স্বচ্ছ মানুষ কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী

আগের সংবাদ

বর্তমান নিয়ে দুর্ভাবনা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা

পরের সংবাদ

সিরাজীর জন্য কয়েকটি ছত্র

প্রকাশিত: মে ২৮, ২০২১ , ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৮, ২০২১ , ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

হারুন হাবীব

ওর পদ্য-গদ্য সবটা পড়ার সুযোগ হয়নি আমার, কিন্তু হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে প্রায় পুরোটাই আমি পড়তে পেরেছিলাম। বন্ধু বা বন্ধুস্থানীয় বলে এমন দাবি করাই যায়। ওরকম সাদাসিধে, প্রাণবন্ত-আত্মাভোলা বন্ধুজন খুব বেশি হয় না। এমনিতে স্বভাবগত বদভ্যাসে সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশবার সুযোগ তৈরি হয়নি আমার। হলে কেমন হতো তাও জানিনে। কিন্তু হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সঙ্গে হয়েছিল।

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জমে থাকতেন সিরাজী। সে আড্ডা এমনই মশগুল যা দিনরাত ভুলিয়ে দেয়। সবাই সবকিছু পারেন না, কেউ কেউ পারেন। সেই পারার একজন ছিলেন সিরাজী। আমাদের তারুণ্যে সৃজনশীল মানুষদের, কবি-লেখক-শিল্পীদের আড্ডার ব্যাপারটি ছিল জরুরি। কি পূর্ববঙ্গ কি পশ্চিমবঙ্গ, বাঙালি সৃজনশীলদের আড্ডা না হলে চলে নাকি! আড্ডা জমতো রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, ঝাঁপ বন্ধ করা বইয়ের দোকান; আবার কখনো বন্ধুজনের বৈঠকখানা কিংবা অফিস ছুটির পর কারো অফিস ঘরে। শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি, প্রেম-বিরহ নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা। কখনো পড়া হতো কবিতা কিংবা গল্প। আলোচনা হতো কে কি লিখেছেন, কে কি লিখছেন। জানি না এখনকার দিনে তেমন আড্ডা হয় কিনা। হলেও আমার যাওয়া হয় না, সময় বদলেছে বলে স্বরূপও বদলেছে হয়তো।

মনে পড়ে, ১৯৭৫-এর পর কবি-লেখকদের এক ছোট আড্ডায় সিরাজীর সঙ্গে প্রথম দেখা। দরাজদিল প্রিয়জন, কবি ও স্থপতি রবিউল হোসাইনের আয়োজনে বরেণ্য কবি বেলাল চৌধুরীর সেই আড্ডায় প্রথম যেদিন সিরাজীর সঙ্গে দেখা, বলা যায়, সেদিন থেকেই বন্ধুত্ব। সুদর্শন, খুব দীর্ঘ নয়, তেমন ফর্সা না হলেও আমার মতো উৎকট কালচে রঙের নয়। ভালো ছাত্র, ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ভালো রেজাল্ট হাতে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। কয়েক বছরের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে পেশাদার ইঞ্জিনিয়ার হয়েছেন। দেশ-বিদেশে চাকরি করেছেন। আমরা সমসাময়িক। ১৯৪৮ সালেই জন্ম আমাদের।

স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের স্থপতিকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের মাঠ থেকে সদ্য ফিরেছি, তারা অসহায় হয়ে পড়েছি। সেনাপতি শাসন সবকিছু পাল্টে দিতে শুরু করেছে। অসহনীয় সময় পাড় হচ্ছে! গল্পে গল্পে জানা হয়ে গেল সেই আত্মঘাতী বিজাতীয় পরিবর্তনে আমরা দুজনেই ক্রুদ্ধ। দুজনেই দেখে চলেছি জাতীয় ইতিহাস ও আদর্শের পরিকল্পিত লুণ্ঠন। অতএব বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি। আমি মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে কেবল সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হয়েছি। সিরাজী নব্য পেশাজীবী প্রকৌশলী। তার মধ্যে দুজনেই লেখালেখির মানুষ। অতএব বন্ধুত্ব হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল।

২০২১ সালের ২৪ মে রাত ১১টায় এই কবি পাড়ি জমালেন পরপারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই দুঃসংবাদটি প্রথম পেলাম। সিরাজী যে অনেক দিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন, জানি না আমি। প্রথম যেদিন ওর আকস্মিক অসুস্থতার খবর এলো সেদিন তেমন গুরুত্ব দেইনি। ভেবেছিলাম শরীর খারাপ হয়েছে, সেরে উঠবে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে অসুখের মাত্রাটা বাড়ল। একদিন শুনি সিরাজী ‘লাইভ সাপোর্টে’ গেছেন। এমন অবস্থায় ওর বন্ধুজন, শুভার্থীদের উদ্বিগ্ন হবার কথা। হয়েছিলামও। ভেবেছিলাম হাসপাতালে যাবো, কিন্তু মহামারির এমনই দাপট যে সেটিও হয়ে ওঠেনি। অতএব সেই যে মাস কয়েক আগে দেখা, একাডেমির এক আলোচনা বৈঠকে, সেটিই শেষ দেখা হয়ে থাকল। এ যে কত বড় আক্ষেপ আমি বুঝি।

