ইসলাম প্রসারে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অবদান

আগের সংবাদ

ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলায় সতর্কতা জরুরি

পরের সংবাদ

লকডাউন ও তরুণ প্রজন্মের স্নায়ুযুদ্ধ

ফারহানা ইয়াসমিন

শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২১ , ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২১ , ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

জনজীবনের থেকে তরুণ প্রজন্ম একটু বেশি জর্জরিত হচ্ছে এই বিভীষিকাময় বিষে। যেমনÑ ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে এখনো পর্যন্ত টানা এবং চলমান ছুটিতে আবদ্ধ আছে তরুণ প্রজন্ম। এত দীর্ঘ ছুটিতে অন্য কোনো পেশার লোকজনের কাজ স্থবর ছিল না এবং এখনো নেই। হয়তো ধাপে ধাপে ছিল। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের মতো করে এতটা গুটিয়ে থাকেনি তারা। চলুন জেনে আসি লকডাউনের স্পর্শে জর্জরিত তরুণ প্রজন্মের কিছু স্নায়ুযুদ্ধের কথাÑ
১. সেশনজট : বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থী। এই হাজার হাজার শিক্ষার্থী ১৩-১৪ মাস ধরে তাদের মন প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে সেশনজট নামক এক বিদেশি ও ভয়ঙ্কর রূপের অধিকারী শব্দের সাথে। শুধু শিক্ষার্থীরা নই সঙ্গে তাদের অভিভাবকরাও এই ভয়ঙ্কর রূপের অধিকারী শব্দের ঝংকারে ঝলসিত হয়ে যাচ্ছেন।
২. বদ্ধমূল জীবন : সেশনজটের পরই তরুণদের জর্জরিত জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় তারা কতটা আবদ্ধ। যে তরুণদের পদচারণাতে অমর একুশে ফেব্রুয়ারিতে গ্রাম ও শহর উভয় প্রাঙ্গণে, রাস্তায় শ্রদ্ধার ধ্বনি বর্ণিত হতো। এবারের সেই অমর একুশেও তরুণ প্রজন্মকে থাকতে হয়েছে লুকোচুরি খেলার মতো লুকিয়ে। শুধু কি অমর একুশ? প্রতিটি স্মরণীয় ও বরণীয় এবং ঐতিহাসিক দিবসগুলোও সর্বদা হচ্ছে প্রাণহীন ও ছন্দহীন কবিতার মতো। কারণ সেখানে প্রাণ ও ছন্দ মেলানোর জন্য সুযোগ পাচ্ছে না লকডাউনের বদ্ধমূলে আটকে থাকা তরুণ প্রজন্ম।
৩. মানসিক বিপর্যয় : লকডাউনের বাতাস আর কড়া লিকারের তিক্তময় চা ঠিক একই রকমের। ব্যতিক্রমধর্মী দুয়েকজন ছাড়া বাকিরা যেমন কড়া লিকারের তিক্তময় চা খেতে পারে না। তেমনি দুয়েকজন তরুণ ছাড়া আর কারোর মানসিক অবস্থা এই দীর্ঘকালীন সময়ে নেই। হাতেগোনা দুয়েকজন বাপের টাকায় ফুর্তিতে দিনাতিপাত করলেও অধিকাংশ বাংলার তরুণের বুকে বিঁধে আছে মানসিক যন্ত্রণা নামক মাছের কাঁটা।
৪. সম্পর্কের টানাপড়েন : সম্পর্ক বলতে প্রথমেই আমাদের মাথায় আসে পারিবারিক ও রক্তের সম্পর্কগুলো। কিন্তু এই সম্পর্কগুলো ছাড়াও আরেকটা সম্পর্ক আছে আত্মার সম্পর্ক। তরুণ-তরুণীর মাঝে যে সম্পর্ক আমরা দেখি সেটাই মূলত আত্মার সম্পর্ক। এই দীর্ঘ লকডাউনে সেই আত্মার সম্পর্কগুলো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে কোনো তরুণ প্রেমিক যুদ্ধ করছে তার অনুভূতি ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে, আবার কোনো প্রেমিকা যুদ্ধ করছে তার স্বপ্ন ও পরিবারের চাপের সঙ্গে।
৫. ক্যারিয়ার গঠনে অনিশ্চয়তা : চার দেয়ালে বন্দি হয়ে তরুণ প্রজন্ম ক্রমে হারিয়ে ফেলছে তাদের তারুণ্য শক্তি। যে শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠাতে চেয়েছিল তারা তাদের স্বপ্নের বাতি। অনেকে পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক কাজ করে থাকেন। যেগুলো তাদের সিভিকে আকর্ষণীয় করতে সাহায্য করবে।
৬. জীবন ও জীবিকা নিয়ে টানাটানি : বাংলাদেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে। এই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের হাল ধরত টিউশনি নামক প্যাডেলের মাধ্যমে। লকডাউন নামক হতাশার স্পর্শে জর্জরিত তরুণ প্রজন্মের সেই প্যাডেলটি। আজ সেই সব তরুণ প্রজন্মেরা জানে না কীভাবে তারা আবার ফিরে পাবে তাদের সংসার চলানোর সেই প্যাডেলের গতি।
৭. মেধা বিকাশের অন্তরায়ের উৎপত্তি : মেধা প্রকৃতি প্রদত্ত হলেও মেধার বিকাশনির্ভর করে নিয়মিত পরিচর্চা ও পরিচর্যার ওপর। এই ভয়াবহ লকডাউনে থেকে সেই পরিচর্চা ও পরিচর্যার গুরুত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে। যার দরুন তরুণ প্রজন্মের মেধা বিকশিত না হয়ে বরং আস্তে আস্তে শিথিল চাদরের ভাঁজে চলে যাচ্ছে।
৮. ইন্টারনেট দুনিয়ার আসক্তি : লকডাউন সরাসরিভাবে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে অনলাইন ছোঁয়ার মাধ্যম। গুটিকয়েকজন অনলাইন ও ইন্টারনেট দুনিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেও অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেট আসক্তিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে আর কিছু সমস্যাময়ী কর্মকাণ্ড।
৯. আস্থাহীন মানসিকতা : একজন মানুষ তার কর্মব্যস্ততা থেকে সাতদিনের ছুটি পেলে মনে করে সে সাত মাসের ছুটি পেয়েছে। তাহলে একজন শিক্ষার্থী যদি ১৩-১৪ মাস ছুটি পাই তাহলে তার মনের অবস্থা কতটা বিচলিত হতে পারে তা কেবল একজন শিক্ষার্থীই উপলব্ধি করতে পারবে। স্পর্শ শব্দটি সবসময় সুখকর হয় না। তা এবার লকডাউনের স্পর্শ থেকে বোঝা গেল। কেননা এই লকডাউনের ছোঁয়াতে তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে আস্থাহীন ও ভরসাহীন জলাদেশে ডুবে যাচ্ছে।
১০. আত্মহত্যা : সর্বোপরি, লকডাউনের সহমর্মিতায় সর্বোচ্চ হারে বেড়েছে আত্মহত্যার হার। এবং এই হারের সংখ্যাটাও সব থেকে বেশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এ ঘটনার মূল হলো হতাশা, অস্থিরতা, পারিবারিক চাপ, ক্যারিয়ারের চাপ এবং ব্যক্তিগত কিছু ইস্যু। আমরা আশাবাদী, লকডাউনের স্পর্শে জর্জারিত সব রকম ধোঁয়াশা কাটিয়ে উঠবেই একদিন।

ফারহানা ইয়াসমিন : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়