এই বর্বরতার শেষ কোথায়?

আগের সংবাদ

করোনার রাজ্যপাট শেষ হবে কবে

পরের সংবাদ

চীনা প্রকল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, রক্তপাত

ইমতিয়াজ হোসাইন

লেখক, ঢাকা

প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২১ , ১২:০১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১৮, ২০২১ , ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের মাটিতে চীনা সংস্থায় কাজ করতে গিয়ে বারবার প্রাণ হারাতে হচ্ছে শ্রমিকদের। বাঁশখালীর ঘটনাও সেটাই প্রমাণ করেছে। তাই দেশের লেখক-অধ্যাপক, অধিকারকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা চীনা রাষ্ট্রদূতের কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশের মাটিতে তাদের কলঙ্কময় অধ্যায় আগে শেষ করে তারপর কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ পালনের পরামর্শ দিয়েছেন। সেইসঙ্গে তাদের দাবিÑ স্বচ্ছ বিনিয়োগ, ন্যায্য শ্রম ও পরিবেশের প্রতি সচেতন হোক চীনা সংস্থাগুলো।
গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলায় গণ্ডামারার ঘটনা ফের চীনা বিনিয়োগ নিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। ২০ হাজার কোটি টাকার নির্মীয়মাণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফের প্রাণ হারালেন অন্তত ৭ শ্রমিক। গুলিবিদ্ধ ১২ জন এখনো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চার বছর আগে আরো ৪ জন হত্যার শিকার হন এই প্রকল্পেই। জখম হয়েছিলেন বহু শ্রমিক। প্রকল্প চালু হওয়ার আগেই সহিংসতায় নিহত কম করে ১১ জন। বাঁশখালী সদর থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট নামে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের শিল্প গ্রুপ এস আলমের সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠান সেপকো থ্রি পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন এবং এইচটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে করছে। এই প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থায়নই চীনা সংস্থার। লাভেরও অংশীদার বেশি তারাই। প্রথম থেকেই বাঁশখালী প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রচুর। শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা পান না। এবারেও তারা রমজানে কর্মঘণ্টা কমানোসহ নিজেদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করছিলেন।
এর আগে ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিলও রক্তাক্ত হয় বাঁশখালীর এই চীনা প্রকল্প চত্বর। শ্রমিকদের দাবি ছিল, দিতে হবে ন্যায্য শ্রমের দাম আর বকেয়া মজুরি শোধ করতে হবে। অভিযোগ, সেই সময়েও শ্রমিকদের দাবি মেটানোর বদলে পুলিশ লেলিয়ে দেয় চীনা সংস্থাটি। পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়েছিলেন ৫ বছর আগেও। পরে নিহতের পরিবার-পরিজনদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয় প্রকল্পের কর্তারা। স্থানীয়দেরও বেশকিছু দাবি-দাওয়া মেনে কাজ শুরু হয়। তবে চাপা শ্রমিক অসন্তোষ ছিলই। এবার রমজান মাসে শ্রমিকরা দাবি তুলেছিলেন, একবেলা ছুটির। সেইসঙ্গে বকেয়া বেতন মিটিয়ে দিতে বলেছিলেন ঈদের আগেই। মোট ১০ দফা দাবি নিয়ে তারা বিক্ষোভে শামিল হন। সেই বিক্ষোভ হিংসাত্মক হয়ে ওঠে চীনা প্ররোচনায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ৭ শ্রমিক। প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে বাঁশখালীর চীনা প্রকল্পেই কেন বারবার হিংসার ঘটনা ঘটছে।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চও একই প্রশ্ন তোলেন। রিট মামলায় এস আলম গ্রুপের কৌঁসুলির উদ্দেশে আদালত প্রশ্ন করেছেন, ‘চট্টগ্রামের বাঁশখালী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ২-৪ বছর পরপর কেন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে? শ্রমিক মারা যায়। কেন বারবার এ ধরনের ঘটনার উদ্ভব হয়’। সেইসঙ্গে নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে দিতে এস আলম গ্রুপকে নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
শ্রমিকের রক্তে ভেজা বাঁশখালী চীনা প্রকল্পের চারপাশ এখনো থমথমে। শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, মালিকপক্ষ তাদের ন্যায্য আন্দোলন দমনে পুলিশকে ব্যবহার করেছে। মজুরি বকেয়া পড়ে রয়েছে কয়েক মাসের। সেই টাকার বদলে মিলেছে বুলেট। এটাই নাকি চীনা সংস্থার কালচার! বলছেন বাঁশখালীর বাসিন্দারাও। শুধু বাঁশখালী নয়, বাংলাদেশে চীনা সংস্থার প্রকল্প মানেই হয়ে উঠেছে শ্রমিক অসন্তোষের আঁতুড়ঘর। স্থানীয় শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনাটুকু দেয় না। বরং চীন থেকে আসা কর্মীরা পুলিশি নিরাপত্তাকে কাজে লাগিয়ে রীতিমতো অত্যাচার চালায় স্থানীয়দের ওপর। পাটুয়াখালী জেলার নির্মীয়মাণ পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও একই ধরনের অশান্তির শিকার। ২০১৯-এর জুনে ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্পেও স্থানীয়দের ওপর দমন নীতির প্রতিবাদে সোচ্চার হন শ্রমিকরা। প্ল্যান্টের ভেতরে এক বাংলাদেশি শ্রমিক মারা গেলেও চীনারা সেটা চেপে যেতে চায়। তা নিয়ে অশান্তি বাধে উভয় পক্ষের মধ্যে। রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় পায়রা। অনেক কষ্টে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন জখম হন। দুজন প্রাণে মারা গিয়েছিলেন।
প্রকল্পে খ্ষোভের কারণ দেখিয়ে লেখক-অধ্যাপক, অধিকারকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতকে চিঠি লিখে জানিয়েছে। বিশিষ্টজনদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পারভীন হাসান, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আকমল হোসেন, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন প্রমুখ।

ইমতিয়াজ হোসাইন : লেখক, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়