মোদীর আসন বারাণসী করোনায় বিপর্যস্ত, মানুষ বিক্ষুব্ধ

আগের সংবাদ

অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীরা

পরের সংবাদ

শিক্ষাবর্ষ বৃদ্ধি

শিক্ষা খাতে ক্ষতির সমাধান হতে পারে

মাছুম বিল্লাহ

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

প্রকাশিত: মে ৫, ২০২১ , ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ৪, ২০২১ , ৯:৫৪ অপরাহ্ণ

এ বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা গত বছর দশম শ্রেণিতে মাত্র তিন মাস ক্লাস করতে পেরেছে। তারপর থেকে বিদ্যালয়ের পথ ও দরজা দুটিই বন্ধ। বিদ্যালয় খোলা থাকলে যেমন ক্লাস হয়, তেমনি বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ক্লাসের পাশাপাশি বাসায়ও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ে। প্রাইভেট টিউটররাও লকডাউনের কারণে বাসায় আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না অর্থাৎ পড়াশোনা তার স্বাভাবিক গতি থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২৩ লাখ পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। কিন্তু কবে কী হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই, কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তরও নেই। শিক্ষা বোর্ড থেকে জানানো হয় যে, বিদ্যালয় খুলে দেয়া হলে ৬০ কর্মদিবস ক্লাস নেয়া হবে। তারপর ১৫ দিন সময় দিয়ে পরীক্ষা নেয়া হবে। সব মিলিয়ে আগস্টের শেষে মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রস্তুত করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। এ সিলেবাস সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাকি পাঠানো হয়েছে। এসএসসির আগে যদিও শিক্ষার্থীরা দুটি পাবলিক পরীক্ষা দিয়েছে, তারপরও তুলনামূলকভাবে এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এ পরীক্ষার পর তারা কলেজে প্রবেশ করবে। জীবনের টার্ন এটি। তাই এই পরীক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই উদ্বেগের মধ্যে থাকে। শিক্ষার্থীরা সাধারণত শিক্ষকদের সংস্পর্শে থাকে, শিক্ষাবিষয়ক তথ্যাবলি আদান-প্রদান করে শ্রেণিকক্ষে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে। কিন্তু এবার সেই সুযোগ এখনো হয়নি। অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষকদের কিছুটা পাওয়া গেলেও তা যেমন যথেষ্ট নয় তেমনি গ্রামের শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টি এখনো সেভাবে পরিচিত নয়। এইচএসসি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার মতো পাবলিক পরীক্ষা ও বিদ্যালয়গুলোর ২০২০ সালের বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল করায় সারাদেশের প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী সিলেবাস শেষ না করেই ‘অটোপাস’ করে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত দেড় বছরের সেশনজট হয়েছে। শিক্ষার্থীদের লার্নিং লস কমিয়ে আনার জন্য শিক্ষাবর্ষকে জানুয়ারি-ডিসেম্বরের পরিবর্তে মে টু এপ্রিল কিংবা জুলাই টু জুন করা যেতে পারে। কোভিডের অবস্থা দেখে যদি আমরা ২৩ মে বিদ্যালয় খুলতে পারি তাহলে জুন টু মে একাডেমিক বর্ষ করতে পারি।

২৩ মে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো ঠিক আছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২৩ মে স্কুল-কলেজ ও ২৪ মে সরকারি-বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় খুলে দেয়া হবে। করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তার ওপর নির্ভর করবে সরকার ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী ২৩ মে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার কথা। শিক্ষাবর্ষ ২০২০-২১-এ অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, অনেকে আর বিদ্যালয়ে ফিরছে না, অনেকে পরিবারের সঙ্গে স্থানান্তরিত হয়েছে। তাদের আর বিদ্যালয়ে ফেরার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বিদ্যালয়ে ফেরানো দরকার। কী করতে হবে সে জন্য? প্রাথমিক থেকে সব স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝরে পড়া উপক্রম শিক্ষার্থী পরিবার চিহ্নিত করে তাদের আর্থিক সহায়তা বা সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ প্রদান করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা প্রদান ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি এবং ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার কথা ছিল, কিন্তু করোনার কারণে তা সম্ভব হয়নি। ৩০ মার্চ প্রতিষ্ঠান খুলে ৬০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি ও সমমানের জন্য ৮৪ কর্মদিবসের সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাবলিক পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসায় ছুটি আবার ২২ মে পর্যন্ত বাড়ানো হলো। কাজেই পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে দুটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেছি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কোন উপায়ে পড়ালেখা চলছে এবং কীভাবে পরীক্ষা হচ্ছে তা আমরা পর্যালোচনা করছি। তবে করোনার এ সময়ে কোনো দেশই সরাসরি পাবলিক পরীক্ষা নেয়নি। আর অনলাইনে সর্বোচ্চ এমসিকিউ পরীক্ষা নেয়া যায়; কিন্তু রচনামূলক নেয়া সম্ভব নয়। আমরা আরো কয়েকটি বৈঠক করে বিকল্প কী উপায়ে পড়ালেখা চালু রাখা যায়, সে ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পরামর্শ পাঠাব।’

করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় আরো বিলম্ব হলে অনলাইন কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কয়েকটি ক্যাচমেন্ট এলাকায় ভাগ করে একজন বা একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক, উচ্চতর শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আমাদের গ্রামের শিক্ষার্থীদের কাছে অজানা এক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে অনভিজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষকরাই হিমশিম খাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ কাড়তে। এর মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে আসক্তি। বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের অবস্থা করুণ কারণ গবেষণাগারে বিভিন্ন ব্যবহারিক পরীক্ষায় সম্পৃক্ত হতে হয় শিক্ষার্থীদের, সেটি কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে। তবে লেখাপড়ার মাধ্যমকে আমরা ডিজিটাল করতে পারলে, অনলাইন ক্লাস উপযোগী ডিভাইস শিক্ষার্থীদের হাতে দিতে পারলে এবং সঠিক মনিটরিং করা গেলে করোনার কারণে শিক্ষার বিপর্যয় অনেকটা কাটিয়ে ওঠা যেত এবং শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই যথাযথ পাঠ গ্রহণ করতে পারত। বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করার প্রস্তাব এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে, সেটি সরকারকে সক্রিয় বিবেচনায় নিতে হবে। তবে সেটি যে শুধু শিক্ষার স্বার্থেই ব্যয় হবে অন্য কাজে নয় বা শিক্ষার্থীরা নেটে বুঁদ হয়ে থাকবে না তার একটি মনিটংয়ের ব্যবস্থাও সেখানে থাকতে হবে। শিক্ষা সচিব বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমরা পাঠদান অব্যাহত রেখেছি। হয়তো সবার কাছে পৌঁছাতে পারছি না। তবে সেই সংখ্যাও খুব একটা বেশি নয়। যদি একজনের কাছেও আমরা পৌঁছাতে না পারি সেটাও আমরা গুরুত্ব দিতে চাই। যাদের আমরা বিকল্প লেখাপড়ার মধ্যে আনতে পারিনি তাদেরও আনতে চাই। আমরা এজন্য গ্রামভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করতে চাই। কেননা ঢাকা শহরে যে অ্যাকসেস আছে সেটা গ্রামে নেই। আবার সেখানে আরেকটা আছে সেটা শহরাঞ্চলে নেই। সেটা হচ্ছে ঢাকার মতো করোনার সংক্রমণ নেই। এটি আমরা কাজে লাগাতে চাই। তাদের আমরা একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে আনতে চাই। সচিব চমৎকার কথা বলেছেন। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান দুটি খাতের একটি হচ্ছে স্বাস্থ্য আর অপরটি শিক্ষা। আসন্ন বাজেটে এসব খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট তৈরি করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি দেখা যায় কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দেখা যায় না। এই ক্ষতি পোষাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতোমধ্যে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির কাজ সরকার শুরু করেছে। আগামী জুন পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষ প্রলম্বিত এবং সেপ্টেম্বরে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রস্তাব করা হয় এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য দু-তিন বছরের পরিকল্পনা করতে হবে। আর সারাদেশে একসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুলে ধাপে ধাপে খুলতে হবে।

জোড়াতালি দিয়ে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে কতটা ভূমিকা রাখছে সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সত্যিকার অর্থেই যদি লেখাপড়ার মাধ্যমকে আমরা ডিজিটাল করতে, অনলাইন ক্লাস উপযোগী ডিভাইস শিক্ষার্থীদের দিতে এবং সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ মনিটরিং নিশ্চিত করতে পারতাম তবে শিক্ষার বিপর্যয় অনেকটা কাটিয়ে ওঠা যেত। তাহলে শিক্ষার্থীরাও ঘরে বসে যথাযথভাবে পাঠ গ্রহণ করতে পারত। করোনার কারণে গত বছর অটোপ্রমোশন দেয়ায় বড় ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার্থীদের, এবার এটি করা যাবে না। বিশাল অঙ্কের শিশু ও তরুণ মানসিক চাপ ও শঙ্কার মধ্যে আছে। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত, সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক চাপ ও পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ায় তারা হতাশায় ভুগছে। এ মহামারির পর সারা পৃথিবীতে প্রায় এক কোটি শিশু আর বিদ্যালয়ে ফিরবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এর মধ্যে একটি অন্যতম দেশ। তাই শিক্ষার্থীদের বইয়ের সংস্পর্শে রাখার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এটি ঠিক যে, শিক্ষার্থীরা সরাসরি পাঠ্যপুস্তক কম পড়েছে বা সরাসরি শিক্ষকের ক্লাস করতে পারেনি তবে তারা অন্য ধরনের স্কিল বা দক্ষতা অর্জন করেছে। অনলাইন ক্লাস, ইউটিউবের ক্লাস, ফেসবুক, মেসেঞ্জারের মাধ্যমে দুনিয়ার খোঁজখবর রাখা, এগুলোর নানামাত্রিক ব্যবহার যা এই কম্পিউটারাইজড বিশে^ মৌলিক শিক্ষা এবং সারভাইভিং স্কিল বলে পরিচিত। তবে এ বিষয়টি ঘটেছে অনিয়মতান্ত্রিক এবং বৈষম্যমূলক পন্থায়। এই বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন।

মাছুম বিল্লাহ : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়