জেফ বেজোসকে টপকে বিশ্বের শীর্ষ ধনী বার্নার্ড আর্নল্ট

আগের সংবাদ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয় গান সৃষ্টির প্রচেষ্টা

পরের সংবাদ

জিন্নাহর মনোভাব

প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২১ , ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ২৬, ২০২১ , ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ

পরাধীন ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তানের কালো অধ্যায় পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই মহান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা ঘটনা, যার কারিগর হিসেবে কেউ আখ্যায়িত হয়েছেন নায়কের অভিধায়; কেউবা আভির্ভূত হয়েছেন খলনায়কের চরিত্রে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সেসব ঘটনা ও তার নায়ক-খলনায়কদের কার কি ভূমিকা, তাই নিয়েই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গ্রন্থ ‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’। সম্প্রতি ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। এ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে ভোরের কাগজের পাঠকদের জন্য।

 

সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে জিন্নাহর সন্দেহ ও সংশয়। সেজন্য জিন্নাহ তাকে সরানোর জন্য কূটবুদ্ধি আঁটেন। ক্ষমতালোভী জিন্নাহ রাজনীতিকে দেখতেন দাবা খেলা হিসেবে।

 

১৯৪৭ সনের ২৬ এপ্রিল জিন্নাহ ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভাইসরয় সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাব সম্বন্ধে তাকে অবহিত করেন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের বাইরে রেখে এর অখণ্ডতা বজায় রাখা সম্পর্কে তার অভিমত সরাসরি জানতে চান। ‘কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই’ জিন্নাহ জবাব দেন :
‘আমার আনন্দিত হওয়ার কথা। কলকাতা ছাড়া বাংলার মূল্য কোথায়? তারা বরং অবিভক্ত ও স্বাধীন থাক। আমি নিশ্চিত যে তারা আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে।’
ব্রিটিশ রাজের তখন মাথাব্যথা ছিল নতুন রাষ্ট্রগুলো কমনওয়েলথভুক্ত হবে কিনা? না হলে রাষ্ট্রগুলো একেবারেই স্বাধীন ও ব্রিটেনের রশির বাইরে চলে যাবে।
কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত থাকা সম্পর্কে সোহরাওয়ার্দী যে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তার প্রতি জিন্নাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ভাইসরয়কে বলেন, ‘অবশ্যই, যেমনি আমিও আপনাকে ইঙ্গিত

