অভিনন্দন মমতা ব্যানার্জি

আগের সংবাদ

মুজাফরাবাদ গণহত্যা

পরের সংবাদ

বহতা ভৈরব নদ প্রাপ্তিতে করণীয়

এম আর খায়রুল উমাম

সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

প্রকাশিত: মে ৪, ২০২১ , ১২:০২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ৪, ২০২১ , ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

খুলনা বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদ ভৈরব। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবতা শিবের রুদ্রমূর্তি রূপ ভৈরব। এককালে শিবের রুদ্র রূপের মতো প্রমত্তা ছিল ভৈরব। তারপরও ভৈরবের তীর ধরে জনপদ জেগে উঠেছে। নদীর কোল ঘেষে মেহেরপুর, দর্শনা, কোর্টচাঁদপুর, চৌগাছা, বারোবাজার, বারীনগর, যশোর, বসুন্দিয়া, নওয়াপাড়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, খুলনাসহ আরো অনেক জনপদ গড়ে উঠেছে। এই জনপদগুলোতে কত মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি-শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার জড়িয়ে আছে। কত ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। প্রতিটা জনপদ এক একটা বৈশিষ্ট্য নিয়ে খ্যাত। নদের পথ ধরে কত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়িক মানুষের আগমন ঘটেছে। জনপদে থাকা অনেক মানুষ নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করে এলাকাকে গৌরবান্বিত করেছেন।
কালের বিবর্তনে মনুষ্য সৃষ্ট বিভিন্ন কার্যকারণে এককালের ভয়ঙ্কর ভৈরব তার ঐতিহ্য হারাতে হারাতে নিজের রূপই হারিয়ে ফেলেছে। মেহেরপুরের সুবলপুরে মাথাভাঙ্গা নদী থেকে বের হওয়া উৎসমুখ অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছে। বসুন্দিয়ার আফ্রা থেকে নদ এখনো বহতা আছে, জোয়ার-ভাটা খেলে, বিস্তৃতি অনেকটা আছে তবে তা অতীতের রূপ কি না জানি না। ভৈরব নদের তীরজুড়ে ওঠা জনপদের মানুষ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নদ সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করে চলেছে। মানুষ পরিবেশ সচেতন হওয়ার পর থেকে আন্দোলন শুধু বেগবান নয়, গণআন্দোলনের রূপ নেয়। দলে দলে মানুষ বহতা ভৈরব দেখার দাবিতে সংঘবদ্ধ হয়। এতে করে সংশ্লিষ্টদের অনেকে নিজেদের মতো পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, প্রকৌশল বিভাগ সবাই নিজেদের পরিকল্পনা মতো নদ সংস্কারে উচ্চমহলে দাবি করেন, প্রকল্প প্রেরণ করেন। কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসূ হয়েছে এমন দাবি করা যাবে না। এলাকার মানুষের আন্দোলনের পথ ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোরের জনসভায় ভৈরব সংস্কারের ঘোষণা দেন। শুরু হয় সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরির কাজ। কেটে যায় আরো পাঁচটি বছর। এলাকার মানুষের বহতা ভৈরব নদের দাবি পূরণে ২৭২ কোটি টাকার প্রকল্প হয়। ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’। এই প্রকল্পের আওতায় তাহেরপুর থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার নদ খনন করা হবে। মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে আপার ভৈরবের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য ৩৩ কিলোমিটার খনন করা হবে।
ভৈরব তীরের মানুষদের দাবি বহতা নদের স্বপ্নপূরণে এই প্রকল্প কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে না তা প্রকল্পের নামটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও এলাকার মানুষের দাবি পূরণের কোনো দায় পরিকল্পকদের আছে বলে মনে হয় না। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান এখানে তাদের ইচ্ছাই মুখ্য। আমাদের রাজনীতিতে প্রযুক্তি চিন্তা না থাকার কারণে ক্ষমতার বৃত্তে অবস্থানকারী মানুষরা পরিকল্পনার অন্তর্নিহিত বিষয় দেখার চেষ্টা না করেই প্রকল্প অনুমোদন করে থাকেন। আর সংশ্লিষ্ট পেশজীবীদের অনেকেই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যেখানে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সীমিত। ফলে এদের মধ্যে প্রায়শই চিন্তার সীমাবদ্ধতা দেখতে পাওয়া যায়। এহেন মানুষরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব¡ প্রমাণে দেশ ও জাতির কল্যাণে যত প্রকল্প উপহার দিয়েছেন শেষ বিচারে তা ফাঁদ হিসেবে জনগণের গলায় ফাঁস হয়ে গিয়েছে। এই প্রকল্পেও নদ খনন হবে, ২৭২ কোটি টাকা ব্যয় হবে, শাসক শ্রেণিসহ সংশ্লিষ্টরা আপ্লুত হবেন, কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২১ সালের জুনে অথচ চলমান অবস্থায়ই যে নদের রূপ ফেরাতে ব্যর্থ সেরূপ প্রয়াস সর্বত্র ফুটে উঠেছে। আমাদের পেশাজীবীরা রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়ার ফলে পেশা গৌন হয়ে পড়েছে। পেশার উন্নয়নে তাদের কোনো ভূমিকাই দেখা যায় না। পেশাজীবীরা পেশার চেয়ে রাজনৈতিক দলের সেবায় বেশি নিয়োজিত। ফলে অধিকাংশ প্রকল্পই জনকল্যাণে সহায়ক হচ্ছে না।
