কবিতা

আগের সংবাদ

নিরাপদ মাতৃত্ব প্রত্যেক নারীর অধিকার

পরের সংবাদ

তৃতীয় মানুষ

প্রকাশিত: মে ২৮, ২০২১ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৭, ২০২১ , ১১:৫৩ অপরাহ্ণ

শাহমুব জুয়েল

রিডিং পড়তে দাঁড়াল ইশিতা। কণ্ঠ ভারি, কেমন করছে সে। ম্যাডাম ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইল। সহপাঠীরা হাসতে হাসতে কাঁধে কাঁধে ঢলে পড়ছে। চারদিকে তাকিয়ে এবং হাসি দেখে চোখে জল এলো ইশিতার। সহপাঠীদের হাসি তার চোখের জলের ওপর দিয়ে উড়তে লাগল। মনে খটকা লাগলে সে ম্যাডামকে প্রশ্ন করলÑ হামছিরা খিলকায় ক্যান? ম্যাডাম বললÑ এই চুপ! ইশিতা তুমি পড়। ঘণ্টা পড়ল ম্যাডাম চলে গেল। ইশিতার পাশে বসা ছিল মেহজাবিন। সে তার দিকে ঘনঘন তাকাচ্ছে। ইশিতাও তার দিকে তাকায়। নাক চিটকে মেহজাবিন বেঞ্চ ছেড়ে চলে গেল। ইশিতা নিজের শরীরের দিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে এবং অন্যদের সাথে মিলায়। কোথায় যেন গরমিল রয়েছে ঠিক ধরতে পারল না, কিন্তু মনে সন্দেহ জাগেÑ অ্যাই বদন ব্যাছিস লাগে ক্যান? হামছিরা দেইখা খিলকায় ক্যান? নিজেকে বুজাতে পারেনি। কান্না করতে করতে বেরিয়ে গেল। ব্যাগ কাঁধে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির উঠানে এলো সে। গাছের ছায়ার ফাঁকে রোদ নাচ্ছে। বড় বাড়ি। পায়ে পায়ে জুতার শব্দ। উঠানে তারা বউছি খেলছে। ইশিতা চোখ মুচতে মুচতে এগিয়ে গেল।

ব্যাগ রাখে ছিমের মাছায়। স্কুল ছুটির পর সে প্রতিদিন নিশি ও প্রিয়ার সাথে খেলা করে। তাদের খেলার সাথী সে। আজ মনটা ভালো না; তবুও খেলতে মন চায়। খেলা দেখলে কিশোরীদের মন উথলে ওঠে। সে সামনে এগিয়ে এলো। সামনে যেতেই প্রিয়া ধাক্কা দিয়ে বললÑ তোরে যেন আর উঠানে না দেহি। কতি কাচ্ছি করতেছে ক্যান? কোনো কথা কইবি না। মানে! কইছি আবি না; শেষ। ইশিতা কোনো উত্তর করল না। ব্যাগ নিয়ে ফিরতেই দেখে মেহজাবিন। প্রিয়া তাকে খেলতে ডাকছে। ইশিতা তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাল কিন্তু কিছু বলেনি।

স্কুল ছেড়েছে সে। কারো সাথে মিশে না; একা একা ঘুরে বেড়ায়। ঠকবাজের দুনিয়া, কেউ কারো ধার ধারে না। বিপদে আপদে তো আসে না; বরং ত্রুটি পেলে খোঁচাখুঁচি করে। কাউকে বেড়ে উঠতে দেয় না। ইশিতা যত বড় হচ্ছে, আশপাশে ততই হিসহিস শব্দ বাড়ছে। তার অনেক স্বপ্ন জমেছিল। মাঝে মাঝে সে স্বপ্নের আড়ালে উঁকি দিয়েছে। তার স্বপ্ন ক্ষুধা হয়ে রইল। পারুলের আঁচলে থাকে সে। মায়ের খবর পায় না। মা মরা মেয়ে। পারুল তার খালা। সে সন্তানহারা। ইশিতাকে সে সন্তানের মতো দেখে। ঘরে ঢুকলে পারুল খাবার খেতে ডাকে। ইশিতা কোনো উত্তর করে না। পারুল এগিয়ে আসে, তার চোখ মরিচের মতো লাল। পারুল তাকে জড়িয়ে ধরে। কী হয়েছে মা! ইশিতা দু’হাতে পারুলকে জড়িয়ে বললÑ খালা একটা হাচা কথা কইবা? কী কথা। হামছি কি টোনা না টুনি? হামছিরে খোয়ারি করে ক্যান? পারুল জিভ কামড় দেয় মুখ লুকায়। ইশিতা নাছোড়বান্দা! কিছু কও না ক্যা। সে খালাকে জড়িয়ে ঝাঁকাতে থাকে। খালা সত্য কথাটা কও! মুখ আড়াল কর নাÑ হামছি কী? পারুল বিস্মিত গলায় ইশিতাকে বললÑ তুমি কিছুই না! ইশিতা তাকে চেপে বললÑ কিছুই না, হামছি কিছুই না! সূর্য ডুবে গেল, অন্ধকার ভারি হতে লাগল। পারুলের মুখ ঝাপসা হয়ে গেল। ইশিতার চোখের পাপড়ি ভেজা, সে ঘরের বাহিরে চলে এলো। সামনে সরু রাস্তা। সেই রাস্তা ঠেকেছে মহাসড়কে। চোখ মুচতে মুচতে সে দৌড়াতে লাগল। পারুল জোরে জোরে ডাকে কিন্তু সে পেছনে ফিরেও দেখে না।

