খালেদার চিকিৎসায় ১০ সদস্যদের মেডিকেল বোর্ড গঠন

আগের সংবাদ

হেফাজত নেতা ফয়সাল মাহমুদ গ্রেপ্তার

পরের সংবাদ

মির্জা আব্বাস আসলে কী বলতে চেয়েছেন?

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২১ , ১০:৪৪ অপরাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২১ , ১:৩৭ অপরাহ্ণ

ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটি যখন পাই, তখন আমি ছিলাম জাপানের টোকিও শহরে। আয়োজকদের অনুষ্ঠান শেষে টোকিও শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পরপরই ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার খবরটি পাই। ইলিয়াস আলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজনীতিবিদের গুমের খবরটি পাওয়ার পর একটু বিচলিত হয়ে পড়ি। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল, বিষয়টি অনেক দূর গড়াবে। ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের হলেও ইলিয়াস আলীর সঙ্গে ব্যক্তিগত একটা পরিচয় ছিল। জাপান যাওয়ার কয়েক দিন আগেই একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিলেট যাচ্ছিলাম। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি ছাড়ার অল্প কিছুক্ষণ আগেই ইলিয়াস আলী আমার পাশের সিটে এসে বসলেন। রাজনীতির নানা আলাপ-আলোচনা করতে করতেই বিমান নামল সিলেট বিমানবন্দরে। ইলিয়াস আলী অনেক অনুরোধ করছিলেন তার সঙ্গে বাসায় যাওয়ার জন্য। যদিও সেটা হয়ে ওঠেনি, কারণ আমাকে সিলেট নেমেই যেতে হয়েছিল সুনামগঞ্জের সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

যা-ই হোক, গুমের ঘটনার পর ইলিয়াস আলীকে বহনকারী গাড়িটি পাওয়া গেল বনানীর একটি রাস্তায়। কিন্তু ইলিয়াস আলী এবং তার ড্রাইভার আনসার আলীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। দুদিন বাদে জাপান থেকে দেশে ফেরার পর দেখলাম, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজের প্রতিবাদে তিন দিনের অবরোধ চলছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। ব্যাপক ভাঙচুর হয়েছে সিলেট শহরে। তার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ডেপুটি রেজিস্ট্রার তাহসিনা রুশদির লুনা গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিলেন। কিন্তু নিখোঁজ ইলিয়াস আলী দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নিখোঁজই রয়ে গেলেন। কোনো সুরাহা হলো না তার এই গুম রহস্যের। যেভাবে হারিছ চৌধুরীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিরও কোনো মীমাংসা হয়নি অথবা সালাউদ্দিনকে কীভাবে ভারতে পাওয়া গেল বা কেন এতদিন তিনি ভারতে আছেন, এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য বিএনপির কাছ থেকে পাওয়া যায় না, তেমনি ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার বিষয়টিকেও একটি মীমাংসাহীন পরিণতি হিসেবে ধরে নিচ্ছিলেন অনেকে।

তবে একসময়কার তুখোড় ছাত্রনেতা ও সিলেট অঞ্চলের বিএনপির অন্যতম এ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের গুম হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনেছেন বিএনপিরই অন্যতম নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। গত ১৭ এপ্রিল সিলেট বিভাগ জাতীয়তাবাদী সংহতি সম্মিলনীর উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার বিষয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তিনি বলেছেন, সরকার গুম করেনি, বিএনপির কিছু নেতাই এই গুমের সঙ্গে জড়িত। তিনি আরো বলেছেন, পেছন থেকে ছুরি মারা এই নেতারা এখনো দলে সক্রিয়। মির্জা আব্বাস দলের মহাসচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। খুবই কৌত‚হলের বিষয় হচ্ছে, এই অনুষ্ঠানে গুম হয়ে যাওয়া নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রীও ছিলেন। তিনি কিন্তু এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি।