দিয়েছি যে পাকিস্তান কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত থাকতে চাইবে।’ জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খান পরে বিভিন্ন সময়ে বাংলার অখণ্ডতা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে একই অভিমত ভাইসরয় এবং তার স্টাফদের কাছে ব্যক্ত করেন।
ইন্ডিয়া কমিটির কাছে পেশকৃত মাউন্টব্যাটেনের রিপোর্টেও এ মতের সমর্থন মেলে। এতে বলা হয় : মি. জিন্নাহ মনে করেন যে, মুসলমান প্রধান স্বাধীন বাংলা এক ধরনের আনুষঙ্গিক পাকিস্তানে পরিণত হবে।
নেহেরু মনে করতেন যুক্তবাংলা হলে কালক্রমে তা ভারতের জোটের ভেতরে চলে আসবে। প্যাটেল অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বাংলা ভাগে অনড় এবং তা এক্ষুণি হতে হবে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস বাংলা ভাগের পক্ষে চলে যায়।
ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোনো ফর্মুলা মানতে পারবে না। কংগ্রেস কেন্দ্রীয় নেতারা এই ফর্মুলা মানেননি। ফলে সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বসু ও আব্দুল হাশিমের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে দিল্লিতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। কারণ বাংলাদেশ ভাগ হলেও সিন্ধু, পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তানের সম্মিলিত লোকসংখ্যা পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার থেকে কম। সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা ও কর্মক্ষমতা অনেককেই বিচলিত করে তুলেছিল। কারণ ভবিষ্যতে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন এবং বাধা দেয়ার ক্ষমতা কারো থাকবে না।
একদিকে গোপনে সোহরাওয়ার্দীকে নেতৃত্ব থেকে হটিয়ে নাজিমুদ্দীনকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর আসনে আসীন করার ষড়যন্ত্র শুরু হয় কলকাতা ও দিল্লিতে।
পাঞ্জাব ভাগ হয়। কিন্তু নির্বাচনের প্রশ্ন ওঠেনি। সোহরাওয়ার্দী পশ্চিমবঙ্গের লোক; পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হতে হলে আবার তাকে নির্বাচন করতে বলা হলো। যুক্তবাংলায় মুসলিম লীগ এমএলএরা সর্বসম্মতিক্রমে সোহরাওয়ার্দীকে নেতা বানিয়েছিলেন এবং তিনি মুখ্যমন্ত্রী আছেন- এই অবস্থায় দিল্লি থেকে হুকুম এলো আবার নতুন করে পার্লামেন্টারি নেতা নির্বাচন হবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী যিনি বাংলায় মুসলিম লীগ গঠন করেছেন- নিরবচ্ছিন্নভাবে দিন-রাত অর্থ, শ্রম ব্যয় করে দলকে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী করেছেন, তাকে নিয়ে জিন্নাহর সন্দেহ ও সংশয়। ধীশক্তি, বংশ, গৌরব, পাণ্ডিত্য, যুক্তিতর্কে তিনি জিন্নাহর সমকক্ষ। তিনি কেন্দ্রের রাজনীতিতে একজন সক্রিয়, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। সেজন্য জিন্নাহ কোনো দিন তাকে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ কমিটিতে ঠাঁই দেননি।
ফজলুল হক সর্বভারতীয় নেতা হতে চাননি। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর বিষয়টি ছিল ব্যতিক্রম। তাকে সরানোর জন্য কূটবুদ্ধি এঁটে চললেন জিন্নাহ। জিন্নাহর কাছে রাজনীতির আদর্শ বড় নয়, ক্ষমতা বড়। রাজনীতিকে দেখতেন দাবাখেলা হিসেবে।
পার্লামেন্টারি নেতা নির্বাচনে যে অংশ বাংলার ভাগে এসেছিল, সে অংশের ভোটে তখনো সোহরাওয়ার্দী মেজরিটি।
কিন্তু সিলেট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্বাচনের আগেই মন্ত্রিত্ব পদ দাবি করেন এবং কতিপয় প্রতিনিধির উৎকোচ গ্রহণ সোহরাওয়ার্দীকে পদ-পদবির প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।
যুবনেতা শেখ মুজিব তখন সোহরাওয়ার্দীর শক্ত হাত। শেখ মুজিব দলবল নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পার্লামেন্ট নেতা নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে অনুরোধ জানান। এমনিতে সোহরাওয়ার্দীর মেজরিটি ছিল। তারপরও বিজয়কে অবশ্যম্ভাবী করে তুলতে কয়েকটি ভোটের জন্য টাকার প্রয়োজন। সোহরাওয়ার্দী বললেন, “টাকা আমি কাউকেও দেব না, এই অসাধু পন্থা অবলম্বন করে আমি নেতা হতে চাই না। নীতি ও সততার সঙ্গে আপস করা যায় না।”