সামনে ডাকাতিয়া নদী। নদীর ওপর ট্যাপলা ব্রিজ। দু’পাশে দু’শহর। শহরের সংযোগ ব্রিজ। ডাকাতিয়ার দু’পাশে সোনার বারের মতো আলো চকচক করছে। ব্রিজ পার হয়ে নদীর কানছা ঘেঁসে লঞ্চঘাট। সে হাঁটতে হাঁটতে ঘাটে চলে এলো। ঘন ঘন লঞ্চের হর্ন বেজে উঠছে। তাড়াহুড়া করে উঠে গেল। নারী ও পুরুষ পা মুটিয়ে বসে আছে। তাদের সম্পর্ক অনেক মধুর। কিন্তু তাকে দেখামাত্রই ফোঁড়ন কাটে টিকেট মাস্টার। কোথায় যেন তাকে দেখেছিল সে। ঠিক মনে পড়ছে না; তবে জানাশোনা। সে দাঁত খিঁচে বললÑ ভাড়া দে! ভাড়া নেই ইশিতার। হাত ধরে টানাটানি করে। ইশিতা বললÑ হামছিগোরে নিয়া কাচ্ছি খোয়ারি করতেছ? কী চিস লাগে না? এ ভাই এবায় ধইরা টানো ক্যা, মোরে কী জজম্যান মনে ওয় না। মনে হয়Ñ কী কও! তুই তো সেই! আশপাশে লোকেরা খটখট হাসতে লাগল। মনে হচ্ছে হাসি নিয়েই সকলে যাত্রা করছে। বিড়বিড় করে কিছু বলতে চায় কিন্তু হাসি ও কানাঘুষায় তা ঠোঙার মতো টিচকে পড়ে জলের ওপর। সে বোকাসোকা হয়ে ডেকের পাশে বসল। তার পাশে দাঁড়িয়ে দু’জন জোয়ান সিগেরেট টানছে। ঢেকে দুটো শিশু নিয়ে মহিলা বসে আছে। মনে হচ্ছে পরিবারসহ শহরে যাচ্ছে।

মাঝনদী থেকে বাতাস ধেয়ে আসছে। সিগেরেটের ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে শিশুদের মুখে। তারা খকখক করছে। মহিলা ওড়নার আঁচল দিয়ে শিশুদের আড়াল করছে। তারা নদীর দিকে রুখে আছে এবং সিগেরেট টানতে টানতে বললÑ মেঘনা নদীর টেউগুলি নারীর মতো। আরেকজন বলছে না না ওই গুলির মতো। দু’জনে হাসতে হাসতে গলে পড়ছে। ইশিতা বিরক্ত হয়ে বললÑ এই টেন্না! এতাল থেকে পত হও। বদন ব্যাচিস হইয়া যায়। ওই দিকে দ্যাহো লুটকি টোনারা ব্যাচিস করছে। শ্বাস নিতে পারছে না। তারা চোখ ত্যারা করে সরে গেল। ইশিতা না দেখার ভান করল।