মির্জা আব্বাস তার বক্তব্যে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি তাদের ফোন করেছি এবং তারা বলেছেন ইলিয়াস আলীকে চট্টগ্রামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ এই ‘তারা’ কারা, তা অবশ্য তিনি স্পষ্ট করেননি। মির্জা আব্বাসের এ বক্তব্যে যথারীতি আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং গণমাধ্যমে সেদিন এটাই ছিল উল্লেখযোগ্য একটি খবর। সরকারের বিরুদ্ধে এই গুমের জন্য ৯ বছর ধরে বিএনপির যে অভিযোগ, সেই অভিযোগের লক্ষ্যটি সরকার থেকে বিএনপির দিকে তাক করলেন বিএনপিরই নেতা মির্জা আব্বাস। সঙ্গত কারণেই সেদিন ‘টপ অব দ্য ডে’ ছিল মির্জা আব্বাসের এই বোমা ফাটানো বক্তব্য।

সরকারি মহল কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও বিএনপি বিব্রত এই নতুন তথ্যে। পরদিন যদিও মির্জা আব্বাস সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, তার বক্তব্য খণ্ডিত আকারে প্রকাশ করেছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের ওপর দায় চাপানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তার বক্তব্য কী ছিল, তা অবশ্য তিনি স্পষ্ট করেননি। ফলে অবধারিতভাবেই বিএনপির একজন সিনিয়র নেতার বক্তব্য ইলিয়াস আলীর গুম রহস্যে নতুন মাত্রা যোগ করল।

মির্জা আব্বাসের ব্যাখ্যায় দেশের মানুষ যেমন গোঁজামিল খুঁজে পেয়েছে, তেমনি বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও সন্তুষ্ট হননি। তাই ব্যাখ্যা চেয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা আব্বাসকে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং মির্জা আব্বাস তার জবাবও দিয়েছেন। কিন্তু মির্জা আব্বাসকে দেয়া এই চিঠি এবং মির্জা আব্বাসের দেয়া ব্যাখ্যায় প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়টিতে কোনো স্পষ্টতা আসেনি। একটি প্রচলিত প্রবাদ হচ্ছে, বন্দুক থেকে গুলি যদি একবার বেরিয়ে যায়, তাহলে তা ফিরিয়ে নেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। মির্জা আব্বাস যা বলার বলে দিয়েছেন। এখন হাজারো ব্যাখ্যা দিলেও তার বক্তব্যে বিএনপির নেতৃত্বের মধ্যে যে সন্দেহ-অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে, তার অবসান হওয়া কঠিন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপির কী লাভ হলো? সরকারের ঘাড়ের ওপর থেকে বন্দুকটি তিনি কেন সরাতে চাইলেন? তিনি কি তাৎক্ষণিকভাবে এই বক্তব্য রাখলেন? না কি জেনে-শুনে-বুঝে এই বক্তব্য রাখলেন? মির্জা আব্বাসের মতো অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কি তাৎক্ষণিকতায় এ রকম বক্তব্য দিতে পারেন? তাহলে কেন এ রকম একটি নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বিএনপিকে একটি বিব্রতকর অবস্থায় ফেললেন? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে যদি সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্রোতধারা বিশ্লেষণ করা যায়, যদি বিএনপির অভ্যন্তরে আপসকামী রাজনৈতিক ধারায় কারা দলটিকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা জানা যায়। দলটির ইনার কারেন্ট বা আন্ডার কারেন্ট রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যদি বোঝা যায়, তাহলে মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের মর্মার্থ বোঝা কঠিন নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, রাজনীতির বিশ্লেষণে বাক্য বা বক্তব্যকে শব্দার্থ দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। প্রকৃত মর্মার্থ বুঝতে হলে ‘বিটুইন দ্য লাইন’-এর অর্থ খুঁজতে হবে। তার আগে বোঝা উচিত, ইলিয়াস আলী বিএনপিতে কোন ধারার রাজনীতি করতেন, কাদের জন্য তিনি হুমকি হয়ে উঠেছিলেন ক্ষমতায় থাকাকালে সিলেট বিএনপি বা বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তিনি কাদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন, এসবের বিশ্লেষণও দরকার।

