নিরাপদ মাতৃত্ব প্রত্যেক নারীর অধিকার

আগের সংবাদ

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর জীবন ও কাব্যশৈলী

পরের সংবাদ

জেগে থাকবে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর হাসিমুখ

প্রকাশিত: মে ২৮, ২০২১ , ১২:১২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৭, ২০২১ , ১১:৫৪ অপরাহ্ণ

তপন বাগচী

ষাটের দশকের শেষপাদে আবির্ভূত হয়ে ক্রমাগত সামনের সারিতে আসন নেয়া কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী (১৯৪৮-২০২১) সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় অবদান রেখেছেন। তবে তার মূল অবদান কবিতা, ছড়া ও প্রবন্ধ রচনায়। কবিতার বইয়ের আগে তার উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। ‘কৃষ্ণপক্ষে অগ্নিকাণ্ড’ (১৯৭৩) নামের উপন্যাসটি পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। তবে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ‘মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি’ (১৯৭৭) কাব্যপাঠের মাধ্যমে। ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে পড়তে এসে রেলস্টশনের পাশের সরকারি গণগ্রন্থাগারে বিকেলে যেতাম বই পড়তে। সেখানে পেয়ে গেলাম এই বই। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত-জসীমের পাঠকের কাছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতা ভালো লাগতে একটু সময় তো নেবেই। একই সময়ে আমি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের কবিতা পাঠের সুযোগ গ্রহণ করি। এমনকি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তাঁর’ কাব্য পড়ে আমি আধুনিক কবিতার স্বাদ গ্রহণে তুমুল আগ্রহী হই। পঞ্চাশ এবং ষাটের কবিদের কবিতা পড়ার শুরু আমার ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে।

আমিও কবিতা লিখতে চেষ্টা করি তখন। কিছুটা সুকান্ত আর কিছুটা জসীম মিলিয়ে আমার কাব্যপ্রচেষ্টা চলছে। এই সময়ে নিজের জেলা শহরে এসে কবিতার আধুনিকতার সঙ্গে পরিচিত হই।

ইতিহাস ঘেঁটে জেনে নিই রবীন্দ্রানুসরারী ও রবীন্দ্রবলয়ের বাইরের কবিতা-আন্দোলনের কথা। পড়ে ফেলি বুদ্ধদেব-জীবনানন্দ-অমিয়-বিষ্ণু-সুধীন-প্রেমেন্দ্র-অচিন্ত্যর কবিতা। কবিতা লিখে ফরিদপুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংস্থায় পড়তে যাই। কেউ ফিরেও তাকায় না। তবু যাই, শহরের অগ্রজদেও কবিতা শুনে সবাই হাততালি দেয়। কিন্তু আমরা যারা গ্রাম থেকে এসেছি, তাদের কবিতা পাঠের পরে সবাই চুপ মেরে যান। আমার বন্ধু দীপংকর হালদার তো উৎসাহ হারিয়ে লেখাই ছেড়ে দিল। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমার প্রেরণা ছিল এই হাবীবুল্লাহ সিরাজী কিংবা অসীম সাহার কবিতা। ফরিদপুরের এই দুই কবি তখন ষাটের কবি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে নন্দিত।

দুই.

হাবীবুল্লাহ সিরাজী প্রকৌশলী হয়েও কবি। তিনি যে প্রকৌশলী, এই চিন্তা আমাদের কারো মাথাতেও নেই। এই যে শিক্ষা এবং পেশাকে ছাড়িয়ে কেবলই কবি বা লেখক হয়ে ওঠা, তা কেবল প্রকৃত লেখকের পক্ষেই সম্ভবপর। যেমন আবৃত্তিকার কাজী আরিফ, অভিনেতা আবুল হায়াৎ, কবি রবিউল হুসাইন, কবি আনিসুল হক, প্রাবন্ধিক খসরু চৌধুরী, ভ্রমণসাহিত্যিক শাকুর মজিদ উতরে গেছেন প্রযুক্তিশিক্ষার গৌরবের পরিচয়কেও, তেমনি হাবীবুল্লাহ সিরাজীও হয়ে উঠেছেন কেবলই কবি।

প্রথম পাঁচটি কবিতাগ্রন্থ ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’ (১৯৭৫), ‘মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি’ (১৯৭৭), ‘মধ্যরাতে দুলে ওঠে গ্লাশ’ (১৯৮১), ‘হাওয়া কলে জোড়া গাড়ি’ (১৯৮২), ‘নোনা জলে বুনো সংসার’ (১৯৮৩) তার উত্থানপর্বের স্মারক হয়ে আছে।

এর পরে তিনি যেসব কবিতাগ্রন্থ রচনা করেছেন, তা একই পথেরই সম্প্রসারণ। তবু তার ‘পোশাক বদলের পালা’ (১৯৮৮) এবং ‘বিপ্লব বসত করে ঘরে’ (১৯৯৯) সরল ভাষায় তীব্র প্রতিবাদী কবিতা ধারণ করে বাংলাদেশের কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করে আছে। কিন্তু ‘তুচ্ছ’ (২০০৩) কবিতাগ্রন্থে এসে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ভাষার বদল দেখে আমরা আশান্বিত হই। ‘হ্রী’ (২০০৫), ‘কাদামাখা পা’ (২০০৬), ‘যমজ প্রণালী’ (২০১১), ‘আমার জ্যামিতি’ (২০১২) প্রভৃতি কবিতাগ্রন্থে আমরা একেবারেই ভিন্নরকম এক কবিকে পাই।

