শ্রমিকদের বেতন ও বোনাসের দাবি গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট্রের

আগের সংবাদ

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল থেকে দেশের আকাশে নিঃসরণ হচ্ছে মিথেন

পরের সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গে কে আসছে ক্ষমতায়, তৃণমূল না বিজেপি?

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২১ , ২:৫৯ অপরাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ৩০, ২০২১ , ৩:১৪ অপরাহ্ণ

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন শেষ। গণমাধ্যমে এখন চলছে বুথফেরত সমীক্ষা। যে যার মত করে আসন সংখ্যা বলছেন। কিন্তু ক্ষমতায় বিজেপি না তৃণমূল কংগ্রেস আসছে সেটি কোনো সমীক্ষাই জোর দিয়ে বলছে না। অধিকাংশ জরিপেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এরইমধ্যে তৃণমূল-বিজেপি দুই শিবিরই তাদের কলকাতা অফিসের ভোটের জয় উদযাপনের জন্য মণ্ডপ প্রস্তুত করে রেখেছে। তৃণমূল প্রস্তুত করেছে সবুজ আবীর এবং বিজেপি প্রস্তুত করেছে গেরুয়া আবীর।

তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে ভোটে লড়ছিলেন। একসময়ের তারই সেনাপতি শুভেন্দু অধিকারির কাছে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দোপাধ্যায় হেরে যেতে পারেন বলে সেখানকার বিশ্লেষকরা বলছেন। একাধিক বুথফেরত সমীক্ষায়ও মমতা বন্দোপাধ্যায় হেরে যাচ্ছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।

সেখানকার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে দেখা গেছে, সর্বভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বুথফেরত যে সমীক্ষা দেখানো হয়েছে তাতে বিজেপিকে এগিয়ে রেখেছে। আর পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক টেলিভিশনগুলোর বুথফেরত সমীক্ষাতে তৃণমূল কংগ্রেসকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যে সমীক্ষা প্রকাশ হয়েছে তাতে বিজেপিকে জয়ী বলে ঘোষণা করা হচ্ছে।

বুথফেরত সমীক্ষা বিশ্লেষণ করে একাধিক বিশ্লেষক বলেছেন, এটা ঠিক তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির দুই দলেরই অনেক হেভিওয়েট নেতা-নেত্রী নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারবেন না। অনেকে হয়ত জয়ের ব্যবধান নিয়েও অংক কষছেন। কিন্তু অনেক জায়গায় অপ্রত্যাশিত ফলাফল বেরিয়ে আসবে।

কলকাতার রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্কপ্রভ সরকার গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিজেপি আশা করেছিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলার মসনদ দখল করবে। বুথফেরত সমীক্ষায় দেখা গেছে, হয়তো সেরকম কিছু হবে না। তারা দেড়শ’র বেশি আসনে জিতে সরকার গঠন করতে পারে। ২৯৪টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য দরকার ১৪৮টি আসন।

তিনি বলেন, নন্দীগ্রামে ভোট পরবর্তী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারি যে মেরুকরণের তাস খেলেছিলেন সেটা সম্ভবত কার্যকর হতে যাচ্ছে। তার মতে, নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের চেয়ে শুভেন্দু অধিকারি একটু এগিয়ে রয়েছেন। সবসময় এ ধরনের পূর্বাভাস যে মেলে তা নয় তবে মেলার একটি সম্ভাবনা থাকে।

কলকাতার দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকার মুখ্য প্রতিবেদক রক্তিম দাস ভোরের কাগজকে বলেন, বিহারের নির্বাচনে যে বুথফেরত সমীক্ষা হয়েছিল তা মেলেনি। সেখানে দেখানো হয়েছিল বিজেপি ক্ষমতায় আসছে না। লালুপ্রসাদ ও কংগ্রেসের জোট ক্ষমতায় আসছে। কিন্তু ফলাফল বেরোনোর পর দেখা গেল, বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়ে তার জোটকে নিয়ে ক্ষমতায় এল। ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনে সবাই বলেছিল মোদি সরকার ক্ষমতায় আসতে পারবে না। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি তিন থেকে পাঁচটি আসন পাবে। কিন্তু সেখানে দেখা গেল মোদি সরকার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এল। একইসঙ্গে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসনে জিতে গেল এবং তিন/চারটি আসনে সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে থাকল। এবার বিধানসভা নির্বাচনের পরও যে বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল দেয়া হয়েছে তাও মিলবে না।