ইলিয়াস আলীর রাজনীতির হাতেখড়ি ১৯৮০ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জাতীয়তাবাদী দল গঠনের পর অঙ্গ ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল গঠনের উদ্যোগ নিলেন, তখন থেকেই। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি জসীমউদ্দীন হলের ছাত্রদলের দায়িত্ব পান ইলিয়াস আলী। ১৯৮৩ সালে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৬ সালের ছাত্রদলের জাতীয় সম্মেলনে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে এবং ছাত্রদল মাঠের শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন; তখন ছাত্র রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেন ইলিয়াস আলী। ১৯৮৮ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একবার গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর নব্বইয়ের গণআন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য নেতার সঙ্গেও ফের গ্রেপ্তার হন। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ইলিয়াস আলী। এরপর রাজনীতির মাঠে তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

ছাত্রদলের নেতৃত্ব ছেড়ে ২০০১ সালে ইলিয়াস আলী সিলেট-২ আসন অর্থাৎ বিশ্বনাথ উপজেলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এক-এগারোর বিপর্যয় ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির পর ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত বিএনপির কাউন্সিলে তিনিই দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে থেকেই তিনি সিলেট বিভাগের বিএনপির রাজনীতি তার হাতের মুঠোয় নিতে থাকেন। সংকটটা শুরু হয় সেখান থেকেই। ২০০৪ সালে ইলিয়াসকে ঘিরে থাকা নতুন বলয় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। সিলেটের বিভাগীয় রাজনীতির এই অভ্যন্তরীণ বিরোধে ইলিয়াস আলী প্রকাশ্যে সমর্থন পেয়েছেন তারেক রহমানের। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অনেক বিষয়ে তারেক জিয়ার অনেক অন্যায় হস্তক্ষেপ নিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে নালিশ করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান।

তারেকের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া ইলিয়াস আলীকে থামাতে সাইফুর রহমান একবার প্রকাশ্যে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দেন। পরিস্থিতি সামলাতে বেগম জিয়ার সিলেট জেলা কমিটি ভেঙে দেন ২০০৫ সালের ২৮ মে। এরপরও বিরোধের অবসান হয়নি। ২০০৬ সালের ২৬ মে সাইফুর রহমান সম্পর্কে কট‚ক্তির প্রতিবাদে তার সমর্থকরা সিলেট শহরে ইলিয়াস আলীর বাসায় হামলাও চালায়। সাইফুর রহমান চাচ্ছিলেন তার ছেলে নাসের রহমানকে সিলেটের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে। মৌলভীবাজারে নিজের একটি আসন ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে ছেলেকে এমপি করে এনেছেন তিনি, কিন্তু ইলিয়াস আলী ছিলেন সিলেটে সাইফুর রহমানের পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে। এই বিরোধ এমন পর্যায়ে গেছে যে, ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সিলেট ওসমানী নগর থানার সামনে ইলিয়াস আলীর গাড়িতে গুলি চালানো হয়। ইলিয়াস আলী আহত না হলেও গাড়িটি ঝাঁজরা হয়ে যায়। রাজনৈতিক স্বার্থে ইলিয়াস আলী এই মামলার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে। তবে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা সত্তেও থানায় দায়ের করা এ মামলার কোনো তদন্ত হয়নি।

এর মধ্যে পটপরিবর্তনের পর এক-এগারোর সরকার ইলিয়াস আলী ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ১০ আগস্ট দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাজিত হলেও সাইফুর রহমান বিএনপির সংস্কারবাদীদের নেতৃত্বে চলে আসায় সিলেটের বিএনপির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এককভাবে ইলিয়াস আলীর হাতে চলে যায়। ২০১১ সালে ভারতের টিপাইমুখ বাঁধবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি হরতালের ডাক দেয়। টিপাইমুখবিরোধী এই সমাবেশে ইলিয়াস আলী ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানও বক্তব্য রাখেন। এর মধ্যে তিনি মাহমুদুর রহমান ও শফিক রেহমানদের নিয়ে সীমান্তে ছিটমহল বিনিময়ের প্রতিবাদে ‘আমরা সীমান্তবাসী’ নামের একটি সংগঠন গঠন করে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেন।

