ঈদ বৃহস্পতি না শুক্রবার জানা যাবে সন্ধ্যায়

আগের সংবাদ

গঙ্গায় সারি সারি লাশ

পরের সংবাদ

করোনায় কাবু ঈদ অর্থনীতি

প্রকাশিত: মে ১২, ২০২১ , ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১২, ২০২১ , ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

শুধু রিজার্ভ রেমিট্যান্স ছাড়া সবকিছুই নিম্নমুখী

ঈদের আগে টাকা তোলার হিড়িক

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবার মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। কিন্তু তারপরেও চলমান করোনায় ঈদ অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব নেই। শুধু রেমিট্যান্স ছাড়া সবকিছুই নিম্নমুখী। মানুষের আয় কমেছে। পাশাপাশি সীমিত চলাচলে কমছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কারণ সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহণ ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে। সবমিলিয়ে আসন্ন ঈদের অর্থনীতিতে বেশ মন্দা চলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মানুষের ব্যয় বাড়াতে না পারলে অর্থনীতি চাঙা হবে না।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থনীতি চাঙা করতে হলে মানুষের ব্যয় বাড়াতে হবে। আর ব্যয় বাড়ানোর জন্য আগে আয় করা দরকার। কিন্তু করোনার কারণে বড় একটি অংশের আয় কমেছে। মানুষের চলাচল সীমিত। যা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, এটিই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, এর বিকল্প কিছু করার ছিল না। তবে আগামী বাজেটে কর্মসংস্থানকে জোর দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

জানা গেছে, প্রতিবছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়ে। তবে কী পরিমাণ বাড়ে তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। তবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হিসাব বলছে, চলতি মাসেই অর্থনীতিতে অতিরিক্ত আরো ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন। খাদ্যপণ্য, পোশাক, বিনোদন ও পরিবহণ খাতে এই বাড়তি অর্থ যোগ হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবী, দোকান কর্মচারী, পোশাক ও বস্ত্র খাতের শ্রমিকসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমজীবীদের বোনাসও এ কর্মকাণ্ডে যোগ হয়। উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘন ঘন হাতবদল হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বাড়ে, তেমনি চাঙা হয় গোটা অর্থনীতি। তবে করোনার এ বছর অর্থনীতির এই তেজিভাব একেবারেই নেই। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে করোনায় দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে। আর ৮৬ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। ৭৮ শতাংশ মানুষ তাদের খরচ কমিয়েছে। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ মানুষ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। আবার অনেকের ঋণ বেড়েছে। কেউ কেউ সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে কাজ হারানো বড় একটি অংশ কৃষিতে যোগ দিয়েছে। যা পুরো দেশের অর্থনীতিতে ভোগের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের হিসাবে দেশের মোট জিডিপির আকার হচ্ছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। তিনটি খাত থেকে এই উৎপাদন আসে। এগুলো হলো- সেবা খাত থেকে ৫৪ শতাংশ, শিল্প ৩১ এবং কৃষি খাত থেকে ১৫ শতাংশ। কিন্তু করোনার কারণে কৃষি ছাড়া সেবা ও শিল্প দুটি খাতেই মন্দা।

দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন তার নিজস্ব একটি সমীক্ষায় উল্লেখ করেছেন, রোজায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন যোগ হচ্ছে। তার সমীক্ষার হিসাব মতে, পোশাকের বাজারে যোগ হচ্ছে ৩৫ হাজার ২শ কোটি টাকা। নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তি যোগ হচ্ছে ২৭ হাজার কোটি টাকা। ধনী মানুষের দেয়া জাকাত ও ফিতরা বাবদ আসছে ৬৭ হাজার কোটি টাকা। পরিবহণ খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬৬০ কোটি টাকা। ঈদকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার ৫শ কোটি টাকা। এছাড়া আয়ের হিসাবে সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর, ৬০ লাখ দোকান কর্মচারী, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের বোনাস। যা ঈদ অর্থনীতিতে আসে। এছাড়া আরো রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকা। ঈদের সময়ে প্রবাসীরা তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে বাড়তি ব্যয় মেটাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে থাকেন। কিন্তু এবার সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে বেসরকারি খাতে বোনাসের হার একেবারেই কমেছে। ৩৫ শতাংশ পোশাক কারখানায় ঈদ বোনাস দেওয়া হয়নি। তবে রেমিট্যান্স কিছুটা বেড়েছে। ঈদের মাসে রেমিট্যান্স আড়াই বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। টাকার অঙ্কে যা ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্সের হার বেড়েছে। কেউ কেউ বলছেন, পাচার হওয়া টাকা রেমিট্যান্স আকারে ফিরে আসছে।

রিজার্ভ রেমিট্যান্স আহরণে রেকর্ড : মহামারি করোনাভাইরাসের সংকটের মধ্যেও দেশে রেমিট্যান্স আহরণের রেকর্ড হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২ হাজার ৬৭ কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। শুধু চলতি মে মাসের প্রথম ৯ দিনেই প্রবাসীরা ৯১ কোটি ৯০ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৬৭ কোটি ডলার। (বাংলাদেশি মুদ্রায় এক লাখ ৭৫ হাজার ৭১২ কোটি টাকা)। এর আগে কোনো অর্থবছরে দেশে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি। এর মধ্যে প্রবাসী আয় পাঠানোর শীর্ষে থাকা ১০টি দেশ থেকে এসেছে এক হাজার ৮৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৮৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। তার মধ্যে আর মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৫৩ শতাংশ বা এক হাজার ৮৬ কোটি ৮৩ লাখ ডলার।