তিনি বলেন, বুথফেরত সমীক্ষাকে বিজ্ঞানসম্মত বলে মানা হয় না। তার কারণ, এ ধরনের সমীক্ষায় অল্পসংখ্যক মানুষের মতামত নিয়ে বহুসংখ্যকের মতামত বলে দাবি করা হয়। এক্ষেত্রে শাসক দলকে যারা ভোট দিয়েছে প্রকাশ্যে বলতে তাদের কোনো বাধা থাকে না। কিন্তু যারা শাসক দলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে তারা কখনই ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলে না। তাই বুথফেরত সমীক্ষা অনেকটা জোতিষির ভবিষ্যত বাণীর মত। মিলতেও পারে আবার নাও মিলতে পারে। বাংলায় প্রবাদ বাক্য, ‘ঝড়ে মরে বগা, কেরামতি বাড়ে ফকিরের’-অনেকটা এই ধরণের হয় বুথফেরত সমীক্ষা। তিনি বলেন, এবারের বুথফেরত সমীক্ষা বেরোনোর পর বিজেপি নেতাদের শরীরী ভাষায় জয়ের চিহ্নই ফুটে উঠছে। বিজেপির হেস্টিংস অফিসের বাইরে রীতিমত মন্ডপ তৈরি করা হচ্ছে আগামী বিজয় উদযাপনের জন্য।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ এসব বুথফেরত সমীক্ষাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, একুশের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তার দল বিজেপি। সেইসঙ্গে ২শ’র কাছাকাছি আসনে উড়বে গেরুয়া পতাকা। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েই এবার বাংলায় গঠিত হবে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার। এদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস তার দলের সব প্রার্থীদের নিয়ে শুক্রবার একটি সভা ডেকেছে। তৃণমূল কংগ্রেসও আশাবাদি তারাই তৃতীয়বারের মত ক্ষমতায় আসছে।

এদিকে, কলকাতার আর প্লাসের সাংবাদিক সত্যজিৎ চক্রবর্তী বলেছেন, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে সংবাদ মাধ্যম বনাম সামাজিক মাধ্যমের লড়াই বিজেপি তৃণমূলের লড়াইয়ের মতই। প্রচার পর্বে কার্যত টেক্কা দিয়েছে সামাজিক মাধ্যমের পেজ এবং চ্যানেলগুলো। পিছিয়ে পড়েছে সংবাদ মাধ্যমগুলো। বিজেপি সংবাদ মাধ্যমগুলোর ওপর নির্ভর করেনি। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে বিজেপিমুখি হতে হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সপ্তম দফা নির্বাচনের প্রাক্কালে বলেছেন, আমাদের বিজেপির মত টাকা নেই যে সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেব।

তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমের চ্যানেলের মোবাইল ক্যামেরা রীতিমত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে টেলিকাস্ট করেছে এবং হিটও হয়েছে। বামেদের তরুণ প্রজন্ম এবং আব্বাস সিদ্দিকী মানুষের কাছে পৌঁছেছে সামাজিক মাধ্যের পিঠে করে। বাংলার সাংবাদিকতা জগতের দেবদেবিরা হলেন বাম মানসিকতার। এরফলে বিজেপি তাদের কাছে করোনার থেকেও ভয়ঙ্কর।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগত এবং সহকর্মীদের থেকে শোনা অভিজ্ঞতার নির্যাস হল, এতটাই মার্কস লেনিন ভক্ত তারা যে গ্রাউন্ড জিরোর আবেগকে চাহিদা ও মানুষগুলোকে স্বীকারই করেননি তৃণমূলের নেতাদের ভাবধারায়। সংবাদ মাধ্যমের আট দফা নির্বাচনের বুথ ফেরত সমীক্ষাগুলোর সাথে সামাজিক মাধ্যমের সমীক্ষার বিস্তর ফারাক। সামাজিক মাধ্যমে দর্শকও বেশি। তিনি বলেন, বিজেপি সামাজিক মাধ্যমকে দারুণ করে ব্যবহার করেছে। লোকসভা ভোটে খাটা বিজেপির শক্তিশালী আইটি সেল বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ভ্যানিশ করেছিল। বিজেপি বিধানসভা নির্বাচনে অন্য কৌশলে কাজ করেছে। আর সংবাদ মাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যমের বোদ্ধারা আইটি সেল রাজনীতি করে নিজেদেরই সত্যানাশ করেছে।

