নৌ-দুর্ঘটনা আর নয় চাই সচেতনতা

আগের সংবাদ

লাউয়াছড়া থেকে শিক্ষা নিক সুন্দরবন

পরের সংবাদ

ক্ষুদ্র ঋণ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত: মে ৭, ২০২১ , ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ৬, ২০২১ , ১০:০৮ অপরাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাই তাকে বিশ্ব কবি বলা হয়। ব্যক্তি জীবনে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জমিদার। রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলা আসতেন জমিদারি দেখাশুনা করতে। পতিসর এবং শিলাইদহ কুঠিবাড়ী ছিল রবীন্দ্রনাথের খাজনা আদায় কেন্দ্র। তাই পূর্ব বাংলার এই এলাকা দুটির মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি ভালো জানতেন। এখানকার মানুষের আর্থিক দৈন্যতা তাকে ভাবিয়ে তুলত। নবান্নের ধান কাটার পর মহাজনের ধারদেনা পরিশোধ করে প্রান্তিক কৃষকদের ঘরে কিছু উঠত না। তাই এই অভাবি কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তনে তিনি কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। জোড়া সাঁকুর ঠাকুর পরিবারের জমিদারির বিস্তৃতি ছিল বাংলার অনেক জেলায়। পারিবারিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল নওগাঁ এবং কুষ্টিয়া পরগনার খাজনা আদায়সহ সব কাজকর্ম দেখাশুনা করার। ১৮৯০ সালের রবীন্দ্র প্রথম পূর্ব বাংলায় আসেন। তার জমিদারি এলাকাধীন বিরামপুর, কলিগ্রাম, শাহাজাদপুর এলাকায় ঘুরে তিনি দেখেন যে, এখানকার কৃষকরা বংশানুক্রমিকভাবে মহাজন ও দাদনদারের ঋণগ্রস্ত। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের মহাজনী ঋণের শেকল থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ছিল, ১. কৃষকদের নিয়ে সমবায় ভিত্তিক সমিতি ২. শস্য গোলা, ৩. কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ।

