পাঞ্জাব কিংসের কাছে পাত্তা পেল না ব্যাঙ্গালোর

আগের সংবাদ

মহান মে দিবস আজ: করোনায় বাড়ছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য

পরের সংবাদ

শিক্ষা খাতে অপূরণীয় ক্ষতি

প্রকাশিত: মে ১, ২০২১ , ৯:২২ পূর্বাহ্ণ আপডেট: মে ১, ২০২১ , ৯:২২ পূর্বাহ্ণ

নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে দেশের শিক্ষা খাত। কীভাবে এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসা যাবে, তার রূপরেখাও তৈরি করতে পারেনি শিক্ষা প্রশাসন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় এ সংকট আরো তীব্র হয়েছে। সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘জগাখিচুড়ি’তে পরিণত হয়েছে দেশের শিক্ষা খাত। এর খেসারত দিচ্ছে দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী। এমনকি করোনায় শিক্ষা খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তারও কোনো পরিসংখ্যান নেই শিক্ষা প্রশাসনের কাছে। বিশ্লেষকদের মতে, করোনার কারণে শিক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যক্রম দরকার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের মধ্যে তেমন প্রস্তুতি বা উদ্যোগ দেখছেন না তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে দফায় দফায় বিধিনিষেধ কিংবা লকডাউন দিচ্ছে সরকার। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে গত ১৩ মাস ধরে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমন আছে, তাও জানা যাচ্ছে না। শিক্ষা প্রশাসনের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২৩ মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, তা এখনো শিক্ষা প্রশাসনের কাছে নেই। এর আগে গত ফেব্রæয়ারিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়ে বলেছিল, স্কুল ভবনগুলো ঝাড়পোছ করে রাখতে। এরপরে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি মাউশি।
অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমেদ বলেন, করোনা কতদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে, তা আমরা জানি না। এরই মধ্যে আমাদের ক্ষতি হয়েছে, এটি যদি আরো অগ্রসর হতে থাকে তাহলে আমাদের ক্ষতি আরো দীর্ঘায়িত হবে। তিনি বলেন, অভিভাবকদের পারিবারিক অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী

হয়তো শিক্ষায় যেতে পারছে না। আর হয়তো পারবেও না। তারা কাজে নিয়োজিত হয়ে গেছে। কীভাবে তাদেরকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি, সে বিষয়ে বাস্তবতা যদি না জানি তাহলে সম্ভব নয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন শিক্ষাবিষয়ক একটি সংলাপে যোগ দিয়ে বলেন, করোনা যেসব ক্ষেত্রে আঘাত করেছে, তার মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। শিক্ষার ক্ষতিটা কিন্তু নীরবে হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষতিটা আমরা নিরূপণ করতে পারছি না। এখন এই ক্ষতি পূরণে যা পরিকল্পনা করা দরকার, তা নিয়ে কাজ করছি। কবে নাগাদ আমরা এই ক্ষতির উত্তর পাব, তাও বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, এটা ঠিক ক্ষতি পোষাতে আমাদের কাছে যত রকম বিকল্প ছিল, আমরা তা ব্যবহারের চেষ্টা করেছি। ক্ষতি পোষাতে আমরা চেয়েছি, তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ক্ষতি পোষাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে আমরা সব শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছতে পারছি না। হয়তো একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছি। যাদেরকে আনতে পারছি না, তাদের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছি।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, স্কুল খোলার পরই সিলেবাস কাটছাঁট করা হবে। চলতি বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও আগস্টের পর থেকে পরীক্ষাগুলো নিতে চায় শিক্ষা বোর্ড। কিন্তু গত ১৩ মাসে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে কী শিখল, কোথায় ঘাটতি থাকল, তার কোনো গবেষণাও নেই। এমনকি গত ডিসেম্বরে শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জন্য যে অ্যাসাইনমেন্ট-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিল, সেটিও এখন বন্ধ আছে।
এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের অনীহা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমেছে। বেড়েছে ঝরে পড়ার সংখ্যা। যদিও শিক্ষা প্রশাসন বলছে, অনলাইন ক্লাস, টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচারিত ক্লাসের ফলে পড়াশোনা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও নেই। হাতেগোনা যায় এমন কিছু শহরে অভিভাবক তার সন্তানদের ব্যয়বহুল অনলাইন ক্লাস করিয়েছেন।
জানতে চাইলে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে চৌধুরী গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, করোনায় শিক্ষা খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পোষাতে হলে তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা না নিলে আরো হোঁচট খেতে হবে। তিনি বলেন, ২৩ মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার কথা বলা হলেও আমরা এখনো জানি না কোথায়, কী পরিস্থিতি। অর্থাৎ সংক্রমণ বেশি কোথায়, কম কোথায়? ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণের হার জেনে কারিগরি কমিটির পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে পরীক্ষামূলকভাবে স্কুল খুলে দেয়া যেতে পারে।
একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা বলেছেন, অন্তত আরো কিছুদিন এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় চলাচলে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। আর এই সময়ে স্কুলগুলোকেও ধীরে ধীরে খুলে দেয়া উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিশোরগঞ্জের সরকারি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেছেন, সব দিনে সব ক্লাসের শিক্ষার্থীদের স্কুলে না এনে একেক দিন দুটি করে ক্লাসের শিক্ষার্থীদের স্কুলে এনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে এমন প্রস্তাবনা তারা পাঠালেও সেটি নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে তিনি জানান।
এ প্রসঙ্গে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, স্কুল খোলার ক্ষেত্রে এ পরিকল্পনা খুবই উত্তম। কিন্তু শিক্ষা প্রশাসন এ বিষয়ে কিছু জানাচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এবার কত শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে তাও আমরা জানি না। শিক্ষা প্রশাসনতো ভর্তির হার জানে, তবুও কেন বলছে না? তিনি বলেন, এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার্থীদেরকে দুপুরের খাবার দেয়াসহ উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। নতুবা আরো বহু শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে।
খাগড়াছড়ি মীনা নামের নবম শ্রেণির একজন ছাত্রী জানায়, করোনার কারণে এক বছর ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ালেখার কিছু ক্ষতি হয়েছে। স্কুলে যেতে পারছি না। সাজেশন্সও পাচ্ছি না। অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে। আমাদের স্মার্টফোন না থাকায় সে ক্লাসেও যোগ দিতে পারছি না। রাজধানীর মিরপুর ইউসেপ টেকনিক্যাল স্কুলের ছাত্রী তামান্না নাসরিন বলেন, অনলাইনে ক্লাস হলেও আমরা প্র্যাকটিক্যাল করতে পারছি না। ফোনের মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছি। কিন্তু তাতেও সমস্যা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, অনলাইনে ক্লাস হলেও প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা তা নিতে পারছে না। সবকিছুর পরও শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকলে শিক্ষার্থীর শিক্ষাটা আসছে না। টেলিফোনে যে পড়াটা দিচ্ছি, তাতে তারা কুলিয়ে উঠতে পারছে না। আমরা তো মূলত স্কুলে শেখাই। অনলাইনে তো তা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে যে রকম শিখন ফল আসা প্রয়োজন, তা হচ্ছে না। একই সঙ্গে মূল্যায়নও করা যাচ্ছে না।
এর আগে গত ২৫ মার্চ করোনা ভাইরাস-সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির বৈঠক শেষে ২৩ মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে এবং কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির পরামর্শক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামী ঈদুল ফিতরের পর ২৩ মে ক্লাস শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এই সময়ে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহŸান জানান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর গত ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। এমনকি গত ১ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত রাখা হয়। এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সংক্ষিপ্ত সিলেবাসেই এসএসসি পরীক্ষা, প্রস্তুত শিক্ষা বোর্ড : করোনার থাবায় এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে এরই মধ্যে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেয়ার সব প্রস্তুতি শেষ করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। কিছুদিন আগে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুসারেই প্রশ্ন করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার্থীদের ৬০ দিন ক্লাস করিয়ে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা আয়োজন করবে শিক্ষা বোর্ডগুলো। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ঈদুল ফিতরের পর ২৩ মে থেকে স্কুল-কলেজের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা আছে।
এসএসসির প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড সাবকমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, পরীক্ষা নেয়ার সব প্রস্তুতি আমরা শেষ করেছি। এরই মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। পরীক্ষার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতেই হবে। যেহেতু এটি একটি পাবলিক পরীক্ষা। সরকার ঘোষণা দিলে ১৫ দিনের মধ্যেই পরীক্ষা নিতে পারবে শিক্ষা বোর্ডগুলো, সে রকমভাবেই প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পরীক্ষার প্রশ্ন কোন সিলেবাসে করা হয়েছে, জানতে চাইলে বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, পরিমার্জিত সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুসারেই প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। আমাদের প্রস্তুতি শেষ। এখন পর্যন্ত স্কুল খুললে ৬০ দিন ক্লাস করিয়ে পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনা আছে।
জানা গেছে, এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ হয়ে গিয়েছে। তবে কিছু শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ বাকি আছে। করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ রোধে দেয়া লকডাউন পরিস্থিতি শেষ হলে আবার শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর ৬০ কার্যদিবস ক্লাস করিয়ে এসএসসি পরীক্ষা নেয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আসা সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ২৩ মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা আছে। তা সম্ভব হলে আগস্টে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়