মেঘনা প্রশস্ত নদী, কোসাগুলোতে ছোট ছোট বাতি, ঢেউয়ের তালে তালে লাফিয়ে উঠছে। ইশিতা জলের খেলা দেখছে। ফুলে উঠছে জল। মনে পড়ল মেহজাবিনের কথা। সে বলছিল উঠতি বয়সে মেঘনার মত নাকি শরীরে জোয়ার আসে এবং বুকের দু’পাশে মাংস ফুলে উঠে। সে মাংসে থাকে আদম সন্তানের বাঁচার আহার। জল আছড়ে পড়া দেখে ইশিতার শরীর হিরহির করছে। অভিমানী চোখ ছুড়ে দেয় চাঁদের দেশে। চাঁদের মিহি আলো ঠিকরে পড়ে তার বুকের ওপর। ইশিতার গায়ের রং ফর্সা। চাঁদের আলোর স্রোতে তার ফর্সা রং চিকন হয়ে খেলা করছে। জোয়ার জাগে না। চাঁদের সাথে নিজেকে মিলিয়ে দেখে। কোথায় যেন খটকা লাগে তার। লঞ্চ চলছে। বড় নদী পার হয়ে ছোট নদীর বুকে। হঠাৎ দু’ধারে আলো দেখে ইশিতা। ঠুন ঠুন ভাঙরি শব্দ। নতুন আলো চোখে পড়লে ওপরে তাকায়। আলো নাচ্ছে, নিচে কালো জল, কী বিচ্চিরি গন্ধ! সে ওড়না তুলে নাক চেপে ধরল। পাশের ছেলেটা চোখ ট্যাপলা করে তাকে দেখছে। ইশিতা বললÑ এটা কোনতা লো? ছেলেটি বললÑ বুড়িগঙ্গা এবং হাসতে হাসতে চলে গেল।

লঞ্চ থামে। সবাই হুট হুট নেমে পড়ে। ইশিতাও তাদের পেছনে পেছনে নেমে গেল। চোখ ওপরে ওঠায়, বড় করে লেখা আছেÑ সদরঘাট নৌবন্দর। ঘাটের পাশে ফুটপাত। সে সেখানে বসে রইল। পেছন থেকে তালি দিতে দিতে সামনে এলো একজন, তার পরনে শাড়ি। আঁচল ধরে টান দেয় এক ব্যাটা। সে তালি দিতে দিতে আঁচল মোড়া দিয়ে বললÑ ওই খানকির পোলা! ব্যাটা দ্রুত পালিয়ে গেল। রাস্তা ক্লিয়ার! পথচারীদের কাছে সে হাত বাড়ায়। পথচারী দ্রুত টাকা দিয়ে হিসহিস করতে করতে পা বাড়ায়। হঠাৎ ইশিতার ওপর নজর পড়ে তার। সে ইশিতার কাছে বসে এবং বললÑ কতি খোল কোনতালে? নাম কী লো? ইশিতা। তুমছি কে লো? সে তিনটা তালি দিয়ে বলে উঠলÑ হামছি পূর্ণিমা। ইশিতা বললÑ তুমি টোনা না টুনি? সে হা হা করে তালি দিতে দিতে বললÑ তুইও ছিবরি আমিও ছিবরি। তার দিকে তাকিয়ে সে নিজের শরীরের ভাঁজ খুঁজে পায়। উঠে দাঁড়ায় ইশিতা। পূর্ণিমা বললÑ এই গতিয়া হামছির সাথে তুমছি ঠ্যাক। ইশিতা ঘাটের দিকে তাকিয়ে পা বাড়াল।