ওয়ান-ইলেভেনে বিএনপির উদারপন্থি গ্রুপ কোণঠাসা হওয়ায় মির্জা আব্বাস ও অন্য কট্টরপন্থিরা নেতৃত্বে চলে আসেন। ফলে ইলিয়াস আলীসহ অন্যান্য কট্টরপন্থির রাজনীতির পথ মসৃণ হয়ে যায়। কিন্তু সিলেটের বিএনপির দ্ব›দ্ব-সংঘাত চলতেই থাকে। সিলেটে বিএনপির রাজনীতির এই টানাপড়েনের মধ্যে ২০১২ সালের ১৭ মার্চ ড্রাইভারসহ নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী।

অন্যদিকে বিএনপির রাজনীতির কট্টরপন্থি নেতা মির্জা আব্বাস ও উদারপন্থি সাদেক হোসেন খোকার মধ্যে বিরোধ ছিল প্রকাশ্য। ঢাকা মহানগরের রাজনীতিতে এই দুই নেতার বিরোধের ঘটনায় দুটি রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছিল। দলের সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মৃত্যুর পর দলে খোকার প্রভাব কমতে থাকে। তবে আব্বাসবিরোধী উদারপন্থিরা এই দলের মধ্যে একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল, এটা বলা বোধহয় ঠিক হবে না। আব্বাসবিরোধী গ্রুপের অভিযোগ, সরকারের সঙ্গে প্রচ্ছন্ন আঁতাতে মির্জা আব্বাস বহালতবিয়তে আছেন। দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যাংক ঢাকা ব্যাংকে তার মেজরিটি শেয়ার। সরকারের কাছে যেখানে বিএনপির আপামর নেতারা কোণঠাসা, সেখানে ২০১২ সালের ২৯ মার্চ মির্জা আব্বাস ঢাকা ব্যাংকের পরিচালক পদে পুনর্বহাল হয়েছেন। এক-এগারোর সরকারের সময় দায়ের করা কর ফাঁকির মামলায় তার আট বছরের জেল হলেও এই রায় চূড়ান্ত পরিণতি পায়নি। অন্যদিকে পূর্তমন্ত্রী থাকাকালে তেজগাঁওয়ে অখ্যাত সব পত্রিকার নামে প্লট বরাদ্দ দেয়ার মামলার বিচার কাজও এগোয়নি। ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি নাশকতার মামলায় মির্জা আব্বাস গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান। এসব কারণে বিএনপির অনেক নেতা মির্জা আব্বাসকে বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মির্জা আব্বাসের সাম্প্রতিক মন্তব্যের জন্য এই সন্দেহবাদীদের বক্তব্য আরো জোরালো হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, মির্জা আব্বাস তার বক্তব্যে সরকারকে যেমন সুবিধা করে দিয়েছেন, তেমনি পেছন থেকে ছুরি মারা নেতৃত্বের কথা বলে সেই উদারপন্থি গ্রুপটাকে কোণঠাসা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকারের ওপর থেকে ইলিয়াস আলীর গুমের দায় সরিয়ে দেয়ার জন্য তিনি যেমন সরকারের কাছ থেকে সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে উদারপন্থি গ্রুপের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়ে দিয়ে তাদের বিব্রত করতেও সক্ষম হয়েছেন। বিএনপির বর্তমান অতি দুর্বল সাংগঠনিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের বক্তব্য দিলে তার যে কিছু হবে না, তা মির্জা আব্বাসের মতো ঝানু রাজনীতিবিদ ভালো করেই জানেন। ইলিয়াস আলী আদৌ আর কোনোদিন ফিরে আসবেন কিনা তা অবশ্য কেউ যেমন জানেন না, কিন্তু বোমা ফাটানো বক্তব্যের সুফল যে শেষ পর্যন্ত তার ঝুলিতেই যাবে, এটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি জানেন মির্জা আব্বাসই।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়