ফলে বিষ মেশানো বন্ধে নজরদারি

আগের সংবাদ

আতঙ্কের মধ্যেই ঈদ উৎসব

পরের সংবাদ

করোনা-ক্রান্তিকাল তবু অনন্ত জাগে…

প্রকাশিত: মে ১১, ২০২১ , ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১১, ২০২১ , ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গের তীব্র সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি বিশ্ববাসী। ভ্যাকসিন প্রয়োগ, লকডাউন বা বিধিনিষেধ আরোপের পরও দিন দিন লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ। মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় সংকট আরো দ্রুতলয়ে বাড়ছে । মৃত্যুহারের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ নিয়ে এরই মধ্যে চিকিৎসা এবং জরুরি সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো। কোভিডের নতুন ঢেউ, জীবাণুর নতুন চেহারা এবং ভ্যারিয়েন্টগুলোর উপস্থিতি চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বিজ্ঞানীদের কপালে। করোনায় আক্রান্তের ঊর্ধ্বমুখী সংখ্যার সঙ্গে মনে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে তিনবার মিউটেট (ই.১.৬১৮) করা এই ভাইরাসের স্ট্রেন বেঙ্গল স্ট্রেন। করোনার এই নতুন স্ট্রেন নাকি সমস্ত রকম ইমিউনিটির বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম। জনপদ এখন বিবর্ণ, হাসপাতাল থমথমে, শ্মশানে লাশের দীর্ঘ শবযাত্রা, চিতার আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে, পরিত্রাণ খুঁজতে গবেষণাগারগুলো অবিরাম কাজ করে চলেছে। করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নতুন স্ট্রেন। একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে ভাইরাসের এই রূপ অন্যান্য নতুন রূপের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। সেটাই আতঙ্কের কারণ। তারা মানবদেহে পরগাছা হিসেবে বেঁচে থেকে বংশবৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে।
পৃথিবী এখন প্রযুক্তির উদ্ভাবনশীলতায় পুরোপুরি বিজ্ঞানমুখী। আধুনিক বিজ্ঞানের বদৌলতে আমরা স্বার্থান্ধ হয়েছি এবং বিজ্ঞান আমাদের দর্পিত করেছে। কোভিড ভাইরাস যাদের শরীরে নিরাপদ ঘর-সংসার করার কথা সেই ভাইরাস এবার স্তন্যপায়ী পশুর শরীর ছেড়ে স্বচ্ছন্দ বসবাস গড়ে তুলেছে মানুষের শরীরে। মনুষ্য শরীরে তাদের থাকবার কথা নয়। এ মহামারি আমাদের কাছে নতুন নয়। মহামারি আমাদের ছাড়েনি যুগ যুগ ধরে। বসন্ত, টিবি, ফ্লু, ম্যালেরিয়া, প্লেগ, হাম, কলেরা, মার্গ, সার্স, ইবোলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত যত মানুষ অস্ত্রাঘাতে মারা গেছে, তার অনেক বেশি মারা গেছে অচেনা সংক্রামক রোগে। অচেনা, অজানা জীবাণু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে, পশুসমাজ থেকে মানবসমাজে ব্যাধির স্বচ্ছন্দ চলাচল আর বিন্যাস করেছে সহজে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যাধির প্রকোপ; শান্তি আর স্বস্তিতে বেঁচে থাকবার যাবতীয় উপাদানগুলো ক্রমশ বিলীয়মান। দর্পে আবিষ্ট এই মানবজাতি আর সভ্যতাকে প্রকৃতির রুদ্ররোষের মৃদু ঝটকায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরজীবী নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে নিমেষে। বছর ঘুরে সেই অদমনীয় ভাইরাসকে আটকানোর উপায় এখনো আমাদের অধরা। সুতরাং যারা ভাবছেন, এ করোনাকে নিয়ে মাথাব্যথার কিছু নেই, তাদের জন্য অনেক দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করে আছে। করোনা ভাইরাসকে এখন সঙ্গে নিয়েই আমাদের জীবনযাপন করতে হবে। করোনা এই পৃথিবীতে কতদিন থাকবে তা অনুধাবন করা খুবই দুষ্কর। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি এখন ভয়ঙ্কর সংকটের মুখে। মানুষের কাজ বন্ধ, আয়ও বন্ধ। জীবনমানের নিম্নগতিতে মানুষ অসহায়। বহু প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা। কর্মহীন হয়েছে অগণন মানুষ। অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
এমন এক অবস্থায় দেশজুড়ে লকডাউনের সরকারি সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা, যা করোনার আগ্রাসন রোধ করার ক্ষেত্রে একমাত্র উপায় বলে বিবেচিত। আপাতত সত্যি এর কোনো বিকল্প নেই। লকডাউনের মধ্যেও সড়কে যান চলাচল রয়েছে। ফুটপাথ থেকে অভিজাত শপিংমলে এখন মানুষের সরব উপস্থিতি। সামাজিক দূরত্ব মানারও বালাই নেই। স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে ন্যূনতম মাস্কও ব্যবহার করতে চাচ্ছেন না অনেকে। দেশে করোনার সংক্রমণ না কমলেও জনজীবন বিপন্ন। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা। প্রাণঘাতী করোনা পরিস্থিতিকেও মানুষ আমলে নিচ্ছে না, স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেছে। এতে সংক্রমণ পরিস্থিতি আরো নাজুক হতে পারে। মানুষ ঘরে থাকার পরিবর্তে রাস্তায় নেমে গেছে। যেন সবকিছু স্বাভাবিক। এ ধরনের জীবনযাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার করোনার সংক্রমণ রোধে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ধাপে ধাপে লকডাউন বাড়ানো হচ্ছে। ফলে অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিপন্ন হয়ে পড়েছে খেটে খাওয়া দিনমজুর ও দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকা।