দু’জনে হাঁটছে। জনসমাগম দেখলেই পূর্ণিমা তালি দেয়। ইশিতা বললÑ গতিয়া কিতলি বদ ক্যান? পূর্ণিমা হাসতে হাসতে বললÑ রহস্য তো আছে লো। খোটো না কী রহস্য? চল তা আজকে গতিয়া; আর ডোল ঘুরমু না। তুমছিরে পাইছি নিশিও অনেক! খোলে ঠ্যাক, তুমছি হামছি টাকনি খামু, উলুঝুলু করমু। চল চল… তুমছি খোলে চল। দু’জনে টাকনি করমু, উলুঝুলু করমু। সামনে চায়ের দোকান। পূর্ণিমাকে দেখে জোয়ান পোলাপান বললÑ কীরে পূর্ণিমা। এত রাতে বাহিরে কী? লগে সুন্দরী ক্যাডা! ওরে রূপ কেমন টলটল করতেছে। কে এড্যা? এদিকে আয়… পূর্ণিমা তালি বাজাতে বাজাতে বললÑ খানকির পোলাÑ কাচ্ছি করলি ক্যান। খারা! তারা কাপ ছুড়ে পালিয়ে গেল। ইশিতা বললÑ তোমার তালিতে তো চিস আছে; গতিয়া খোটো না। এটা কইতে ছামছো? আমারে ছামাইবা? থাকতে থাকতে ছামাইবা যাবি লো গতিয়া। তো কও কীভাবে ছামাইছো? পূর্ণিমা হাঁটতে হাঁটতে বললÑ হামছিগো আদি মাতা মায়াজী। অসতি তারামণি রাজার টোনাকে তুলে নেয়। সে কলঙ্ক হামাইতে তালি বাজায় মায়াজী। ইশিতা দু’হাত তুলে নিজে নিজে চেষ্টা করল এবং দু’তিন বার চেষ্টা করলে তাল হয়ে গেল।

পূর্ণিমা তাকে তার গৃহে নিয়ে গেল। দরজা খুলে ভেতর থেকে অনেকে বললÑ নানি আসছে খোয়ারি করব। সবাই অস্থির হয়ে গেল। সবার কথা ও চলন একই রকম। পূর্ণিমা তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। ইশিতা খাটের উপরে তাকিয়ে দেখে ডোল ঝুলে আছে। পূর্ণিমাকে বললÑগতিয়া তোমরা কি উলুঝুলু কর? করি… গতিয়া করি। হামছিগো মায়াজী ডোলের তালে তালে টাকনি খাইতো। হামছিরা মাঝে মধ্যে এমন করি। বছরে কয়েক বার আনন্দ উলুঝুলু করি। খাজা মইনুদ্দিন চিশতি বাবার দরবারে পিরনি দেই। কালি পূজা হামছিগো বড় উলুঝুলু। ওই তালে আড়িয়াল উলুঝুলু হয়। এইল্যা কতি কথা রাখ। ওরে টাকনি দে লো। পূর্ণিমা হাতমুখ ধুয়ে খাবারে হাত রাখল।

পূর্ণিমার লিপস্টিক মাখার শখ। ঠোঁটে লিপস্টিক মাখে এবং ওড়নাটা মাথায় তুলে নেয়। টুকটুকে ঠোঁটের ভেতরে পানের রস। দু’রঙে তার ঠোঁট রঙিন হয়ে ওঠে। খাটের ওপর পা ঘুটিয়ে বসে সে। কে কোন ময়ালে গিয়েছিল এবং কত মুঠোয় নিয়েছে পা ঢুলতে ঢুলতে তা হিসেব কসতে থাকে। একে একে টাকার হিসেব দিলে পূর্ণিমা খাতায় ওঠায়। হিসাব শেষের দিকে। বাকি আছে নন্দিতা। তার চোখেমুখে ভয়। ধীরে ধীরে কাছে এসে টাকা হাতে দেয় সে। পূর্ণিমা দেখেই বুঝতে পারল তার কামাই ভালো না। তার শরীরের রং কুচকুচে কালো এবং হাড়গুলো দূর থেকে ঠাহর করা যায়। সে মানুষের মন জয় করতে পারে না। পূর্ণিমা তাকে সাবধান করে বললÑ তুমছি থাকবি টাকনি খাবি, ঝুলকি নাট্টু, কোন তালে নবাবজাদী ঠ্যাকছো এ খোলে। নন্দিতার চোখে জল টলমল করতে লাগল। ইশিতা খাওয়া শেষ করে খাটের কোনে পা রেখেছে। পূর্ণিমা হাত ধরে বললÑ গতিয়া দিরি কর লো ক্যান, টমকাও। সক্কাল সক্কাল ডোল ঘুরমু নে। দেইখ্যা আইবা কেমনে জজম্যানের পকেট থেকে সুড় সুড় করে হামছির হাতে ঝলকি জিরে। ইশিতার চোখের দিকে তাকায় তাকে বুঝতে শেখে। নদীর পাড়ে ঘর। গাঁধাগাধি সংসার। সারাদিন গোড়ালি চালিয়ে রাতের বিছানায় গোড়ালি বাঁকা করে ঘুমোতে হয় তাদের। নিষ্ঠুর পৃথিবী, কী অভিশাপে জীবন ছারখার হয়ে গেল, নিজেরাও জানে না। সামান্য ঘাটতিতে মাটিছাড়া হয়েছে। চারদিকে কত নাড়িভুড়িওয়ালা মানুষ। কে কার খেয়াল রাখে, খবর নিবে কার ঠ্যাকা পরছে। রাত বাড়ছে পূর্ণিমা গেইটের কাছে এসে বললÑ তোমরা সবাই টমকাইছো লো? গেইটের কাছে নন্দিতার বিছানা। সে গলা তুলে বললÑ নানি সবাই ঠ্যাকছে খোল পতায়া দেও। ডান হাতে তালা, লক করে বিশ্বাস হলো না; পূর্ণিমা বাম হাতে টেনে দেখে বারবার।