সমবায় সমিতির উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের মাঝে ঐক্য গড়ে তোলা এবং সমিতির মাধ্যমে কৃষকরা নির্ধারণ করতে পারবে তাদের সমস্যাগুলো কি কি এবং এর সমাধানে কি করণীয় তার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। শস্য গোলা এর মানে ছিল, মৌসুমের উৎপন্ন শস্য কৃষকরা একটি অংশ এই গোলা জমা রাখবে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনে এখন থেকে শস্যকে ঋণ হিসেবে নিবে আবার ফসল ফলানোর হলে এই শস্য ঋণ পরিশোধ করে দিবে। মহাজনী ঋণ ছিল চড়া সুদের তাই স্বল্প সুদে সহজ শর্তে জামায়াতহীন ঋণ দেয়ার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ কৃষিব্যাংক গড়ে তুলেন। গরিব কৃষকদের সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার জন্য তিনি ১৮৯৪ সালে শিলাইদহে এবং ১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষিব্যাংক স্থাপন করেন। কৃষকদের জন্য তৈরি এ ব্যাংক পরিচালনায় যে পদ্ধতি তিনি প্রণয়ন করেছিলেন তাতে ছিল একটি কৃষকবান্ধব ব্যবস্থা। অর্থাৎ গরিব কৃষক যারা এই ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করবে এবং সুদসহ ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন তাদের প্রদেয় সুদের একটি অংশের মালিকানা উক্ত ঋণগ্রহীতা হয়ে যাবেন। ব্যাংকটির পরিচলন প্রক্রিয়ায় কৃষকের মতামত গ্রহণ করা হতো। প্রাথমিক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ তার আত্মীয়স্বজন বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এই ব্যাংকের মূল ধন গড়ে তুলেন। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য নোবেল প্রাইজ পান। নোবের ফ্রাইজের প্রাপ্ত অর্থ থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা পতিসর কৃষিব্যাংকে অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। কৃষিব্যাংকটির ঋণের সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ সরল সুদ। ওই সময় এবং বর্তমানেও কোথাও ১২ শতাংশ সরল সুদে ঋণ দেয়া হয় না। বর্তমান সরকার ওয়ান ডিজিট সুদের হার করলেও সুদের হিসাবটা করা হয় কম্পাউন্ড বা ফ্লাট রেটে যা প্রকৃত সরল সুদে হিসাব করলে শতকরা হারটা অনেক বেশি হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ কৃষি ঋণ চালু করার পর কৃষিকে আধুনিকায়ন করার বিষয়টিতে মনোযোগী হন। তিনি পতিসর ও শিলাইদহে সমবায় ভিত্তিক কিছু কৃষি খাবার গড়ে তোলেন। সেই সময় সমবায় ভিত্তিক গড়ে উঠা কৃষি খাবারগুলোতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হতো। সমবায় ভিত্তিক খাবারে চাষাবাদের জন্য তিনি ট্রাক্টরের ব্যবস্থা করেছিলেন। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের শুধু মৌসুমি ফসলের ওপর যাতে নির্ভর করতে না হয় সেই বিষয়টিও তিনি বিবেচনায় নিয়েছিলেন। হাঁস মুরগি গরু ছাগল পালনের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। কৃষকদের চাষাবাদের জন্য সেচ ব্যবস্থাটি ছিল প্রকৃতিনির্ভর। অর্থাৎ বৃষ্টি হলে সেচ না হলে খরায় শস্য উৎপাদন হতো না। এই সেচ ব্যবস্থার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ছোট ছোট খাল পানি ধরে রাখার জন্য বাঁধ নির্মাণ, ফসলের মাঠে মাঝখানে পরিখা খনন এবং অসংখ্য জলকূপ তৈরি করার ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রনাথের এই উদ্যোগের ফলে সেই সময় কৃষকদের ফসল উৎপাদন বেড়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত কৃষি ঋণের ফলে মহাজনী কুঋণের বলয় থেকে কৃষকরা মুক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের প্রথম উদ্যোক্তা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থাটি ছিল গরিব ও প্রান্তিক কৃষকবান্ধব। বাংলাদেশে বর্তমান অর্থনীতি বিষয়টি পড়ানোর সময় রবীন্দ্রনাথের এই ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থাটি পড়ানো হয় না। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের উদ্যোক্তা হিসেবে দেখা হয় ড. ইউনুসকে। ড. ইউনুসের ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ মুনাফাভিত্তিক একটি ব্যবস্থা। ইউনুস প্রবর্তিত ক্ষুদ্র ঋণের সুদ হিসাব করা হতো ফ্লাট রেটে। যা মহাজনী সুদের চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর। ফ্লাট রেটের ১২ হার সুদের হিসাবটা সরল সুদের হিসাবে স্থানান্তর করা হলে তা দাঁড়ায় ৩৪ শতাংশে। ড. ইউনূস প্রবর্তিত ক্ষুদ্র ঋণ কোনো অবস্থাতেই দরিদ্রবান্ধব ঋণ ব্যবস্থা হতে পারে না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পাঠ্য বিষয় গরপৎড় ভরহধহপব ্ বহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎ এর একটি অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথের ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থাটি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। রবীন্দ্রনাথ ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থাকে সেই সময় সরল সুদে কৃষকবান্ধব করে তৈরি করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি জন্য গবাদি পশু চাষ এবং সমবায়ভিত্তিক খাবার গড়ে তুলেন। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের অর্থনীতির জন্য রবীন্দ্রনাথ যে উদ্যোগটি গ্রহণ করেছিলেন তা কিন্তু দেখা হয় না আলোচিত হয় না। তাই রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক গৃহীত অর্থনীতির কার্যকলাপটি জনসম্মুখেও আসে না। রবীন্দ্রনাথের গৃহীত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করলে কৃষি এবং কৃষকের অবস্থাটা এতটা খারাপ হতো না। ১৯৪৭ সালে কথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের পর পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্র নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফলে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রবর্তিত অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। সৃষ্ট পাকিস্তানের নব্য ধনীরা মহাজনী প্রথাটি আবার ব্রিটিশ কায়দায় পূর্ব বাংলার কৃষকের ওপর চালু করে। এর ফলে হারিয়ে যায় পতিসর ও শিলাইদহ পরগনায় খাবার, কৃষিঋণ এবং কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির প্রচলন।

সুতরাং রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্যের সৃষ্টি করেন নাই, তিনি একজন অর্থনীতিবিদ এবং আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তকও ছিলেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়