সংবাদপত্র পর্যালোচনা

আগের সংবাদ

নগরবাসীর আস্থা ফিরে আসছে

পরের সংবাদ

যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম

কুয়াশার মধ্যে জন্ম

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২১ , ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১৯, ২০২১ , ৪:১৮ অপরাহ্ণ

পরাধীন ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তানের কালো অধ্যায় পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। এই মহান অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো নানা ঘটনা, যার কারিগর হিসেবে কেউ আখ্যায়িত হয়েছেন নায়কের অভিধায়; কেউবা আবির্ভূত হয়েছেন খলনায়কের চরিত্রে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সেসব ঘটনা ও তার নায়ক-খলনায়কদের কার কী ভূমিকা, তাই নিয়েই অধ্যাপক আবু সাইয়িদের গ্রন্থ ‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’। সম্প্রতি ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে বের হয়েছে বইটি। এ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ তুলে ধরা হচ্ছে ভোরের কাগজের পাঠকদের জন্য-

অবিভক্ত ভারতে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মীয় উন্মাদনায় সৃষ্টি হওয়া অপরিকল্পিত পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন বিচিত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। উগ্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তার মাছ ব্যবসায়ী বাবা হিন্দু লোহানা সম্প্রদায় থেকে বয়কট হয়েছিলেন। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা জিন্নাহ ১৯১৩ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা পর্যন্ত ছিলেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতা। যিনি বয়সের ব্যবধান ভুলে রূপের মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন তারই বন্ধু অবিভক্ত ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী স্যার দিলশাহ পেট্টির ষোড়শী কন্যা রাউতি পেট্টির। বিপত্নীক জিন্নাহর প্রবল সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কাছে অসম প্রেমে ধরাশায়ী হলেন রাউতিও। প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার শেষ পর্যায়ে এসে রাউতির কাছে ফিল্মি কায়দায় বলে বসলেন, তোমাকে বিয়ে করতে চাই…।

দার্জিলিং। সাজানো গোছানো একটি বাংলো। সযত্নে লালিত বাগান। চোখ তুলে তাকালেই হিমালয়। বরফে ঢাকা। সকালের সূর্যরশ্মি বরফের ওপর ঠিকরে পড়লে বিচ্ছুরিত আলোর ঝরনারাশি বাংলোটিকে জড়িয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনে বোম্বাই থেকে এবার এসেছেন অবিভক্ত ভারতের শীর্ষ ধনীদের একজন স্যার দিলশাহ পেট্টি। বন্ধু মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি এলেন। ওই বাংলোতে তিনি একসঙ্গে থাকেন। জিন্নাহ তখন ছিলেন নামিদামি ব্যক্তিত্ব। বুদ্ধিদীপ্ত শানিত চেহারা। বোম্বাই হাইকোর্টের অলিন্দে তার সঙ্গে দিলশাহ ভাইয়ের পরিচয়, তখন থেকেই বন্ধুত্ব। বাংলোতে দিলশাহর ষোড়শী কন্যা। তন্বী। অসাধারণ সুন্দরী। বোম্বাইতে চাউর ছিল কথাটির। নাম রাউতি পেট্টি। দার্জিলিংয়ের প্রকৃতি যেন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে

তার দিকে। আলো যেন ঝলমল করে ওঠে। জিন্নাহর সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কাছে প্রেমের আবেগঘন প্রতিমা রাউতি নিজেকে সঁপে দেন। তারপর থেকেই প্রেমের অদ্ভুত আকর্ষণ। তিন যুগ বেশি বয়সের মানুষ জিন্নাহ। আগে বিয়ে করেছেন। স্ত্রী প্রয়াত। অবকাশ যাপনের সময়ে জিন্নাহ ভালোবাসার শেষ প্রান্তে এসে বললেন, তোমাকে বিয়ে করতে চাই। রাউতির মুখ উজ্জ্বল। মৃদু হাসিতে উচ্চারিত ছিল- আমিও।