মুসলিম লীগ প্রধান কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলীর নির্দেশ ও হস্তক্ষেপে ইস্পাহানী গ্রুপের অর্থ আনুকূল্যে খাজা নাজিমুদ্দীন নেতা নির্বাচিত হন। নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর মনোভাব বুঝে বললেন, রাজধানী হবে ঢাকা। তিনি কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছেন।
ব্রিটিশ সরকার তখনো ভাবছে কলকাতা পাকিস্তানের হবে, না ভারতের সঙ্গেই থাকবে। কলকাতা নিয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটন সমস্যায় ছিলেন। র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ তখনো শেষ হয়নি। এই রোয়েদাদে বাংলার কোনো প্রতিনিধি ছিল না। নেহেরু জেদ ধরলেন কলকাতা ভারতের অংশ হতে হবে। নেহেরু দেখতে পেলেন কলকাতা পূর্ববঙ্গের রাজধানী না হলে স্বাভাবিকভাবেই পূর্ববঙ্গ ভারতের ওপর নির্ভরশীল হবে এবং পরিণতিতে ভারতের অংশ হবে। সেজন্য সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাব ছিল কলকাতা পূর্ববঙ্গের রাজধানী হবে অথবা ‘বাফার স্টেট’ জোন হবে।
নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার পর লর্ড মাউন্টব্যাটন ঘোষণা করলেন, কলকাতা ভারতেই থাকবে। নাজিমুদ্দিনকে দিয়ে এই কূটচাল দেবার ফলে জিন্নাহ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কলকাতা থাকলে তা হতো পাকিস্তানের রাজধানী। এটা জিন্নাহর পক্ষে মেনে নেয়া ছিল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি আর কয়দিন পরেই নতুন পাকিস্তানের কায়েদ-ই আজম হবেন। তার তড়িঘড়ির শেষ ছিল না- যদিও দেশ ভাগের প্রায় আরো একটি বছর বাকি ছিল। তার পক্ষে জীবনপথের দীর্ঘ যাত্রার শেষ প্রান্তে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূতের বিপরীতে এ পৃথক যাত্রা তাকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও পাকিস্তানের প্রধান স্থপতি হতেই তৃপ্ত বোধ করলেন।
তিনি তার রাজনীতির কর্মধারার শেষ কোঠায়। জীবনের শেষ প্রান্তে। একেবারে চূড়ান্ত অন্তিম মুহূর্তটা ইতিহাস কীভাবে লিখেছে।
ভারতের নতুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ক্রিপসকে একটি চিঠিতে লিখলেন, ‘আমার কাছে গোপন খবর হলো যে, মি. জিন্নাহ যে পথ নিচ্ছেন, তাতে তার ঘনিষ্ঠ অনুচররা আর পরামর্শদাতারা ভীত হয়ে উঠেছেন। এটা প্রায় অবিশ^াস্য যে, একজন মানুষের ‘অহৎ’ এত দুরারোগ্য হতে পারে, যাতে যে এক্ষুণি ‘হিজ এক্সেলেন্সি’ হয়ে ওঠার জন্য তার নিজের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব সুবিধাগুলোকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে, আট মাস পরে যখন এমনিতেই সে এই শিরোপাটি পেত।’ তখন পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পদ-পরিসম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা শেষ হয়নি।
লর্ড ইসমে আর জিন্নাহর মধ্যে ২৪ জুলাই ১৯৪৭ যে আলোচনা হয় এবং যা মাউন্টব্যাটেনকে তার চিফ অব স্টাফ জানিয়ে দেন।
ভারতবর্ষ একজন ইউরোপীয় গভর্নর জেনারেল পাবে আর পাকিস্তান পাবে তাদের নিজের একজন নাগরিক। জিন্নাহ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, লিয়াকত আলী খানের মাধ্যমে গভর্নর জেনারেলকে বিষয়টি জানান।
মুহম্মদ আলী জিন্নাহ দিল্লি ছেড়ে করাচি আর নির্মীয়মাণ পাকিস্তানের দিকে চলে গেলেন ৭ আগস্ট ১৯৪৭।
আগামীকাল প্রকাশিত হবে
‘জন্মই আজন্ম পাপ’

‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’- বইটি পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনে (ভোরের কাগজ কার্যালয়, ৭০ শহীদ সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা)। এছাড়া সংগ্রহ করা যাবে bhorerkagojprokashan.com থেকেও।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়