বিছানায় চলে গেল। রাত ভারি হয়ে উঠেছে। চাঁদের আলো তার গায়ে খাড়া হয়ে পড়ছে। চাঁদের দিকে চেয়ে নিজের শরীরের দিকে তাকাল এবং হাসতে হাসতে বিছানার হেলান দিল। সবাই ঘুমালেও তার চোখে ঘুম নেই। কাকে কোথায় পাঠাবে তা ভাবতে লাগল। বয়স হলে মগজের ছ্যাঁদাও সরু হয়ে যায়। মনে থাকে না। চৌধুরী বাড়িতে কাল বিয়ে; সে ভুলে গেছে। বিয়ের খবর দিয়েছিল সুফিয়া। কয়জন যাবে সুফিয়া বারবার জানতে চেয়েছিল। মুসলমানের বিয়ে নাচ গান হবে না; চৌধুরীর পোলা চ্যাচরা মাল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘ্যানর ঘ্যানর করলেও মাথা তোলে না বরং হুমকি দেয়। তবুও যা দেয়, মিস করা যাবে না তিনজনের নাম লিখে পূর্ণিমা ঘুমিয়ে পড়ল। ভোর হয়েছে। পাখিগুলো এপার থেকে ওপারে দলবেঁধে উড়ছে। ঘুম ভেঙেছে ইশিতার। চোখ কচলাতে কচলাতে জানালা খুলে দেয়। ক্ষুধার্ত পাখি। বাসায় ঢুকে চারদিকে তাকাতে লাগল। মনে হচ্ছে খাবার খুঁজছে। পূর্ণিমাও উঠল। কিরে ইশিতা কী করছ লো? ঘুম মজছে। ইশিতা বললÑ গতিয়া ওই পাখি ছামো। পূর্ণিমা উঠে গিয়ে চাল চিটে দেয়। কয়েকটা চাল খেয়ে পাখি চলে যায়। ইশিতা মনে করল, খিদে নাই। বসে আছে ইশিতা। জানালা দিয়ে কচমচে রোদ পড়ছে তার লাল ওড়নার ওপর। সে সূর্যের পাশে মেঘখণ্ডের ঘুরাঘুরি দেখছে। তার চোখকে অবসরে রেখে পাখি ঢুকে পড়ল। সে দু’টি পাখি দেখতে পেল। দু’টির শারীরিক গঠন দেখে মনে হলো তারা সহদোর। সে পূর্ণিমাকে ডাকে, পূর্ণিমা দূর থেকে আরও চাল চিটিয়ে দেয়। খাওয়া শেষ পাখি চলে যায়। পূর্ণিমা ইশিতার খোঁপায় হাত রেখে বললÑ ছামছো, কোন জাত ধর্ম নাই। জানালা খোলা, আকাশের দিকে তাকিয়ে জানালায় ভেজা কাপড় শুকাতে দেয় পূর্ণিমা।

