১০ মে’র মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের আহ্বান

আগের সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে বিশেষ বিমানে দেশ ছাড়লেন বসুন্ধরার এমডির স্ত্রী-সন্তান

পরের সংবাদ

খাস কামরা সমাজ বাস্তবতার উপাখ্যান

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২১ , ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২১ , ১০:০৪ অপরাহ্ণ

অরুণিমা নীরা

খাস কামরা নামটি দেখলে বা জানলে বা কোথাও পড়লে মনটা কেমন যেন করে। তখনই খাস কামরা নিয়ে মনের ভিতরে গল্প তৈরি হতে পারে। নামটি শোনার পর যে কেউই ভাববে বা চোখ বন্ধ করে চিন্তা করবে, খাস কামরার রূপ কারুকার্য নিয়ে।

হ্যাঁ, বলছিলাম বাংলা সাহিত্যে শ্রদ্ধেয় সৈয়দ শামসুল হক স্যারের পরে যিনি বর্তমানে দশহাতে লিখছেন সেই গুণী সাহিত্যিক স ম শামসুল আলম এর উপন্যাস ‘খাস কামরা’ নিয়ে।

‘খাস কামরা’ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখা উপন্যাস। বইটির প্রচ্ছদ বিমূর্ত। আলোআঁধারিতে লুকিয়ে আছে কিছু একটা। চমৎকার প্রচ্ছদে মোড়ানো উপন্যাস খাস কামরার প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। বইটির প্রথম প্রকাশ ২০১৯ এবং প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ।

স ম শামসুল আলম ‘খাস কামরা’ উৎসর্গ করতে গিয়ে ছোট একটি দায়বদ্ধতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং উৎসর্গ করেছেন সালেক নাছির উদ্দিনকে।

উপন্যাসটি এক নিশ্বাসে পড়বেন। কারণ উপন্যাসের পাতায় পাতায় এগিয়ে নিয়ে যাবে এরপর কী হচ্ছে। উপন্যাসের ভিতরে আছে বর্তমান চলমান সময়ের বাস্তব কিছু ঘটনা। যে ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটছে, আমরা দেখছি, জানছি কিন্তু প্রকাশ করতে পারছি না। স ম শামসুল আলম অতি সাহসিকতার পরিচয় রেখেছেন। আমরা পুলিশি পোশাকের ভিতরে মানুষের বদলে পশু দেখি, সেই পশুরূপটা নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন। একজন পুলিশের অপকর্ম সমাজকে, সমাজের কিছু মানুষকে কতটা ভোগান্তিতে ফেলে তার একটি ভয়াভহ রূপ জীবন্ত করে লিখেছেন। একটি থানার ওসি ইচ্ছে করলে মামলার ধারা পুরো বদলে দিতে পারে। এখানে ওসি ক্ষমতাধর একজন তা বাস্তব তুলে ধরেছেন।

সাদাসিধে একজন ভালো মানুষকে আসামি বানানো কতটা সহজ তা বুঝিয়েছেন। আমরা পুলিশ চরিত্র নিয়ে বাংলা সিনেমা দেখেছি, পুলিশকে কত ভিলেন রূপে আনা যায় আমরা দেখেছি। খাস কামরা উপন্যাসে পুলিশ কীভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে, লাইনের পর লাইন পড়ে এগিয়েছি আর অবাক হয়েছি।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আকমল চৌধুরী নারী কেলেঙ্কারিতে হাজতবাস করেন। কিছু নারী কেলেঙ্কারিতে তৃতীয় ব্যক্তিদের হাত থাকে যারা পুলিশের সোর্চ বা চামচা হিসেবে কাজ করে। সজীব এখানে সেই চামচা, নারীর দালাল। পুলিশের কাছে দালালি নেয়া এবং নারী সাপ্লাই দেয় সজীব।

রিংকিকে কীভাবে তার স্পর্শকাতর স্থানে নাড়াচাড়া করেছেন কিংবা কীভাবে উত্তেজিত করবার চেষ্টা করেছেন পুলিশ তা বোঝার জন্য যে নাটকীয় ঘটনা ঘটালেন চোখের সামনে দেখবেন।

থানাতেও খাস কামরা আছে রিংকি বুঝিয়েছে।

একজন ডিউটি অফিসার পাটোয়ারি গল্পের প্রধান চরিত্র আকমল হোসেন চৌধুরীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘পান সিগ্রেটের নেশা নেই, চা-মদের নেশা নেই, এসব নেশা যখন নেই, মেয়েলোকের নেশা আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু আপনি এমন ফাঁসা ফেঁসেছেনÑ। কী বলব ভাই, এসব মেয়েদের জন্যেই দেশটার আজ এই অবস্থা।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আসে, সেইসাথে উকিল নিয়েও অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। উকিল ইচ্ছে করলে আসামির জামিন করাতে পারে নিজের পারফর্মেন্সের জন্য। কিন্তু বর্তমানে উকিলরা টাকার জন্য ক্লায়েন্টকে কীভাবে ধরে রাখে তা তুলেছেন। বাদী উকিল বিবাদী উকিল এর মধ্যে একরকম সখ্যতা থাকে তা হলে বারলাইব্রেরিতে। সেই লাইব্রেরি থেকে সখ্য চলে এসেছে ক্লায়েন্ট বা ভুক্তভোগীদের আদালতের ডক পর্যন্ত। দুপক্ষের উকিল পরিকল্পনা করে যে একটি মামলা দিনের পর দিন বা বছর এগিয়ে নেয় তার একটি উদাহারণ এই উপন্যাসে। আসামি আকমল চৌধুরীকে জামিনের জন্য বারবার কোর্টে নিয়ে আসা এবং দুপক্ষ উকিলের জেরা চমক ছিল। আমরা জানি মানুষ মামলা, কোর্ট-কাচারি নিয়ে সর্বস্বান্ত হয়। বছরের পর বছর যায় মামলার সুরাহা হয় না। এ উপন্যাসে তা বিস্তারিত তুলে এনেছেন উপন্যাসিক।

