উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ এবং মোকাবিলার কৌশল

আগের সংবাদ
ড.-রাহমান-নাসির-উদ্দিন

কিছু মানুষ কেন ভাইরাসের পক্ষে?

পরের সংবাদ

পশ্চিম শেষে পূর্বে

বাঁচার জন্য মৃত্যুকেই আলিঙ্গন?

ফারুক যোশী

কলাম লেখক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২১ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৩০, ২০২১ , ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

‘টুর্নামেন্টের মাঝপথে এসে একের পর এক খেলোয়াড় হারাচ্ছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ক্রিকেট। গত ৯ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টুর্নামেন্টে এরই মধ্যে হয়ে গেছে ২০টি ম্যাচ। এরই মধ্যে আইপিএলে যোগ দিয়েও ছেড়ে গেছেন পাঁচ ক্রিকেটার। এ তালিকায় নাম লেখানোর সবশেষ দুই ক্রিকেটার হলেন অস্ট্রেলিয়ান পেসার কেন রিচার্ডসন এবং লেগস্পিনার অ্যাডাম জাম্পা। তারা দুজনই রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরুর। ক্রীড়া সমালোচকরা যেভাবেই দেখুন না কেন, এদের ছেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত করোনা। করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে সারা ভারতে। সোমবারও তিন হাজার মানুষ মারা গেছেন এ মহামারিতে। অক্সিজেন সংকট, হাসপাতালে জায়গা নেই। রাস্তায় মরছে মানুষ। হৃদয় বিদীর্ণ করা এ চিত্রগুলো। ভারত সরকার তাদের এ বিশাল দেশের মানুষ মহামারিতে শুধু দিশাহারাই নয়, যেন সমুদ্রের মাঝে ভাসছে আর ভাসতে ভাসতে হঠাৎ করেই এককজন ডুবে যাচ্ছে দ্রুত, খুব দ্রুত। এ সংকট সমাধানে ভারত সরকার হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু এরপরও সেখানে নির্বাচনগুলো স্থগিত ঘোষণা করা হয়নি। মৃত্যুর কাছে বাণিজ্যই যেন প্রধান, তাই মহামারি আর মৃত্যুর মাঝে আইপিএল অর্থাৎ ক্রিকেট আয়োজন বন্ধ করা হয়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও বাড়ছে এ মহামারি। আতঙ্কের মাঝে আছে বাংলাদেশ। গত বছরের তুলনায় এবার বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ আরো ভয়াবহ। কিন্তু মানুষ যেন ভীত নন। সরকার লকডাউন ঘোষণা করেছে। কিন্তু এ নিয়ে জনগণ আর প্রশাসন বিশেষত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বেগ পেতে হচ্ছে লকডাউন সামাল দিতে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের কাজ করছে। গত ক’দিন আগে ডাক্তার-ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ তর্কাতর্কি দেখেছে লাখো-কোটি মানুষ। কেউ কাউকে ছাড় দেননি। বরং টেনে এনেছেন তাদের পিতার বীরত্বের ইতিহাস। কোনো কারণ ছাড়া এ ইতিহাস টানতে গিয়ে তাদের পেশাগুলোর প্রতি তারা খুব একটা সম্মান দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে এ-ও আমরা দেখেছি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে শ্রমজীবী মানুষদের মারধর করছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বনগুলো (যানবাহন) ভেঙে দিচ্ছেন। লকডাউন মেনে ঘরে অবস্থান করাটা এ সময়ে সব নাগরিকেরই প্রধান দায়িত্বের মাঝে পড়ে। নিজেকে সুরক্ষা দিতে, পরিবার, প্রতিবেশী তথা রাষ্ট্রকে বাঁচাতে এ লকডাউনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক কি এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে, এ প্রশ্নটি খুব যৌক্তিক কারণেই আসতে পারে। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের কি সেই ক্ষমতা আছে? সরাসরি উত্তর হয়তো আসতে পারে, সে ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। কিন্তু সত্যি কথা হলো, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হচ্ছে কয়েক বছরের মধ্যেই। এ সূচকে পৌঁছাতে বাংলাদেশ তার জিডিপি, জিএনপি (মাথাপিছু গড় আয়), জন্ম-মৃত্যু, শিক্ষা প্রভৃতিতে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন, সাফল্য। স্কুল এমনকি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে তাদের আর্থিক সহযোগিতা নিয়মিতভাবে। তারা পেয়ে যাচ্ছে এগুলো তাদের অভিভাবক কিংবা নিজেদের কাছে। লাখো গৃহহীন মানুষ ঘর পাচ্ছে, কৃষিতে আনা হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। সুতরাং বাংলাদেশ মাত্র একটি মাস কিংবা দুটি মাস শ্রমজীবী মানুষ কিংবা মহামারিতে বিপর্যস্ত হওয়া মানুষগুলোকে প্রণোদনা ঘোষণা করে তাদের পরিবারের মাঝে আর্থিক সহযোগিতা পৌঁছে দিতে পারবে বলেই আস্থা রাখা যায়।