রাউতির কথা ছিল বাবা দিলশাহর কাছে কথাটি বলতে হবে। এবং সেটি জিন্নাহকেই করতে হবে। ততদিনে জিন্নাহ মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট। কংগ্রেসের সদস্য পদ বহাল রেখেই তিনি যোগদান করেছিলেন মুসলিম লীগে। মুসলিম লীগ গঠনের ৯ বছর পর। মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর।
বিখ্যাত আইনজীবী। তার কথায় যেমন ক্ষুরধার যুক্তি, তেমনি মোহনীয় নিখাদ বাচনভঙ্গি, যা সহজেই অন্যকে আকর্ষণ করে। উদীয়মান রাজনীতিক। ধর্মাচরণের ধার ধারতেন না। খোজা সম্প্রদায়ের রীতি ঐতিহ্য ছিল এমনটি। আগাগোড়া কেতাদুরস্ত সাহেব। হাতে থাকত সর্বদা সিগারেট কেস। টানা ধূমপান করতেন। খাদ্য গ্রহণে তার বাছবিচার ছিল না। শূকরের মাংসে তার আসক্তি ছিল। নেশা ছিল পাশ্চাত্য নাটক দেখার। স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন তার চোখে। ভারতীয় জাতীয়তায় বিশ্বাসী এক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। দার্জিলিংয়ে দুমাস কাটল তাদের রোমাঞ্চকর প্রণয়।

দার্জিলিংয়ের রাত। চারদিকে হিমশীতল। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো বরফকণা উড়ছে, উষ্ণ ঘরের মনোরম পরিবেশে জিন্নাহ নৈশভোজে বসলেন, সঙ্গে পিতা স্যার দিলশাহ ও প্রেমিকা রাউতি। কথায় কথায় জিন্নাহ ভারতের রাজনীতির কথা তুললেন। বললেন, এই যে সাম্প্রদায়িক বিভক্তি এটা ভারতের স্বাধীনতার পথে বিরাট বাধা। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য থাকলে স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হবে। দুই ধর্মের মধ্যে বিয়ে চালু হলে কেমন হয়, মতামত জানতে চাইলেন স্যার দিলশাহর কাছে। দিলশাহ বললেন, এতে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হবে। চকিতে জিন্নাহ খাবার থেকে মুখ তোলেন। বললেন, তিনি তার মেয়েকে বিয়ে করতে চান।

দিলশাহ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে জিন্নাহকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। সেটি ছিল ১৯১৫ সাল। ভালোবাসা ও প্রেম মানুষের জীবনের বাঁক পরিবর্তনে কতটা প্রভাব বিস্তার করে জীবন বা রাজনীতিতে? তারপর থেকেই লক্ষ্য করি হিন্দু-মুসলিম মিলনের প্রচেষ্টায় জিন্নাহর প্রাণান্তকর উদ্যোগ। ভালোবাসার মোহন অনুভ‚তি জিন্নাহর হৃদয়ে এমনভাবে জেঁকে বসল, যার ফলশ্রুতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত হিসেবে। ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব বেশ কিছুদিন লক্ষ্য করা যাবে। প্রায় অর্ধযুগ তো বটেই।

লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ কংগ্রেস নেতাদের প্রচেষ্টায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর উদ্যোগে ১৯১৫ সালে বোম্বেতে এবং ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের যুগপৎ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস ও লীগের নেতাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ফলে সিদ্ধান্ত হয় যে ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধানের ব্যাপারে এই দুই রাজনৈতিক দল ব্রিটিশ সরকারের কাছে যুক্ত পরিকল্পনা পেশ করবে। সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের জন্য তারা নিজ নিজ দলীয় কমিটি গঠন করে। এই দুই কমিটি ১৯১৬ সালের নভেম্বরে যৌথ সভায় মিলিত হয়। উভয় দল ১৯১৬ সালের ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর লক্ষ্ণৌতে লক্ষৌ অধিবেশন আহ্বান করে। লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ তার ঐক্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তা সমর্থন করেন।

আগামীকাল প্রকাশিত হবে ‘কুয়াশার মধ্যে জন্ম’র দ্বিতীয় পর্ব।

‘যেভাবে স্বাধীনতা পেলাম’ বইটি পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনে (ভোরের কাগজ কার্যালয়, ৭০ শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা)। এছাড়া সংগ্রহ করা যাবে bhorerkagojprokashan.com থেকেও।

এসএইচ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়