তাদের অনেকেই নামিদামি বংশের মানুষ। জীবন আজ শুষ্ক হয়ে উঠেছে। বেঁচে থাকাই এখন বড় ধর্ম। স্যায়ানা হওয়ার পর ঘর ছেড়েছে। ঘরের আসবাব কাঁচের জিনিস হলেও তাদের জায়গা নেই। ইজ্জত রৌদ্র শুকায়, শরীরের খিদে মিটায়। সবই তো আছে, কী দোষ! সমাজ স্বীকৃতি দেয় না। শরীর কাঠজোড়া শুষ্ক মাংসে মিশিয়ে রাখতে হলে দুয়ারে দুয়ারে যেতে হবে। জনতাই তাদের মা-বাপ এবং অন্নদাতা। সবাই সেজেগুঁজে হাজির। পূর্ণিমা নিজ হাতে ইশিতাকে সাজায়। পূর্ণিমা সাজ শেষ করে ইশিতার দিকে নজর দিয়ে বললÑ কী চিস লাগছে তোরে। ময়ালের নাম এবং তাদের নাম ডেকে দেয়। সবাই প্রস্তুত, নন্দিতা আসে। ওপারে হিন্দু সওদাগরের ছেলের বিয়ে, তারা নাচ-গানের কথা বলছিল। রাতে ভুলে গেছে সে। পূর্ণিমা তার দিকে চোখ পাকিয়ে বললÑ তুমছি হামছি। হামছি ওত্তা ছামছি। ইশিতাকে নিয়ে চলল সে। প্রিয়া ও সুফিয়াকে ফোন করল। তারা ভালো নাচতে পারে। গত বছর সওদাগরের মেয়ের বিয়েতে নাচে। সওদাগর খুশি হয়ে পাঁচ হাজার টাকা বকশিশ দিয়েছিল। এবার ইশিতা আছে। ভালো নাচ ওঠে তার। খুশি না হয়ে উপায় নেই সওদাগরের।

সামনে সওদাগরের বাড়ি। কোনাভাঙা বাড়ি ছিল তার। শহরে ছেলের অলংকারের দোকান। বেশ কামাই করছে। দেয়াল উঠেছে, দেয়াল ফাটিয়ে ডিজে গান ধেয়ে আসছে। আশে পাশের ছেলে-মেয়েরা হইছই করছে। পূর্ণিমা তার দল বল নিয়ে হাজির। সিগেরেট হাতে বেরিয়ে এলো সওদাগর। পূর্ণিমাকে দেখে বললÑ বাজনা ছেড়ে দিলি? হামছি ছাইম্যা ঠ্যাকছি। সওদাগর গান করে গাঁও গরম করে। তাই তাদের দেখে দরদ লাগে তার। ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সওদাগরের ছেলে নিপুণ। ভারি বিদখুটে সে। পূর্ণিমাকে দেখেই বললÑ গেলি… এখানে কী? সওদাগরের চলার শক্তি ছেলে। সে মাথা নিছু করে চলে গেল। নিপুণ পূর্ণিমাকে ডেকে বললÑ তাড়াতাড়ি পালা। না হলে হাড়গোড় এক করে দেব তোদের। পূর্ণিমার চোখ টলমল করে। সে ঘুরে দাঁড়ায়। ইশিতা পেছনে ছিল। সামনে এসে বললÑ কী জজম্যান মনে ওয় না লো? কথা বলার সময় মুখের টোল ভেসে উঠল ইশিতার; নজর গেল নিপুণের। এই তুমি কী এদের লোক? মানে কী লো? তুমি কী ওদের মতো। ইশিতা তার চোখ দেখে বুঝতে পারল। এটা শকুনের চোখ। তাই সামনে গিয়ে বললÑ হামছিরে কি মনে হয়। জজম্যান মনে ওয় না! পূর্ণিমা ইশিতার সাহস দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগল।

সে হাসতে হাসতে ইশিতাকে ডাকে। ইশিতা কাছে গেলে পাঁচশত টাকা নোট হাতে গুঁজে দিয়ে টুঁটিতে হাত ঠোকাল এবং বললÑ তোর চেহারাটা তো ভারি মিষ্টি! ইশিতা দেরি করল না! কষিয়ে থাপ্পড় দিয়ে বললÑ এই নে তোর মিষ্টিমুখ! আশপাশে কেউ ছিল না। সে বিড়বিড় করছে। ইশিতা পূর্ণিমার হাত ধরে বললÑ গতিয়া আমরা পতি। তারা চলে এলো। নিপুণ গাল কচলাতে লাগল। ইশিতা পূর্ণিমার সাথে সারাদিন নগরের অলিগলি ঘুরে ঘুরে দেখে। স্বস্তি পেল না; অস্বস্তি শহর। সামনে রেল লাইন। দেখা হলো কালির সাথে। সে কমলাপুর রেল স্টেশনের সর্দার। পূর্ণিমা তাকে পরিচয় করিয়ে দিল। পূর্ণিমা চলে গেল। ইশিতা কালির এখন আন্ডারে। মার্কেট ও গলি ঘুরে যা পায়, তাতে পেট চালায়। কালি বছর বছর কলকাতা যায়। ওপারে তার স্বামী থাকে।

