলেন।

জিন্নাহর মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দিন গভর্নর জেনারেল হলেন। সংবিধান উদ্ভূত এ পদটি রাষ্ট্র পরিচালনায় সব শক্তি কাঠামোর উৎস হলেও নাজিমুদ্দিন ছিলেন দুর্বল চিত্তের মডারেট ব্যক্তি। প্রশাসনের চোখে জিন্নাহর উত্তরাধিকারী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, গোলাম মোহাম্মদ, ইস্কান্দার মীর্জা ও জেনারেল আইয়ুব খান। যারা আমলাতন্ত্রের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্থাপন করার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। কিন্তু নাজিমউদ্দিন গণতান্ত্রিক প্রশাসন প্রবর্তন ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়নে তেমন উৎসাহী ছিলেন না।
অন্যদিকে অত্যন্ত দুর্বল দৃষ্টিশক্তির কারণে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের পক্ষে ফাইলপত্রের খুঁটিনাটি দিক পরীক্ষা ও ‘নোট’ নির্দেশ প্রদান অসম্ভব বিধায় আমলাদের হাতে সব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন এবং ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম লীগকে পুনর্গঠিত করারও ব্যর্থ প্রয়াস চালাননি।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল জাঁদরেল এ প্রধানমন্ত্রী পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খর্ব করার মতলবে তখন ব্যস্ত। ভাষাবিরোধকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গের জনসাধারণের দাবি-দাওয়া উত্থাপনকারীদের ‘ইসলাম’ ‘পাকিস্তান জাতির শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার ‘মহান’ উদ্যোগে অত্যন্ত উৎসাহী ভূমিকায় অবতীর্ণ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৮ নভেম্বর তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করলে ‘আমলাতান্ত্রিক স্বৈরাচারের’ হাতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকগণ অপমানিত ও উপেক্ষিত হন।
এই সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদটির সঙ্গে প্রায় সমান্তরালভাবে সংযুক্ত আমলাতন্ত্রের উক্ত চক্র-কাঠামোয় প্রতিরক্ষা সচিব এবং অর্থমন্ত্রী, যিনি সিনিয়র ব্যুরোক্র্যাট, যথাযথ অর্থেই শক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে অচিরেই পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রে আবির্ভূত হন। প্রতিরক্ষা সচিব জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা যার পেছনে ছিল সামরিক বাহিনী আর অর্থমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদের পেছনে ছিল আমলা, পাঞ্জাবি চক্র, বণিক গোষ্ঠী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ রাজনৈতিক মহলের সমর্থন।
রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবর্তমানে এবং ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কোন্দল ও গণবিচ্ছিন্নতার কারণে এবং তদানীন্তন গণপরিষদের অধিষ্ঠিত সদস্যদের অধিকাংশ ‘স্ব-স্বার্থ অন্বেষী’ চরিত্রের অধিকারী হওয়ার ফলে তাদেরই সম্মিলিত মানসিক ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলো।
কেননা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে এ আমলা চক্রের কর্তৃত্ব যে খর্ব হতো, এ বিষয়ে তারা ছিল অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক। বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাত থেকে ক্ষমতা সামরিকতন্ত্রের কর্তৃত্বে আনয়নের এক চক্রান্তে ১৬ অক্টোবর ১৯৫১ সনে রাওয়ালপিন্ডিতে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে প্রকাশ্য জনসভায় গুলি করে হত্যা করা হয়। আততায়ীকে তাৎক্ষণিক হত্যা করা হয়।
লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ড আজো রহস্যবৃত্ত। তবে ঘটনার পটভূমি এবং সামরিক ষড়যন্ত্রের কিছু তথ্য জানা যায়। কাশ্মীর সমস্যাকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষমতা এবং জাতিসংঘ কর্তৃক ১ জানুয়ারি ১৯৪৯ সনে যে চুক্তি হয় তার প্রেক্ষিতে ওই এলাকায় নিয়োজিত সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার পরবর্তীতে মেজর জেনারেল আকবর খান ও কতিপয় সেনা অফিসার বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি ও তার স্ত্রী বিভিন্ন সেনা অফিসার এবং রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ১৯৫১ সনের ২৩ ফেব্রুয়ারি আকবর খানের রাওয়াপিন্ডির বাসভবনে কতিপয় সেনা অফিসারদের কাছে পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন।
১৯৫১ সনের ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের রাওয়াপিন্ডি আসার কথা ছিল যেখানে জেনারেল আকবর সিজিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরিকল্পনা ছিল প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে গ্রেফতার করা হবে। এই লক্ষ্যে জরুরি কারণ দেখিয়ে উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক অফিসারদের তিনি ডেকে পাঠান। সরকার উৎখাতের মূল কারণ ছিল দুর্নীতি এবং বেসামরিক সরকারের অযোগ্যতা। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতজানু নীতিগ্রহণ। জেনারেল আকবর খানের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী নাসিমা আকবর, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, সাজ্জাত জহির, মোহাম্মাদ হাসান আত্তা প্রমুখ। পেছনে মদত ছিল দেশরক্ষা সচিব ইস্কান্দার মীর্জার। এ সম্পর্কে জেনারেল আইয়ুব খান আকবরের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। বেসামরিক সরকার উৎখাতে তার মৌন সমর্থন ছিল। তিনি ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার’ বইতে লিখেছেন, ‘We have a government which failed to discharges its functions properly… Akbar khan’s aim was to establish a tidier from of government.’

এভাবে পাকিস্তান জন্মের পরপরই বেসামরিক সরকারের পরিবর্তে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করতে উদগ্রীব ছিল তার আরো কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে। সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে অভিযুক্তদের ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয়। এ সময় পাকিস্তানের তেমন কোনো প্রখ্যাত আইনজীবী এই ষড়যন্ত্রমূলক মামলা লড়তে অনীহা প্রকাশ করে। সেই সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইনজীবীদের পক্ষে শেষ পর্যন্ত জেনারেল আকবর খানের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে দাঁড়িয়ে যান। তিনি এমনভাবে তীক্ষ প্রশ্ন করেছিলেন, যা সাক্ষীদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। এ সম্পর্কে আইয়ুব খানকে প্রশ্ন করার একপর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে কোর্ট ত্যাগ করেন। ষড়যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র যে বিমান বহন করছিল, তা পথিমধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়।
কিছুদিনের মধ্যে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে নাজিমউদ্দিনকে সরিয়ে গোলাম মোহাম্মদ গভর্নর জেনারেলের এই অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন পদটি দখল করতে সফল হন। গভর্নর জেনারেল হিসেবে ব্রিটিশ ভারতের অডিট ও একাউন্টস সার্ভিসের একজন সিনিয়র আমলা গোলাম মোহাম্মদের নিয়োগে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে আমলাতান্ত্রিক শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় দৃঢ়তার সঙ্গে শুরু হয়। পাকিস্তানে আগত ‘এলিট নেতৃত্ব’র আকস্মিক অন্তর্ধান পাকিস্তান আমলা চক্র বিশেষ করে পাঞ্জাবি চক্রের ক্ষমতা কুক্ষিগত ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলের পথকে অবারিত করে। পাকিস্তানের পরবর্তী রাজনৈতিক অঙ্গন এ চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রমূলক পথ ধরেই আবর্তিত ও বিবর্তিত হয়েছে।

আগামীকাল প্রকাশিত হবে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্ত’

‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’ বইটি পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনে (ভোরের কাগজ কার্যালয়, ৭০ শহীদ সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা)। এছাড়া সংগ্রহ করা যাবে bhorerkagojprokashan.com থেকেও।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়