ভারতে কালো, সাদার পর এবার হলুদ ফাঙ্গাসের উপস্থিতি

আগের সংবাদ

বন্ধ হচ্ছে কালো টাকা সাদা করার অবাধ সুযোগ

পরের সংবাদ

জন্মই আজন্ম পাপ

প্রকাশিত: মে ২৭, ২০২১ , ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৭, ২০২১ , ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ

পরাধীন ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তানের কালো অধ্যায় পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই মহান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা ঘটনা, যার কারিগর হিসেবে কেউ আখ্যায়িত হয়েছেন নায়কের অভিধায়; কেউবা আভির্ভূত হয়েছেন খলনায়কের চরিত্রে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সেসব ঘটনা ও তার নায়ক-খলনায়কদের কার কি ভূমিকা, তাই নিয়েই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গ্রন্থ ‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’। সম্প্রতি ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। এ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে ভোরের কাগজের পাঠকদের জন্য।

পাকিস্তানের জন্মের পর পরই আমেরিকার দিকে দ্রুত আর্থিক-সামরিক সহায়তার হাত বাড়ালেন জিন্নাহ। তার এই অতি ব্যগ্রতার নেপথ্যে যাই থাক, ঝানু আমলা গোলাম মোহাম্মদ তার গুটি চালতে ভুল করেনি।

দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনী দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে বার্মা-থাইল্যান্ড-চীন বর্ডারে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য প্রধানত বাংলা-আসাম থেকে রসদ সাপ্লাই ও ডিপো গড়ে তোলে। সে সময় সাড়ে তিন লাখ মার্কিন সেনা ভারতবর্ষে নিয়োজিত ছিল।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই পর্যায়ে স্বভাবতই আন্দোলনকারীরা ভেবেছিল ব্রিটিশ শাসন শক্তিশালী করার জন্যই মার্কিন সৈন্য মোতায়েন হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখনো ভারতবর্ষের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয়ভাবে মাথা ঘামায়নি। জড়িয়ে পড়েনি।
১৯৪৬ সনের এপ্রিল পর্যন্ত ভারতবর্ষের রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামালেও মার্কিন ম্যাগাজিনে টাইম এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যেখানে বলা হয় : ‘The Moslem tiger wants to eat the cow. ’