দেশ স্বাধীনের সময় তার মাসি ওখানে গেছে। তাদের সাথে তার যোগাযোগ আছে। ওই দেশে বিয়ের বিধান হওয়ায় তারা তাকে বিয়ের বন্দোবস্ত করে। সে দেশে তাদের বিয়ের বিধান হয়েছে। তাই সেখানে বিয়ে করেছে সে। কালির স্বামী কল করে। কালি ওপারে যাবে। ইশিতাকে বললÑ ঠ্যাকবি হামছির সাথে। কালি বললÑ হামছি ঠ্যাকবো তুমছির সাথে। তুমছি ঠ্যাকবা তো গতিয়া? কালি কুমিল্লা হয়ে কলকাতা যায়। রাতের ট্রেনে কুমিল্লা চলে এলো। বর্ডারে তার স্বামী অপেক্ষা করছে। কালি ইশিতাকে নিয়ে বর্ডার ক্রস করার সময়। ইশিতার আঁচল বাংলাদেশের গাছে আটকে গেল। কালি তাকে টান দিলে আঁচল ছিঁড়ে গেল। দু’জনে বর্ডার ক্রস করল। সামনে কালির স্বামী। সে কালিকে দেখে জড়িয়ে ধরল। মনে হচ্ছে দুটি দেশের শান্তিচুক্তি হচ্ছে। ইশিতা তাদের মহব্বত দেখে চমকে গেল। তারা হাঁটতে লাগল। কালির স্বামী বললÑ ও কে? হামছির গতিয়া লো! গতিয়া… গতিয়া। সে থমকে বললÑ কী কও? হামছি গতিয়া তুমি ছামো না। ইশিতার হাত ধরে বললÑ তুমছি এতালে ঠ্যাকবা। ছিসা ফারিক ঠেকাইয়া দিমু। তোমার যে টুকটুকে চেহারা ছেলেরা দেখলে পাগল হয়ে যাবে। ইশিতা মৃদু হেসে বললÑ খোল কতদূর! কালি বললÑ গতিয়া টাকনি লাগছে লা। সামনে… আরেকটু সামনে। ঘর চলে এলো। চারদিকে ঝোপঝাড় দু’পাড়ের বর্ডারগুলো এমনই ঝোপের মধ্যে মিলিত হয়েছে। ইশিতা রয়ে গেল। কালি কয়েকদিন থেকে চলে এলো।

ইশিতাকে শহরে নিয়ে গেল কালির স্বামী। সামনে সুরম্য দালান। দেখতে গাড় ওঠায়। ভেতরে মদের বার। বড় লোকের অবসরের জগৎ। বতলে বতলে মদ গেলে এবং নর্তকীদের নাচ দেখে চোখ জুড়ায়। ইশিতা ভালো ড্যান্স পারে। কালির স্বামী বারের নর্তকীদের সর্দার। ইশিতাকে সে প্রতিদিন বারে নিয়ে যায়। ইশিতা ড্যান্স করে। আলো-আঁধারি জগৎ। সে জগতের মাতাল মাতাল হাত, ইশিতার শরীরের ওপর ঢলে পড়েছে। হাতে গুঁজে নিচ্ছে কচকচে রুপিয়া। আজ হাতে পড়ছে অনেক রুপিয়া। রুপিয়া নিয়ে আবার সে ড্যান্স করতে থাকে। ড্যান্সের ঘোরে মনে পড়ে মায়ের কথা। ড্যান্স করতে করতে বেরিয়ে পড়ে সামনে রাস্তায়। সিএনজি ডাকে। সামনে বর্ডার! সীমানাহীন রাতের আকাশ। নিচে কাঁটাতারের বেড়ি। ইশিতা থেমে নেই। টপকে টপকে ঝোপঝাঁড় ক্রস করে। কাঁটাতার লেগে চিলে যায় তার হাত। সে হাঁটছে কিন্তু রক্ত ঝরছে। বর্ডার ক্রস করল। পাহাড়ি লতার পাশে একখণ্ড কাপড় ঝুলছে। চিনতে ভুল করল না; এটি তার শাড়ির আঁচল। আঁচল খুলে বেঁধে নিল কাটা হাত। রক্ত বন্ধ হলো এবং সে সামনে হাঁটতে লাগল…

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়