খাস কামরা প্রতিটি স্থানে আছে। একেকজন একেকভাবে এর ব্যবহার করেন। উপন্যাসে অন্য চরিত্র পিংকি রিংকি দুবোন এবং তাদের মায়ের অবস্থান তিন নারীর তিন রূপ, তিন চরিত্র চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। নারী নির্যাতন শুধু যে নির্যাতনের কারণে হয় তা নয়, নারী নির্যাতন কাউকে হেরেস করা বা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য করা হয়Ñ এখানে উঠে এসেছে। সমাজের একটা শ্রেণির নারীদের যে ভাষায় ব্যবহার বা কথা বলার স্ট্যাইল, সেটি এসেছে। প্রচলিত বাংলা কিছু গালি অবলীলায় লেখক দিয়েছেন গল্পের প্রয়োজনে। ভালো বস বা ভালো কর্মকর্তার সঙ্গে সবাই পাশে থাকেন, এর একটি চিত্র রেখেছেন শফিকুল প্রথম থেকেই। তার বসের কষ্টের দুঃসময়ের সাথে ছিলেন। শফিকুল নিজের হাতে বস আকমলের জামিনের জন্য যেখানে যা টাকা লাগে খরচ করেছেন। মালিকদের বিশ্বস্ত কর্মচারী শফিকুল একটি নিবেদিত চরিত্র।

মানুষ আমরা সামাজিক জীব। যেখানে যেমন সেখানে তেমনটা নিজেকে মানিয়ে নিই। নিজেকে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে শিখাই। আমরা জানি টারজান একটি বিখ্যাত গল্প। টারজানের নায়ক টারজান বনে বনে থাকতো আর টারজানের কথা বনের পশুরা বুঝতো। ঠিক তেমনি আকমল সাহেব জেলহাজতে থাকাকালীন সেখানে তার সঙ্গী হয় দাগি আসামি কাশেম, আউয়াল। পরে আসে ইমরান। ওদের সাথে বন্ধুত্ব, ওদের জন্য মায়াÑ এ যেন গল্পের অন্য অধ্যায়। চোখ বন্ধ করলে প্রতিটি দৃশ্য দেখা যায়। জেলখানার খাবার, গোসলের দৃশ্য, টয়লেট, বিছানা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছোটখাটো বিষয়গুলো তুলেছেন। জেলখানায় লুকিয়ে রান্না। সিগারেট খাওয়া। টাকা হলে জেলখানাতেও স্পেশাল আয়েসে থাকা যায়। সেখানে নেশার জিনিস পাওয়া যায়। একটার পর একটা লেখক তুলে এনেছেন। আসামি আকাশের কণ্ঠে কিছু জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত এর লিরিক দিয়েছেন এবং একটি মৌলিক গানও দিয়েছেন খাস কামরাতে। একটি গান ‘আমারও তো কাছে আসার গল্প ছিল/ আমারও তো ভালোবাসার গল্প ছিল/ অল্প কিছু স্বপ্ন ছিল, অল্প কিছু আশা/ আমার ছিল এক পৃথিবী সমান ভালোবাসা।’

আসামি আকাশের কণ্ঠে এমন লিরিকের গান আছে।

চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে গল্পটিতে এগিয়ে যেতেই রহস্যের মধ্যে ডুবে যাবেন। আকমল চৌধুরী প্রতি মাসে ভালুকা যেতেন। কেন যেতেন? প্রথম দিকে না জানালেও শেষে জানিয়েছেন। এখানে গল্পের একটি দুর্বলতা আছে কারণ মানুষ ভালো কাজ করলে পরিবার পরিজন জানেন কিংবা মিডিয়া জেনে থাকেন। এছাড়া দেশের ডিবি পুলিশ জানেন। গল্পে ঝালিবার বিষয়টা কেউ জানলো না এটি বেমানান হলেও শেষে কিন্তু বিশাল চমক দিয়ে শেষ করেছেন। যে কাজটি না করে আকমল সাহেবকে ভুগতে হয়েছে সে কাজটি তিনি করবেন কি না। এই যে আকমল সাহেবের ভাবনা গল্পটিতে নতুন মোড় দিয়েছে।

১২৬ পৃষ্ঠার খাস কামরা স ম শামসুল আলম সহজ সরল ভাষায় লিখেছেন। পুলিশের অশ্লীল ভাষা এক শ্রেণির নারী আছে যারা ভদ্রতার আড়ালে দেহ দিয়ে উপার্জন করেন। নারীদের কথাবার্তা উপন্যাসটিকে জীবন্ত করেছে। আমার মনে হয় এই ‘খাস কামরা’ দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়। আমি হলপ করে বলতে পারি, বাংলা চলচ্চিত্রে ‘খাস কামরা’ ভালো সমসাময়িক গল্পের জন্য দর্শক সহজেই গ্রহণ করবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়