এই তো সেদিন, এপ্রিল মাসে বাংলা একাডেমির সভাপতি ও কয়েকবারের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান চলে গেলেন। জামান ভাই গুণী মানুষ, আমার অন্যতম প্রিয়জন। তিনি করোনার শিকার হলেন। এবার চলে গেলেন একাডেমির নতুন মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। ২০১৮ সালে সিরাজী যখন বাংলা একাডেমির দায়িত্ব পেলেন, আমি আনন্দিত হয়েছিলাম। ফোনে কুশল বিনিময় করে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। বারবার যেতে বললেন একাডেমিতে। দৃঢ়চিত্তে বললেন, অনেককিছু করতে চান, পুরনো খোলস বদলাতে চান। কিন্তু আনুষ্ঠানিক এক-দুটি উপলক্ষ ছাড়া আর যাওয়া হয়নি একাডেমিতে আমার। মাস কয়েক আগেও ফোনে কথা হলো। বললেন, করোনার সংকট আছে তবু একাডেমিতে যাই। আরো বললেন, দেখা হবে। সে দেখা আর হয়নি।

ছাত্রজীবন থেকেই সিরাজী কবিতার মানুষ। কবিতাই ছিল তার আসল প্রেম। তবে অনুবাদ, প্রবন্ধ, শিশুতোষ এবং উপন্যাসও রচনা করেছে বেশ। ওর কিছু বই আমার কাছে আছে, সব নয়। কাব্যগ্রন্থ ৩০টিরও ওপর। উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ মিলিয়ে অর্ধশতাধিক গ্রন্থ। উল্লেখযোগ্য ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’, ‘নোনা জলে বুনো সংসার’, ‘সিংহদরজা’, ‘সারিবদ্ধ জ্যোৎস্না’, ‘স্বপ্নহীনতার পক্ষে’, ‘একা ও করুণা’Ñ ইত্যাদি। আমি মূলত গদ্যচর্চা করি। বেশিরভাগই মুক্তিযুদ্ধের গল্পকথা, নানা উপাত্ত, জাতীয় জীবনের সাহসী ও কষ্টগাঁথা লিখি। ওর প্রথম কবিতার বই ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’ (১৯৭৫) বেরোতেই কী যে আনন্দ তার। আড্ডাতেও বসেছি উপলক্ষটি নিয়ে। আমার প্রথম উপন্যাস ‘প্রিয়যোদ্ধা প্রিয়তম’ বেরিয়েছে ১৯৮০ সালে। সে নিয়ে আক্ষেপও কম নেই বন্ধুদের। কারণ উদযাপন করতে পারিনি।

তার কাব্য ‘বেদনার চল্লিশ আঙুল’, ‘জয় বাংলা বলো রে ভাই’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ‘স্বনির্বাচিত প্রেমের কবিতা’ এবং ‘কবিতাসমগ্র’ পড়েছি। জীবনে সাফল্যও লাভ করেছেন। বহুবিধ রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারও লাভ করেছেন। অনেককাল ছিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি।

সিরাজীর গদ্যও ভালো লাগত আমার। নিজস্বতা, ভাষা ও বর্ণনার স্বতন্ত্রতা আছে। যা লিখেছে তা বাইরে থেকে নয়, ভিতর থেকে। এমনটা পারেন না সবাই। ওর আখ্যানমূলক ও আত্মজৈবনিক রচনাগুলোও স্বতন্ত্রধারার। সেখানে বিষয়ভাবনায় সুগভীর বৈচিত্র্যতা বিদ্যমান। নৈর্ব্যক্তিক ব্যঞ্জনায় প্রতিভাসিত সময়-সমাজ ও বিশ্বপরিস্থিতি। আমাকে বেশি করে কাছে টেনেছে গণমানুষের সংগ্রামী জীবনাতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রগতির অভিযাত্রায় অংকিত ওর রচনাগুলো। শিশুকিশোর সাহিত্যে ছিলেন সিরাজী স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। সবমিলিয়ে আমাদের সাহিত্যে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর আসন আছে, বৈশিষ্ট্যতা আছে।

প্রিয়জন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী এখন আজিমপুর কবরস্থানে, চিরনিদ্রায়। নিশ্চয়ই যাবো সেই কবরে ফুল দিতে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়