এ প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবার শুভবুদ্ধি জাগ্রত হোক, এ বিপদের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্বিত ফিরুক। শুভবুদ্ধির প্রয়োজন কেবল অতিমারির মোকাবিলায় নয়, রাজনীতি এবং সমাজের কালব্যাধির বিরুদ্ধেও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্র্ণ হলো সব ধরনের জনসমাগম ও চলাচল নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু লকডাউন শব্দটি ব্যবহার করা যথেষ্ট নয় এবং চলমান ঢিলেঢালা লকডাউন দিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কঠোর পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে আগামীতে দেশে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। অবশ্যম্ভাবী বিপজ্জনক পরিস্থিতি রুখতে জনগণের মাঝে সাবধানতা তৈরি করা জরুরি, তাই বাংলাদেশে বিপজ্জনক ভ্যারিয়েন্টগুলো সম্পর্কে জনগণকে সম্যকভাবে অবগত করা প্রয়োজন। এর ফলে মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা বাড়বে এবং সরকার সহজে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো কার্যকর করতে পারবে। এত কিছুর পরও নেতিবাচক এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হতাশায় ডুবে যাওয়ার মতো কিছুই হয়নি। প্রাণঘাতী এই অণুজীব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে মানুষ কতটা অসহায়। এই অণুজীব ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য স্বজনকে। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা পায়নি কত লোক। বিভিন্ন অঙ্গনের একেবারে শীর্ষ পর্যায়ের ঋদ্ধ আলোর মানুষগুলোকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে করোনা অজানা গন্তব্যে। জাতির যে কোনো সংকটে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেয়া সমাজ, সংস্কৃতির আলো ছড়ানো মানুষগুলো যারা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন রচনা করেছেন করোনা তাদের বাঁচতে দেয়নি। একজনের মৃত্যু শোকের আবহ না যেতেই আরেক প্রিয়জনের করোনা সংক্রমণের দুঃসংবাদ আমাদের বিধ্বস্ত করছে নিরন্তর। উপর্যুপরি মৃত্যুর বিভীষিকা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। সারাজীবন যাদের ঘিরে ছিল অসংখ্য গুণগ্রাহী তারা নিঃশব্দে হাসপাতালে নিঃসঙ্গ যাত্রা করেছেন অসীম পানে। কারো সঙ্গে দেখা হয়নি। শেষ কথাটি বলা হয়নি। করোনা ভাইরাস ঘিরে আজ আমরা যে বাস্তবতার সম্মুখীন, তা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের কাছে এক ভয়ানক অদ্ভুত সময়। লকডাউন, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং ইত্যাদি অচেনা শব্দবন্ধগুলোই এখন সব থেকে চর্চিত বিষয় আমাদের রোজকার অভিধানে। আমাদের চেনা পৃথিবী আজ বদলে গিয়েছে পুরোপুরি। এই পৃথিবী কলেরা মহামারি দেখেছে। প্লেগ দেখেছে। স্প্যানিশ ফ্লু দেখেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৃত্যু মিছিল থেমে গিয়ে নতুন শুরু দেখেছে এই পৃথিবী। একই রকমভাবে এই করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত, দিশাহারা সময় অতিক্রম করে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরব আবার আমরা। অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়তো কয়েক বছর বাদে কাটিয়ে উঠবে গোটা পৃথিবী। আমরা যারা এই দুঃসময় প্রত্যক্ষ করলাম, তাদের জীবনে-যাপনে, মননে, চিন্তনে কি এই অভিজ্ঞতা কোনো প্রভাব রেখে যাবে? করোনা নেহাতই একটি ঘটনা, যা অতিক্রম করে আমরা ফিরে যাব আমাদের অতীত জীবনে। অথবা দ্বিতীয়ত, এই দুঃসময় থেকে আমরা খুঁজে পেতে পারি এক নতুন বোধ, এক নতুন উপলব্ধি। আর তার আলোকে আমরা কিছুটা বদলে নিতে পারি আমাদের ভবিষ্যৎ যাপন। এই বর্তমান পরিস্থিতি আসলে সমগ্র মানব সমাজকে আয়নার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই আয়নায় তাকিয়ে নিজেদের সংশোধন করার এটাই আদর্শ সময়। আমাদের বিশ্বাস এই ভয়াবহ দুঃসময় কাটিয়ে ফের দ্রুত চেনা ছন্দে ফিরবে পৃথিবী। আমরা শুধুই হতাশা এবং বিষণ্নতাকে আঁকড়ে ফের সেই আগের আমরা হয়েই পথে নামব না। এই ভয়াবহ দুঃসময়কে আমরা নতুনভাবে বাঁচতে শেখার সময় হিসেবে জীবনপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করব। এ সংকটকাল আমাদের সামনে আত্মসমীক্ষার আয়না ধরেছে। এই সময়কে ঘিরে আমাদের বোধ এবং উপলব্ধিকে আমরা যদি আমাদের পরবর্তী জীবনে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে মানুষ হিসেবেই উত্তরণ ঘটবে আমাদের। তাই এই সময় হেরে যাওয়ার সময় নয়, বরং আমাদের আগামী বহু লড়াই জিতে যাওয়ার প্রয়োজনীয় উপায় খুঁজে নেয়ার সময়। সময় আজ আমাদের কাছে শিক্ষক হিসেবে হাজির হয়েছে, আর আমরা যদি তার থেকে শিখে নিতে পারি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল, তা হলে এই সময় পেরিয়ে গেলে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াব জয়ী মানুষ হিসেবে। এ প্রত্যাশায় বুক বেঁধে সম্মুখ পানে চলছি রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়েÑ আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে…।

দিলীপ কুমার বড়ুয়া : কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়