ভ্যাকসিন প্রদান শ্লথ হয়ে গেছে, অথচ এ সময়ে তা অত্যন্ত জরুরি। ভারতের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা মানে সংকট বৃদ্ধি করা। কারণ খুবই যৌক্তিক কারণে তারা নিজেরাই এখন সংকটে। এ অবস্থায় পৃথিবীর অন্য দেশগুলো দিয়েই এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ভ্যাকসিন নিয়ে একটা ধর্মীয় বাতাবরণ সৃষ্টি করা হয়েছিল বাংলাদেশে এবং ভারতেও। বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল। এক ধরনের ইসলামিক মৌলবাদীরা ভ্যাকসিনে জন্তু-জানোয়ারদের ফ্যাট কিংবা জিন পরিবর্তনের জিনিস বিদ্যমান বলে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে নসিহত করেন, ঠিক তেমনি ভারতে এক ধরনের উগ্র হিন্দুধর্মীয় রাজনীতিবিদ গরুর মূত্রের ওপর ভরসা রাখতে আহ্বান করলেন, এমনকি নেতা-নেত্রীদের কেউ তা পানও করলেন, তা দিয়ে গোসল করলেন কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। বরং মহামারি হয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

আমেরিকা-যুক্তরাজ্য কিংবা ইউরোপের দেশগুলোতেও করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। কিন্তু জরুরি স্বাস্থ্য বিভাগের সেবাগুলো মানুষকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করত। লকডাউনে জনগণ খাদ্য সংকটে পড়েনি। সবকিছু বন্ধ থাকলেও মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সংকট খুব একটা হয়নি। লকডাউন মানে একটা দেশের মানুষকে স্বেচ্ছায় ঘরে অবস্থান করানোর জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আর এ উদ্যোগ রাষ্ট্রকে নিতে হলে প্রত্যেক পরিবারের কাছে অন্তত দিন পার করার মতো ন্যূনতম সামগ্রীর অর্থ প্রণোদনা দেয়া। একটা উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশ তা-ই করেছে ওই সংকটকালীন সময়ে। এই সংকটকালীন সময়ে এই দেশগুলোর ব্যবসায়ীরা আরো মুনাফা অর্জন করেছে। বিশ্বখ্যাত কোম্পানি আমাজন থেকে শুরু করে ব্রিটেনের সুপার মার্কেটগুলো বিশেষত আসদা-টেসকো প্রভৃতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা করেছে। কিন্তু তারা সংকট সৃষ্টি করে এ মুনাফা তৈরি করেনি। সরকারের ব্যবস্থাপনার কারণেই ওই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বরং নাগরিকদের আশ্বস্ত করেছে, অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি পায়নি। পণ্য সরবরাহে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়নি।