সারা বিশ্বে এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে কি না জানি না সন্দেহ, যে নদীর উৎস মুখে পানির নিশ্চয়তা না থাকলে নদী বহমান হতে পারে বলে বিশ্বাস করে। আমাদের দেশে সরকার একটার পর একটা নদী সংস্কার করছে, যা কিছুদিনের মধ্যে আবার আগের রূপ ধারণ করছে। অবধারিতভাবেই নতুন করে প্রকল্প তৈরি করে কয়েক বছর পর দ্বিতীয়বার আবার খননকাজ চলে। ভৈরব সংস্কারেও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। এখনই নদ খননের মাটি তীরে রাখার ফলে প্রথম বর্ষায় তা নদে ফিরে গিয়েছে, নদ পূর্বের মতো কচুরিপানায় ভর্তি হয়ে গিয়েছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার একাধিক সংবাদে তা প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ দেখছে কীভাবে ভাটি থেকে উজানের খনন চলছে। এ যেন টবের মাটিতে গাছ পরিচর্যার মতো করে ভাটির পানিতে নদ রক্ষার প্রয়াণ। শোনা যাচ্ছে মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরবের সংযোগ রক্ষার জন্যও খনন করা হবে। এই সংযোগ সৃষ্টি করতে যারা খনন করবেন তারা কি বলতে পারবেন পদ্মা নদীর পানি মাথাভাঙ্গা নদীতে প্রবেশ করার মতো অবস্থা আছে কি না? সাধারণ অবস্থায় পদ্মার পানি মাথাভাঙ্গা নদীতে প্রবেশ করে না। আর এখন তো বর্ষা মৌসুমেও পানি প্রবেশ করতে পারে না।
ভৈরব নদের উৎস মুখে পানির নিশ্চয়তার জন্য পদ্মা ব্যারেজের বিকল্প নেই। একমাত্র পদ্মা ব্যারেজ করে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলেই গড়াই ও মাথাভাঙ্গা নদীতে পানি প্রবেশ নিশ্চিত করা যাবে। ফলে এই অঞ্চলের সব নদ-নদী রক্ষা সম্ভব হবে। ব্যারেজের গুরুত্ব পানি সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট-বড় সব নদীই ফারাক্কার প্রভাবে মৃত প্রায়। যদিও শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়ার আশায় নদীগুলো খনন করা হচ্ছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমের তোলা পানিই ভরসা। প্রায় সব নদ-নদী পদ্মা নদী থেকে যোজন যোজন দূর পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন। সার্বিক বিবেচনায় পদ্মা সেতুর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পদ্মা ব্যারেজের হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর প্রকল্পটি আলোচনার টেবিলেই পড়ে আছে। প্রকল্প আছে, প্রকল্প পরিচালক আছে, নেই শুধু প্রকল্পের বাস্তবায়ন। তবে পদ্মা ব্যারেজের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিস্তা ব্যারেজের মতো ভুল যেন না হয় সেদিকেও লক্ষ্য দেয়া প্রয়োজন। মাথাভাঙ্গা আর গড়াই নদীতে পানি প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রকল্পের বেশি সুবিধা যাতে নিজেরা যাতে ভোগ করা যায় তেমন বিচার বিবেচনা করেই স্থান নির্বাচন জরুরি।
বাংলাদেশে ক্রমশ নদ-নদী মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, স্রোতের গতি হারিয়ে যাচ্ছে। নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য ও পশুসম্পদ, শিল্প-কারখানা, বাণিজ্য, জীববৈচিত্র্য পুরাপুরি বিপন্ন এবং বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে প্রতিবেশী দেশ পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে শীতকালে নদীর পানি বিপজ্জনক মাত্রায় নিচে নেমে যায়। বসুন্দিয়ার আফ্রা থেকে ভৈরব নদের পূর্ব রূপ এখনো দেখা যায়। আফ্রা খালের সঙ্গে সংযোগের ফলে কিছু পানির প্রবাহ নিশ্চিত হওয়ার কারণে বোধ করি নদ এহেন রূপ দেখা সম্ভব হয়। বিষয়টা নদী গবেষকরা বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখতে পারেন। এভাবে আমাদের ছোট-বড় নদীর মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করা হলে যদি প্রবাহ পাওয়া যায় তবে নদী রক্ষা করা সহজ হয়ে যাবে।
ভৈরব নদ সংস্কার করতে গিয়ে সর্বোচ্চ ৪০ মিটার ও সর্বনিম্ন ৩০ মিটারের চ্যানেল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যদিও সে পরিমাণ জমি সর্বত্র পাওয়া যায়নি। আদিকালের ভৈরব নামটির যদি ন্যূনতম সার্থকতা থাকে তবে নদ সংস্কারের সময় ৩০ মিটার চ্যানেলের তৈরির জন্য জমি সংকট হওয়ার কথা নয়। কে বা কারা এ সংকট সৃষ্টি করেছে তা দেখার বা বলার কোনো অধিকার সাধারণ মানুষের নেই। সরল বিশ্বাসে কৃতকর্ম কোনো অপরাধ নয়, প্যানেল কোডের এ কথা জেনেই দেশব্যাপী সার্ভের মধ্য দিয়ে জনগণের সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়। ইতোমধ্যেই নদের একটা বড় অংশ দখল হয়ে গিয়েছে এবং এখনো সে প্রক্রিয়া চলমান। যে কোনো নদীকে যদি তার আদিরূপ ফেরত দেয়া যায়, উৎসে পানির নিশ্চয়তা দেয়া যায় তাহলে নদী তার চলার পথ নিজেই করে নেয়। এখানে দখল কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এটাও হয়তো সংশ্লিষ্টদের নদীকে বহতা না করার অন্যতম কারণ। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ভৈরব নদসহ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া সব নদী বহতা হোক, জোয়ার ভাটা খেলুক। জনগণের কষ্টার্জিত করের শত-সহস্র কোটি টাকার সদ্ব্যবহার করে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ বা সেচ সুবিধা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নয়, বহতা নদ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হোক।

এম আর খায়রুল উমাম : সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়