এদিকে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজারও এক প্রতিবেদনে বলেছে, আট দফা ভোটের শেষে বুথফেরত সমীক্ষায় বাংলার ফলাফল নিয়ে কোনো স্পষ্ট দিশা পাওয়া গেল না। অধিকাংশ মূলস্রোতের সমীক্ষাতেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। তাতে শাসক তৃণমূলকে সামান্য এগিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষই ২৯৪ আসনের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার কাছকাছি পৌঁছতে পারেনি। অথচ, দুই শিবিরই প্রথম থেকে দাবি করে আসছে যে, তারা ২০০ আসনের গন্ডি পেরোবেই। এই দাবি এবং পাল্টা দাবির আবহেই ভোটের শেষে সামনে এসেছে বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল। যাতে যুযুধান দুই পক্ষের মধ্যে কাউকেই খুব ‘স্বচ্ছন্দ’ ভাবে জয়ী বলে দেখা হয়নি। ফলে ঠিকঠাক ফলাফল জানতে আগামী রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। তবে আরও একটি ইঙ্গিত আছে সমীক্ষায়-সব রাজ্যেই কংগ্রেসের অবস্থা সঙ্গীন। পশ্চিমবঙ্গেও বাম-কংগ্রেস-আব্বাস সিদ্দিকির জোটকে খুব বেশি আসন কোনও সমীক্ষাতেই দেয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, ইতিহাস বলে, এই ধরনের সমীক্ষার ফলাফল যে সবসময়ে হুবহু মিলে যায়, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমীক্ষার ফলাফল আসল গণনার সময় গিয়ে একেবারে উল্টো হয়েছে, এমন দৃষ্টান্তও একাধিক রয়েছে। তবে সাধারণত এমন সমীক্ষা থেকে ফলাফলের আগাম একটা ইঙ্গিত পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে তা ইঙ্গিতই মাত্র।

রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে ভোট হয়েছে। সমশেরগঞ্জ এবং জঙ্গিপুরে করোনা সংক্রমিত হয়ে দুই প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই দুই আসনে ভোট ১৬ মে। ইন্ডিয়া টু ডে-র বুথফেরত সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, বিজেপি পেতে পারে ১৩৪ থেকে ১৬৪টি আসন। পক্ষান্তরে, তৃণমূল পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৫৬টি আসন। বাম-কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত মোর্চা পেতে পারে সর্বোচ্চ ২টি আসন। অর্থাৎ, লড়াই একেবারে সেয়ানে-সেয়ানে। কিন্তু তাতে সামান্য এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। এবিপি আনন্দে দেখানো বুথফেরত সমীক্ষা আবার বলছে, ১৫২ থেকে ১৬৪টি আসন পেতে পারে তৃণমূল। অর্থাৎ, ‘ম্যাজিক ফিগার’ ১৪৮টি আসনের চেয়ে সামান্য বেশি আসন পেয়ে তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের সমীক্ষা বলছে, বিজেপি পেতে পারে ১০৯ থেকে ১২১টি আসন। বাম, কংগ্রেস এবং আব্বাস সিদ্দিকির সংযুক্ত মোর্চা পেতে পারে ১৪ থেকে ২৫টি আসন।

সিএনএন-নিউজ এইট্টিনে প্রকাশিত বুথফেরত সমীক্ষায় তৃণমূলকে দেয়া হয়েছে ১৬২টি আসন। বিজেপি-কে দেয়া হয়েছে ১১৫টি আসন। সংযুক্ত মোর্চাকেও ১৫টি আসন। রিপাবলিক টিভি তাদের বুথফেরত সমীক্ষায় আবার বিজেপি-কে দিয়েছে ১৩৮-১৪৮টি আসন। তৃণমূলকে ১২৮-১৩৮টি আসন। সংযুক্ত মোর্চাকে ১১-২১টি আসন। ফলে তাদের বুথফেরত সমীক্ষাতেও বিজেপি-কে সামান্য এগিয়ে রাখা হয়েছে। তবে সংযুক্ত মোর্চাকে তাদের সমীক্ষায় দুই অঙ্কের আসনে পৌঁছতে দেখা গিয়েছে। ইন্ডিয়া টিভির জরিপে বলা হয়েছে বিজেপি পেতে পাওে ১৩৪ থেকে ১৬০টি আসন। অপরদিক তৃণমূল পেতে পাওে ১৩০ থেকে ১৫৬টি আসন। জন কি বাতে বলা হয়েছে বিজেপি পেতে পারে ১৬২ থেকে ১৮৫টি আসন। তৃণমূল পেতে পাওে ১০৪ থেকে ১২১ আসন।

এমআই

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়