১৯৪৬ সনের ১৪ নভেম্বর। ওয়াশিংটনে জিন্নাহর প্রতিনিধি হিসেবে এম এ এইচ ইস্পাহানী এবং বেগম শাহনেওয়াজ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতে সমর্থ না হলেও মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি এসেসনের সঙ্গে পাকিস্তান ও এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য পেশ করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তার বিদেশনীতি কী হতে পারে। জিন্নাহ মার্কিন প্রতিনিধিকে বলেন : ‘Pakistan would be oriented toward the muslim countries of the middle east. Muslim countries would stand together against possible Russian aggression and look to the US for assistance.’
৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সনের ক্যাবিনেট মিটিং-এ জিন্নাহ বললেন, ‘In the cold war Pakistan leaned towards the west.’
তিনি স্পষ্ট করে বললেন, ‘pakistan (is) a democracy and communism (does) not florish in the soil of Islam.’
ওই সময় পাকিস্তান সম্পর্কে মার্কিন নীতি ছিল- যেমনটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বলেন, ‘friends not allied.’
সেক্রেটারি অব স্টেট মার্শাল জাতিসংঘের অধিবেশনকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সঙ্গে বৈঠক করে অনুধাবন করেন যে, পাকিস্তান যেহেতু কমুনিজমবিরোধী সেজন্য আর্থিক, সামরিক, বৈষয়িক সাহায্য ও সহযোগিতা পেতে পারে।
জর্জ সি মার্শাল, প্রেসিডেন্ট হ্যারী এস, ট্রুম্যানের উদ্দেশ্যে লিখিত এক মেমোরেন্ডামে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় লিখে পাঠালেন, ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রটি জন্মলাভ করতে যাচ্ছে তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। তার ভাষায় এটা এমন একটি রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যা হবে মুসলিম বিশে^ বৃহত্তম এবং ‘মোস্ট স্ট্র্যাটেজিক’ এরিয়া নিয়ে গঠিত। স্বভাবতই ওয়ার টাইম চিফ অব স্টাফ মার্শাল-এর বক্তব্য অনুধাবন করতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আদৌও বিলম্ব হয়নি। মার্কিন সরকারের এ ধরনের উষ্ণ বন্ধুত্বের প্রত্যাশা জিন্নাহর জন্য ছিল অত্যন্ত কাক্সিক্ষত, প্রীতিকর এবং ফলদায়ক। মুহম্মদ আলী জিন্নাহর স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ ইতোমধ্যে তাকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ইন্ডিয়ার গভর্নর জেনারেল পদে বহাল থাকার ফলে তার জন্য ব্রিটেনের ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ সহজসাধ্য হবে না। শুধু তাই নয়, নির্বাচনে বিজয়ী লেবার পার্টির নীতিনির্ধারকরা পাকিস্তানের ল্যান্ডলর্ড, আমলা, নবাব ও জমিদারদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকে সুনজরে দেখেনি।
সেজন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর পরই অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের জন্য জিন্নাহ আমেরিকার দিকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বেপরোয়াভাবে হাত বাড়ালেন। জিন্নাহর এই অতি ব্যগ্রতার পেছনে বাস্তব কার্যকারণগত তাৎপর্য যাই থাকুক না কেন, জিন্নাহর ভগ্ন স্বাস্থ্য ও ভারাক্রান্ত মানসিক দুশ্চিন্তার ক্রান্তি ক্ষণে ঝানু আইসিএস দক্ষ ও পারদর্শী আমলা গোলাম মোহাম্মদ অত্যন্ত সুচতুরভাবেই তার পরিকল্পিত গুটি চালতে ভুল করেনি।
কাশ্মির ও পাখতুনিস্তান সমস্যা এবং সর্বোপরি নিষ্ঠুর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ছিন্নমূল দুর্গত মানুষের ভিড়ে নবরাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রশাসন ও অর্থনীতিকে নিজ পায়ে দাঁড় করানো এবং রাষ্ট্রপুঞ্জে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের কষ্টকর ও পীড়াদায়ক পরিস্থিতি স্বীয় উদ্যোগে মোকাবিলা করতে চাননি। স্যুটেড-বুটেড সুসজ্জিত নিভাঁজ পোশাকে অভ্যস্ত গভর্নর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ মার্কিনিদের হাতে নিজেকে সঁপে দেবার তৃপ্তিকর মেজাজে দ্বিধাহীন পদক্ষেপ গ্রহণকেই যথার্থ মনে করলেন। সেজন্য আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম লাভের মাত্র ৭২ ঘণ্টা কম সময়ের মধ্যে গভর্নর জেনারেল নাটকীয়ভাবে গণপরিষদে তার নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে মার্কিন শুভেচ্ছা বাণী পেশ করতে গর্ববোধ করেন।
পাকিস্তান জন্মের মাত্র সতের দিনের মাথায় পহেলা সেপ্টেম্বর মন্ত্রী পরিষদের আলোচনা, অনুমোদন ও সিদ্ধান্ত বহির্ভূতভাবে ‘পুঁজি ও প্রযুক্তি’ এবং পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ব্যয়ভার বহনের জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদের একান্ত উদ্যোগ ও সক্রিয়তাকে অনুমোদন দিয়ে গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ প্রকৃত প্রস্তাবে রাজনীতিবিদ, মন্ত্রিপরিষদ ও শাসনতান্ত্রিক আওতার বাইরে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ অবারিত করেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রীতি পদ্ধতির বাইরে এবং মন্ত্রিপরিষদকে এড়িয়ে গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে সরাসরি আমলাচক্রের শীর্ষস্থানীয়দের গোপন সম্পর্কে আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
হিসেবি আমলা গোলাম মোহাম্মদ প্রণীত আমেরিকার ওপর নির্বিচার নির্ভরতার ‘কনসেপ্টটি’ গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ অত্যন্ত ব্যগ্রতার সঙ্গে লুফে নেন। কাক্সিক্ষত সাহায্য ও নির্ভরতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে বিশেষ দূত হিসেবে মীর লায়েক আলীকে ওয়াশিংটনে পাঠাতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করেননি। মীর লায়েক আলী অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক প্রণীত ও গভর্নর জেনারেল কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক অনুমোদিত ডকুমেন্ট পেশ করতে সমর্থ হন।
ইতোমধ্যেই করাচি রাজধানী হতে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মি. লুইস পাকিস্তানের ব্যাপক সাহায্য প্রার্থনার বিষয়টি সেক্রেটারি অব স্টেট মার্শালকে জ্ঞাত করিয়ে রেখেছিলেন। মীর লায়েক আলীর তৎপরতা অব্যাহত থাকা অবস্থাতেই ১৯৪৭ সালের ৮ অক্টোবর পাকিস্তানের এমবাস্যাডার রূপে মি. ইস্পাহানীর পরিচয়পত্র গ্রহণ কালে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবেই বলেন যে পাকিস্তানকে সর্বোতভাবে সাহায্য দেয়া হবে এবং এতে দুটি দেশই উপকৃত হবে।
নতুন রাষ্ট্রটির জন্ম লাভের পরপরই এমনিভাবে জাতীয় ক্ষেত্রে তাকে লালন পালনের দায়িত্ব আমলাচক্রের ওপর অর্পিত হলো, যাদের রাষ্ট্রটির জন্ম-সংগ্রামে কোনো অবদান ছিল না বললেই চলে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ তোষণ, নতজানু ও পরনির্ভরতার দাসখত তার ললাট লিখন হয়ে দাঁড়াল।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির সমন্বয় সাধক, নীতিনির্ধারক ও বাস্তবায়ক রূপে আমলাতন্ত্র অত্যন্ত নগ্নভাবেই পাকিস্তান রাষ্ট্রটির পরিচালনায় মুখ্য নিয়ামক শক্তি হয়ে ওঠে।
একনায়ক, উন্নাসিক এবং গণবিচ্ছিন্ন অহংবোধে উঁচু নাকের গভর্নর জেনারেলের অসীম ক্ষমতা আমলাতন্ত্রের চকচকে ফাইল-ফোলিওর মধ্য থেকে বিকীরণ হতে থাকে। এর পাশাপাশি এ কথাও অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কণ্টকপীড়িত জীবদ্দশাতেই আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিয়ামক শক্তির ভূমিকা পালনে আবির্ভূত হয়েছে।

আগামীকাল প্রকাশিত
হবে ‘অসীম ক্ষমতা’
‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’- বইটি পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনে (ভোরের কাগজ কার্যালয়, ৭০ শহীদ সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা)। এছাড়া সংগ্রহ করা যাবে bhorerkagojprokashan.com থেকেও।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়