ক্ষুদ্র ঋণ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ

আগের সংবাদ

শিক্ষার অগ্রগতির কী করুণ পরিণতি!

পরের সংবাদ

বাঙালির বাতিঘর

প্রকাশিত: মে ৭, ২০২১ , ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ৬, ২০২১ , ১০:০৯ অপরাহ্ণ

সৈয়দ জাহিদ হাসান

অখণ্ড বঙ্গভূমির বিস্ময়পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [১৮৬১-১৯৪১]। দিনের রবি যেমন করে দশদিক আলোকিত করে, রবীন্দ্রনাথও তেমন করে বাংলা সাহিত্যকে রবিকিরণে উদ্ভাসিত করে রেখেছেন। আকাশের অনির্বাণ সূর্যের সঙ্গে বঙ্গভূমির যে সন্তানকে তুলনা করলে যথার্থ হয় তাঁর গৌরব কেবল রবীন্দ্রনাথেরই প্রাপ্য। বৈচিত্র্যময় রূপ ও রসের উদ্গাতা তিনি। দীর্ঘ দেহ, দীর্ঘ আয়ু আর দীর্ঘ শিল্পীজীবনে তিনি এত কিছু সৃজন করেছেন যে, অতল মহাসাগরও বিস্ময় মানে তাঁর সৃষ্টিরাশির কাছে। কবি ও কথাশিল্পীগণ অমৃতের সন্তান, কিন্তু তাঁরা সংলগ্ন হয়ে থাকেন মলিন-মৃত্তিকায়। বৃক্ষ যেমন মাটির রস টেনে নিয়ে সতেজ, সবল, সপুষ্প হয়Ñ রবীন্দ্রনাথও বঙ্গভূমির রঙিন রস পান করে বলবান ও ফলবান হয়েছিলেন। নিশ্চয়ই শ্যামল বাংলার মৃত্তিকার কাছে রবীন্দ্রনাথের ঋণ আছে, কিন্তু এই মাটিও রবীন্দ্রনাথের কাছে অসামান্য ঋণে ঋণী। তাই যখনই কেউ নিরপেক্ষ অনুরাগের দৃষ্টি নিয়ে রবি-মূল্যায়নে নিমগ্ন হবেন তাঁর মনে শুধু এই কথাটিই পবিত্র জপমন্ত্রের মতো উচ্চারিত হবে।

আট পঙ্ক্তিতে গাঁথা কবিতাংশটুকু রবীন্দ্রনাথের জন্য পুরোটাই প্রযোজ্য। রবীন্দ্রনাথ আনন্দের কবি, বিষাদের কবি; স্বপ্নময় গভীর নিদ্রা থেকে দৈববাণীর মধুর কোলাহলে জেগে ওঠার কবি। তাঁর একক সত্তায় বাস করত একাধিক শিল্পীপ্রাণ। রবীন্দ্রনাথকে তুলনা করা যেতে পারে ঝরনার সঙ্গে। অভ্রভেদী ঊর্ধ্বলোকে থাকে ঝরনার উৎসবিন্দু, কিন্তু তাঁর শেষ প্রান্ত মিশে থাকে অপার সমুদ্রে। অসীম শূন্যলোক থেকে কবি যে দৈববাণীর ধারা পেতেন তা-ই তিনি দান করতেন মানবসমুদ্রে। তাঁর সেই অমিয়ধারা পান করে আমরা পুষ্ট হই, তুষ্ট হই; যেমন করে মাতৃস্তনের মধুর ধারায় তৃপ্ত হয় মনুষ্যসন্তান।

রবীন্দ্রনাথের দেবার ও নেবার ক্ষমতা ছিল অমেয়। তাঁর ৮০ বছরের দীর্ঘ জীবনে ৭২ বছর তিনি সৃজনক্ষম ছিলেন। ৭২ বছর পর্যন্ত তিনি যা দিয়ে গেছেন, বাংলা সাহিত্যে এখন পর্যন্ত কেউ তাঁর সমকক্ষ নন। অনাগত ভবিষ্যতে আর কেউ রবি-পঙ্ক্তিতে বসার মহামর্যাদা পাবেন কি না সেই বিষয়েও রয়েছে ঢের সংশয়। রবীন্দ্রনাথের গ্রহণ ক্ষমতার ছিল আশ্চর্য করার মতো। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন-মধ্য-আধুনিক যুগের সকল কবি-সাহিত্যিকই ছিলেন তাঁর প্রাণের সুহৃদ। প্রাচীন চর্যাপদের পদকর্তাগণ যেমন তাঁকে পথ দেখাতেন, মধ্যযুগের মঙ্গল ও বৈষ্ণব কবিরাও তাঁকে দান করতেন প্রেমময় সাহচার্য, আধুনিক যুগের প্রতিবাদী কবি-সাহিত্যিকরাও তাঁকে সমৃদ্ধ করেছেন ভাব ও ভাষা দিয়ে। জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাসের প্রেমপ্রবণতা তাঁকে ঋদ্ধ করেছে। আধুনিক রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, লালন ও গগন তাঁকে করেছেন সবল ও সুস্থ। বৈদিক সাহিত্য থেকে বাংলার লোকসাহিত্যÑ সবখানেই রবীন্দ্রনাথ মধু চক্রের সন্ধান পেয়েছেন। গ্রহণ করেছেন পুষ্টিবর্ধক বিস্ময় তরল। বিশ্ব সাহিত্যের পান্থশালায়ও তিনি নিয়মিত হাজির হতেন। সেখান থেকেও তিনি হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করেছেন শৈল্পিক সরাব। তাই আমরা এক রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করলেই অনেক শিল্পীকে পাই। একের ভিতরেই পেয়ে যাই অনেকের স্বাদ ও ছোঁয়া। রবীন্দ্রনাথের মতো এত বৈচিত্র্য আর নানামুখিতা পৃথিবীর কম স্রষ্টার মধ্যেই আছে। বঙ্গভূমি ধন্য যে, রবীন্দ্রনাথের মতো সন্তান তাঁর কোল জুড়ে এসেছিল। আমরাও ধন্য যে, সর্বজয়ী রবীন্দ্রনাথ আমাদের পূর্বপুরুষ।

রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারে। জীবনাচারে তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। তাঁর সখ্যের এক প্রান্তে ছিল উচ্চ শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ আরেক প্রান্তে ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথা হরিজন (শূদ্র)। উচ্চকোটি ও নিম্নবর্গের সংযোজক রেখা হিসেবে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন বঙ্গবাসীর সামনে। তাঁর মধ্যে সীমাহীন স্বাদেশিকতা ছিল আবার ছিল বিপুল বিশ্ববোধ। এই যে ‘একই অঙ্গে এত রূপ’ বাংলা সাহিত্যের আর কোনো সাহিত্য সাধকের মধ্যে দেখা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রোমান্টিক কবি হলেও আধুনিকতা ও আধ্যাত্মিকতা তাঁর মধ্যে সমপরিমাণে ছিল। বৈশাখের রুদ্ররূপ যেমন তিনি দেখিয়েছিলেন, তেমন ভাবেই তাঁর মধ্যে ছিল বাদলের অপার বিষাদ। প্রতিবাদী কবি হিসেবে তিনি আমাদের প্রেরণার উৎস, আবার প্রেমের কবি হিসেবেও তিনি অগ্রগণ্য। মানব-মনে যেসব আবেগ অষ্টপ্রহর খেলা করে সেসব আবেগ রাবীন্দ্রিক সাহিত্যকর্মে ভরপুর। গ্রীষ্মে তিনি তৃষ্ণার জল, বর্ষায় তিনি অন্তরঙ্গ সুহৃদ, হেমন্তে তিনি সোনালি শস্যের কথাকার আর ব্যাকুল বসন্তে যৌবনের বন্দনাকারী। তিনিই প্রথম ঘোষণা করেনÑ ‘সবার সাথে রং মিশাতে হবে।’ আবার তিনিই প্রথম গেয়েছিলেনÑ ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই লড়তে হবে।’ বর্ণিল বিরহে জীবন যখন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন দূর থেকে হাত বাড়িয়ে যিনি অভয় দান করেন তিনিই তো রবীন্দ্রনাথ। আজ শুধু বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলেই নয়, বিশ্বব্যাপীই রবীন্দ্রনাথ সমাদৃত। পৃথিবীতে এমন লোকের সংখ্যা মোটেই নগণ্য নয়Ñ যাঁরা ঘুমাতে যাঁরয়ার পূর্বে ও ঘুম থেকে উঠে রাবীন্দ্রিক সাহিত্য-সুধা (বিশেষ করে গান ও কবিতা) পান করেন না। অস্তিত্বের গভীরে তাঁকে যাঁরা সতত অনুভব করেন তাঁদের ভয় নেই, লয় নেই। রবীন্দ্রনাথ নামের ধ্রুবতাঁরা যাঁর নয়ন সমুখে দীপ্তিমান পৃথিবীর অকূল পারাবারে সে কূল খুঁজে পাবেই।

পণ্ডিতপ্রবর আহমেদ শরীফ তাঁর ‘সৌন্দর্যবুদ্ধি ও রবীন্দ্র-মনীষা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে বলেছেনÑ “পৃথিবীর কোনো একক ব্যক্তির রচনার এমন বিপুল ও বিচিত্র বিস্তার আর দেখা যায়নি। এমন সর্বতোমুখী ও সর্বত্রগামী ভাব-চিন্তা-কর্মও অদৃষ্টপূর্ব। অবশ্য গল্পে-উপন্যাসে-নাটকে-প্রবন্ধে তাঁর সমকক্ষ কিংবা তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ লেখক ইউরোপ খণ্ডে বিরল নয়, কিন্তু কাব্যজগতে, বিশেষ করে গীতিকবিতার ও গানের ভুবনে তাঁর তুলনা বিরল। অনুভূতির সূক্ষ্মতায়, বৈচিত্র্যে, চিত্রায়ণে, মাধুর্যে, তাৎপর্যে, উৎকর্ষে আর অনেকতায় তাঁর গান ও গীতিকবিতা প্রায় অনুপম। তাঁর স্বভাষী তাঁর কাছে পেয়েছে সৌন্দর্য দেখার চোখ, সুরুচির পাঠ, মানবতার বোধ ও বিশ্বজনীনতায় দীক্ষা। তাঁর কাছে পেয়েছে তাঁরা মুখের ভাষা, কণ্ঠের সুর, প্রাণের প্রীতি, চরিত্রের দাট্য, আত্মসম্মানবোধ, আনন্দের কাক্সক্ষা ও জীবনে প্রত্যয়। আজকের সংস্কৃতিবান-মানবতাবাদী বাঙালিমাত্রই রবীন্দ্রনাথের মানস-সন্তান।” বিদ্রোহী জ্ঞানতাপস ডক্টর আহমদ শরীফের এই রবিমূল্যায়ন অত্যুক্তি নয়, বরং অবশ্যমান্য। শান্তি, শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যকামী রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ও বিশ্ববাসীর অনির্বাণ বাতিঘর।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়