যুক্তরাজ্য-ইউরোপের বিশাল আয়োজন হলো তাদের ফুটবল। দেশগুলোর মানুষের মাঝেও উন্মাদনা আছে এ নিয়ে। বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন পাউন্ডের ব্যবসা কিংবা মুনাফা এ নিয়ে। মহামারি তাও নিষ্প্রাণ করে দিয়েছিল। মহামারি থেকে ক্রমেই যখন ব্রিটেন উঠে আসছিল, তখনই দর্শকহীন খেলার অনুমতি মেলে। খাঁ খাঁ করা মাঠে শূন্য গ্যালারিতে খেলা আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। ব্রিটেনে মৃত্যু এখন ক্রমে নিম্নগামী। সোমবার করোনায় মারা গেছেন দুজন মানুষ। এ কারণেই গত এক মাস থেকে লকডাউন শিথিল হয়েছে। আবারো প্রাণ এসেছে দেশটিতে। কিন্তু গত বছরে যে ভুল করেছিল বরিস জনসনের সরকার, সে ভুল এবারে যেন না হয় তার জন্য সর্বোচ্চ দিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু কমিয়ে এনেছে, সংক্রমণ দুই হাজারের কোঠায়। মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সপ্তাহে দুবার করোনা টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতে টেস্ট কীটগুলোও আছে। উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে নাগরিকদের, করোনার ব্যাপারে আরো সচেতন থাকার জন্য আহ্বান আছে, তবে করোনাকে ভয় করে বসে না থেকে অন্য রোগের ব্যাপারে সচেতন থাকতে জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা থেকে সতর্ক করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের শহরগুলোতে এখন যেন উৎসব লেগেছে। শহর-গ্রামের মোড়ে মোড়ে ভ্যাকসিন সেন্টার। লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন ভ্যাকসিন নিচ্ছে। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নাগরিক ভ্যাকসিনাইজেশনের আওতায় এসে গেছে। একটা সরকারের কাজ যদি হয় নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়া, তাহলে বরিস জনসন একা না, যুক্তরাজ্যের সরকার তা-ই করছে। প্রধানমন্ত্রী ঘুরছেন বিভিন্ন জায়গায়। কলকারখানায় গিয়ে শ্রমিক-কর্মকর্তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। যদিও এতে তিনি খুব একটা মিডিয়ার ফোকাস পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ এখন পর্যন্ত এই ভ্যাকসিন নেননি। দেখা গেছে, গত সপ্তাহ পর্যন্ত এ সম্প্রদায়ের প্রাপ্ত বয়স্কদের (৪৪ ঊর্ধ্ব) মাত্র ৪৩ শতাংশ মানুষ এ ভ্যাকসিন নিতে আসেন। অথচ ভ্যাকসিন প্রদান করতে রীতিমতো দোরগোড়ায় নিয়ে আসা হয়েছে ভ্যাকসিন সেন্টার। সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টার থেকে শুরু করে এমনকি কিছু কিছু মসজিদও ভ্যাকসিন প্রদানের অস্থায়ী সেন্টার হিসেবে কাজ করছে। ধর্মীয় ইমামরাও আহ্বান করছেন, ভ্যাকসিন গ্রহণ করার জন্য। আর সে জন্য এ দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ প্রশংসিত হচ্ছে। পৃথিবীর অন্যান্য জনমুখী সরকারও তা-ই করছে।

যুক্তরাজ্যে মৃত্যু ১ লাখ ২৮ হাজারের কাছাকাছি। সারা পৃথিবীতে করোনার থাবায় প্রাণ গেছে ৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের। এ থাবা এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ প্রতি বছর ভারতে যান চিকিৎসা নিতে অথচ সেই ভারতেই চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অস্বীকার করার কোনোই উপায় নেই, ভারতের মতো মহামারি ছড়িয়ে পড়লে অকল্পনীয় দুর্যোগ ঠেকাতে পারবে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ যেন ভারতের মতো মারির সমুদ্রে না ভাসে। আর তাই লকডাউন বাড়াতে হলে ভাতের নিশ্চয়তা দেয়ার বিকল্প নেই। নতুবা বাঁচার জন্য মানুষ শেষতক মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করবে।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়