এর আগে এপ্রিল মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ২০৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার (২ দশমিক ০৬ বিলিয়ন) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। যা আগের বছরের একই মাসের চেয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি। গত বছর এপ্রিলে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১০৯ কোটি ডলার।

এদিকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সবশেষ ৩ মে পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

অভ্যন্তরীণ পোশাকের বাজার : ঈদ অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হচ্ছে পোশাকের বাজার। এ সময় পোশাকের বেচাকেনা দোকানগুলোতে তিন থেকে চারগুণ বেড়ে যায়। অভ্যন্তরীণ পোশাকের সবচেয়ে বড় জোগান আসছে পুরান ঢাকার উর্দু রোডের অভ্যন্তরীণ পোশাক মার্কেট থেকে। ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটসহ দেশের বিভাগ ও মফস্বল মার্কেটগুলোতে দেশি পোশাক সরবরাহ হয় এই মার্কেট থেকে। কিন্তু এবার একদিকে মার্কেট বন্ধ। কিন্তু রমজানের শেষদিকে মার্কেট খুলে দিলেও পরিবহণ বন্ধ থাকায় সারা দেশে সরবরাহে ব্যাপকভাবে বিপর্যয় এসেছে।

ভোগ্যপণ্যের বাজার : ঈদে সব ধরনের নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিশেষ ভোজ্যতেল, মাংস, চিনি, ডাল, সেমাই এবং পেঁয়াজ উল্লেখযোগ্য। ফলে এসব পণ্যের আমদানিও বাড়ে। রোজা ও ঈদে ভোজ্যতেলের চাহিদা হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ টন, চিনি সোয়া ২ লাখ টন থেকে পৌনে তিন লাখ টন, ডাল ৬০ হাজার টন, ছোলা ৫০ হাজার টন, খেজুর ১৩ হাজার টন, পেঁয়াজ ৩ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন, রসুনের চাহিদা প্রায় ৮০ হাজার টন। এসব পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের নিজস্ব টাকার পাশাপাশি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকার জোগান দেওয়া হয়। কিন্তু এবার এই চাহিদা একেবারেই কমেছে।

দোকান কর্মচারী বোনাস : ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে সারা দেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২০ লাখ দোকান, শপিংমল, বাণিজ্য বিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে ৩ জন করে ৬০ লাখ জনবল কাজ করছে। সংগঠনটির হিসাবে নিম্নে একজন কর্মীকে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়। ওই হিসাবে গড়ে বোনাস ৮ হাজার টাকা ধরে ৪ হাজার ৮শ কোটি টাকা বোনাস দেওয়া হয়। কিন্তু এবার পুরো রমজানে দোকান বন্ধ থাকায় বোনাস তো দূরের কথা, বেতনই পাচ্ছে না অনেক শ্রমিক।

ঈদের আগে টাকা তোলার হিড়িক : ঈদের আগে আর একদিন ব্যাংক খোলা থাকবে। এ সময়ের মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-বোনাস দিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকরাও প্রয়োজনীয় টাকা তুলে রাখছে। তাই ঈদের আগে ব্যাংকগুলোতে টাকা তোলার হিড়িক পড়েছে। মঙ্গলবার টাকা উত্তোলনের চাপে গ্রাহকসেবা দিতে ব্যাংক কর্মকর্তারা হিমশিম খেতে হয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা, দৈনিক বাংলা, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যাংকের শাখাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই ব্যাংকের শাখাগুলোর ক্যাশ ও জমা কাউন্টারে সামনে লম্বা লাইন। পাশাপাশি বিভিন্ন চালানপত্র, ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন সেবার বিল জমা দেয়ার লাইনও লক্ষ্য করা গেছে।

মতিঝিল সোনালী ব্যাংকের লোকাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ঈদের আগে শেষ দুই কর্মদিবসে সব সময় গ্রাহকের ভিড় থাকে। আজ গ্রাহকের অনেক চাপ। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টাকা জমা দেওয়ার চেয়ে বেশি উত্তোলন করছে। কারণ পোশাক কারখানাগুলো বেতন বোনাস দেবে। তাই করপোরেট গ্রাহকরা আজই টাকা উঠাচ্ছে। অন্যদিকে আজ সকাল থেকেই ক্যাশ কাউন্টারে সাধারণ গ্রাহকদের প্রচুর ভিড়। স্বাভাবিক দিনের চেয়ে তিন চারগুণ বেশি লেনদেন হচ্ছে। এজন্য আগে থেকে আমরা অতিরিক্ত ক্যাশ কাউন্টারে ব্যবস্থা করেছি বলে জানান এ কর্মকর্তা।

মতিঝিল এনআরবিসি ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ইব্রাহীম উদ্দিন বলেন, আমার ছোট একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কর্মীদের বেতন বোনাস দিতে হবে। তাই টাকা তুলতে লাইনে দাঁড়িয়েছি। তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই ব্যাংকে চাপ। আজ একটু কম হবে মনে করে এসেছি। কিন্তু এক ঘণ্টা হয়েছে, এখনও টাকা তুলতে পারিনি।

এদিকে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চলমান বিধিনিষেধ ৬ মে থেকে ১৬ মে মধ্যরাত পর্যন্ত বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ সময় ব্যাংকও সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ব্যাংকের লেনদেন হচ্ছে। লেনদেন পরবর্তী আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ করার জন্য ব্যাংক খোলা থাকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। ঈদের আগে আগামীকাল (বুধবার) শেষ কার্যদিবস। তবে ঈদ শুক্রবার হলে শিল্প এলাকায় ১৩ মেও (বৃহস্পতিবার) ব্যাংক খোলা থাকবে।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়