ষাটের কবিতার ভাষা থেকে প্রথমে বেরিয়ে আসতে দেখেছি কবি মোহাম্মদ রফিক ও মুহম্মদ নূরুল হুদাকে আর পরে দেখলাম কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে। অন্যরা ষাটের নিজস্ব ভাষাতেই বড় কবি। কিন্তু মোহাম্মদ রফিক রাজনীতি প্রচারের জন্য নতুন এক ভাষা তৈরি করে নিয়েছিলেন। মুহম্মদ নূরুল হুদা নিয়ত সক্রিয় বলেই তার ভাষায় গতিশীল হতে বাধ্য। আর হাবীবুল্লাহ সিরাজী ভাষা বদল করলেন তার কাব্যচিন্তার প্রসারণের জন্য।

তিন.

হাবীবুল্লাহ সিরাজী বাংলা একাডেমিতে এসে একরকম গতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। বাংলা একাডেমি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা ২০২১ গেজেটভুক্ত করেছেন। এর ফলে একাডেমিতে পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজতর হবে। এই কাজটি একাডেমির জন্য খুবই বড় কাজ। তিনি এসে ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশ নিশ্চিত করলেন। ‘ধানশালিকের দেশ’ পত্রিকাটিও নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা নিলেন। নতুন দুটি পত্রিকা ‘বাংলা একাডেমি ফোকলোর পত্রিকা’ ও ‘বাংলা একাডেমি অনুবাদ পত্রিকা’ চালু করার কৃতিত্ব তার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিক গ্রন্থমালা থেকে ৩৩টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বই প্রকাশ ও এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশেও তার অবদান রয়েছে। প্রায় পনেরো বছর বন্ধ থাকা গাজী শামছুর রহমান স্মৃতি গবেষণা বৃত্তি, ফেরদৌস খাতেমন গবেষণা বৃত্তি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক গবেষণা বৃত্তি চালু করেছেন তিনি। এই তিনটি গবেষণা তহবিলের সদস্য সচিব হিসেবে তাকে দেখেছি তরুণদের গবেষণাকর্মে নিয়োজিত করার প্রতি অত্যন্ত দরদি মন ছিল। তিনি আমাকে দিয়ে আরো তিনটি গবেষণা বৃত্তি চালুর জন্য নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্বও দিয়েছিলেন। অফিস খোলার পরে এই তিনটি বৃত্তির বিষয়ে কার্যনির্বাহী পরিষদের অনুমোদন নেয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি বরাবরই বাংলা একাডেমির নিজস্ব গবেষণার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তাই একাডেমির পিএইচডি উপাধির কর্মকর্তাদের ইনক্রিমেন্ট দিয়েছেন। রবীন্দ্র পুরস্কারের মতো নজরুল পুরস্কার প্রবর্তনের কথা ভেবেছিলেন। বাংলা একাডেমির ঐতিহ্যবাহী পুকুরটি সংস্কারের কাজেও হাত দিয়েছিলেন। অনুবাদের একটি কর্মশালার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অনেক কাজই রয়ে গেছে অসমাপ্ত। একজন কবির জন্য ৭২ বছর বয়সটাই তো অসমাপ্ত! তবু এইটুকু জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চা ও বাংলা একাডেমির জন্য যতটুকু কাজ করে গেছেন, পরবর্তী প্রজন্ম তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

আজকাল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক কিংবা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য তথা প্রতিষ্ঠান-প্রধানদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যে ভয়ংকর সংবাদ দেখি, তা থেকে একেবারেই মুক্ত ছিলেন কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। এর আগে যার বাংলা একাডেমি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মধ্যে মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ আর কাজী মুহম্মদ মনজুরে মওলা বাদে সকলেই এসেছেন অধ্যাপনা পেশা থেকে। শামসুজ্জামান খান দুটি প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হওয়ার পরে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হলেও, শুরুতে তিনি অধ্যাপনা পেশাতেই ছিলেন। সেক্ষেত্রে হাবীবুল্লাহ সিরাজীই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এসেছেন ‘কবি’ পরিচয় নিয়েই। অনেকের আশঙ্কা ছিল, কবি হিসেবে এই গুরুদায়িত্ব তিনি কতটা সফলভাবে করতে পারবেন! কিন্তু সব আশঙ্কার গুড়ে বালি দিয়ে তিনি সফলভাবেই এই দায়িত্ব পালন করলেন। তার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো আপত্তি ওঠেনি। তিনি হাসতে হাসতে এসেছিলেন, হাসতে হাসতেই তিনি অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছেন। আমার সামনে জেগে আছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সেই হাসিমুখ!

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়