করোনা থেকে বাঁচতে গোবর মেখে গোসল!

আগের সংবাদ

ঈদুল ফিতর : খুশি ও প্রত্যাবর্তনের বার্তা

পরের সংবাদ

বাজেট ২০২১

কালো টাকা সাদা নয়

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

প্রকাশিত: মে ১২, ২০২১ , ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১১, ২০২১ , ১১:১০ অপরাহ্ণ

বাজেট সমাগত। করোনাকালে এটি আমাদের দ্বিতীয় বাজেট, যা আভাস পাওয়া যাচ্ছে তাতে এবার ৬ লাখ হাজার কোটি টাকার বেশি টাকার বাজেট আসছে। আমাদের বাজেটের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি ঘাটতি বাজেট। আমাদের দেশের বাজেট তৈরির সময় প্রথমেই খরচের খাত বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রস্তুত করা হয়। আগে খরচের খাত প্রস্তুত করে তারপর আয়ের খাতগুলো চিহ্নিত করা হয়। প্রতিবারই দেখা যায় আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি প্রাক্কলন হয়ে যায়। ফলে বাজেটে ঘাটতি দেখা দেয়। আর ঘাটতি সংস্থান করতে গিয়ে ঋণ, অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। আগে বিদেশি অনুদান বেশি পাওয়া যেত। বিগত কয়েক বছর ধরে অনুদানের পরিমাণ কমে আসছে। আমাদের নিজেদের আয়ও বেড়েছে, যদিও বাড়াটা আরো বেশি হতে পারত। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করার জন্য সুপারিশ পেয়ে গেছি। অপেক্ষা ২০২৬ পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদনের। কোভিড-১৯ আমাদের দুই বছর পিছিয়ে দিয়েছে। অবশ্য কোভিডের কারণে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যেভাবে সংকুচিত হয়েছে, সেই তুলনায় আমরা মন্দের ভালো আছি বলা চলে। দিন যত যাচ্ছে দেশে দেশে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ছে বলে প্রতিদিন খবর পাচ্ছি। ভারতের অবস্থা তো বেশ খারাপ। যারপরনাই অবস্থা, পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে আমরাও আতঙ্কিত। যদিও গত বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের দেশে আক্রান্তের হার ১০ ভাগের নিচে আছে। কিন্তু তারপরও আমরা স্বস্তিতে নেই। কারণ খবর বেরিয়েছে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দেশে ঢুকে পড়েছে। এখনই যদি কঠোর পদক্ষেপ নেয়া না হয় তবে আমাদের কী হবে বিধাতা জানেন। যা হোক, কোভিড আমাদের জেরবার করলেও অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ঠিক রাখতে সরকারকে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। মানুষের অন্ন, বস্ত্রের ব্যবস্থা যাতে ঠিক থাকে সেদিকে সতর্ক নজর রাখতে হয়। ফলে যথানিয়মে বাজেট পেশ করা রুটিন কাজ হিসাবে করে যেতে হচ্ছে। তবে এবারের বাজেট যদিও আমরা বিভিন্ন সূত্রে জেনেছি চূড়ান্ত হয়ে আছে তথাপিও অর্থনীতির ছাত্র এবং নগণ্য নাগরিক হিসেবে প্রতিবারই কিছু না কিছু লিখে থাকি। এবারে আমার লেখার বড় বিষয় হচ্ছে কালো টাকা। আমাদের অর্থনীতির এক বড় অংশজুড়ে আছে কালো টাকা। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, টাকা আবার কালো হয় কীভাবে? টাকার আবার রং আছে নাকি? আসলেই প্রশ্নটা যৌক্তিক বটে। যে টাকা অবৈধভাবে উপার্জন বা পুঞ্জীভূত করা হয় তা অবৈধ টাকা নিঃসন্দেহে। তবে এটাকে কালো টাকা বলা যায় কিনা আমার দ্বিমত আছে। হতে পারে অবৈধ টাকার আরেক নাম কালো টাকা, যা উপার্জনের সঠিক উৎস দেখানো যায় না। আবার অনেকে বৈধভাবে টাকা উপার্জন করেছেন, কিন্তু যথানিয়মে কর দেননি সেটি কালো না হয়ে অপ্রদর্শিত আয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। সুতরাং অবৈধ এবং অপ্রদর্শিত আয় দুটিকেই ঢালাওভাবে কালো টাকা বলা যায় কিনা ভেবে দেখা দরকার। আমরা কালো টাকার নাম করে অবৈধ উপার্জিত টাকাকে বৈধতা দেব তাও রাষ্ট্রীয়ভাবে। দেখুন সেক্ষেত্রে দেশের সম্মানটা কোথায় যায়? অবৈধভাবে উপার্জিত টাকাকে বৈধ করা সুযোগ দেয়ার অন্য মানে দাঁড়ায়। মানে অবৈধ উপার্জনকে স্বীকৃতি দেয়া। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া। তার মানে অবৈধভাবেও টাকা উপার্জন করতে পারবেন। অথচ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নৈতিক অবস্থান হচ্ছে ‘জিরো টলারেন্স’। যদিও অবৈধ উপার্জনকে এভাবে উৎসাহিত করা হয় তবে যারা সৎ উপায়ে উপার্জন করেন তাদের মানসিক অবস্থান কোথায় যায়? তারপর যখন দেখা যায় বৈধ উপার্জনকারীরা শতকরা ২৫-৩০ ভাগ হারে কর দিয়ে যাচ্ছেন অথচ অবৈধ উপার্জনকারী শতকরা ১০ ভাগ কর দিয়ে তার অবৈধ আয়কে বৈধ করে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার এক্ষেত্রে কোনো প্রশ্নও তোলা যাবে না অর্থাৎ কোনো সংস্থা তাদের ঘাঁটাঘাঁটি করবে না। সম্প্রতি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরে দেখলাম এভাবে কালো টাকা সাদা করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন দেশের দুটি বড় ব্যবসায়ী সংগঠনের সভাপতি। তারা দুজন হলেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি নিহাদ কবির ও ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান। তারা ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগের সমালোচনা করে বলেন, সৎ ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ হারে কর দেন। আর অনেকে চুরি-ডাকাতির টাকা ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে সাদা করে ফেলেন। এতে সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় করা হয়। তারা কর দিতে নিরুৎসাহিত হন। অনেক করদাতা তাই চিন্তা করতে পারেন, এ বছর আয় কম করে দেখাব, তাহলে সামনের বছরে তা প্রদর্শন করে যদি শতকরা ১৫-২০ ভাগ ছাড় পাই (সব আয় সঠিকভাবে দেখালে হয়তো শতকরা ২৫-৩০ ভাগ হারে কর দিতে হয়) তবে আগামী বছরে এমনিতেই আয় শতকরা ১৫-২০ ভাগ হয়ে যাবে। তাই আমাদের আকুল আবেদন থাকবে কোনোভাবেই যেন অবৈধ উপার্জনকে বৈধতা দেয়ার সুযোগ এই বাজেটে না থাকে। এই সুযোগ নৈতিকভাবেও সমর্থনযোগ্য নয়। বরং অবৈধ আয়ের উৎস বন্ধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা যেন করোনাকালের এই দ্বিতীয় বাজেট থেকে উচ্চারিত হয় তা আমজনতা দেখতে চায়। তবে অপ্রদর্শিত আয় যার প্রকৃত উৎস দেখানো যাবে সেই আয়কে প্রদর্শন করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে, তবে অবশ্যই সেটা প্রচলিত আয়করের সর্বোচ্চ হার থেকে ১ ভাগ হলেও বেশি হতে হবে।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়