মানুষকে আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল শাহরিয়ার ভাইয়ের

আগের সংবাদ

শ্রদ্ধাঞ্জলি

পরের সংবাদ

অসাম্প্রদায়িক আধুনিক মানুষ

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২১ , ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০২১ , ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ শফিকুর রহমান

ইত্তেফাকে কয়েকজন ছিলেন গুরু সাংবাদিক। শিক্ষক অর্থে। আসফ-উদদৌলা রেজা (সবার রেজা ভাই), গোলাম সারওয়ার। এই দুই গুরুর নেতৃত্বে মূলত স্বাধীনতা-উত্তর ইত্তেফাক-এ আমাদের একটা স্ট্রং টিম ছিল যাদের হাতে পত্রিকার সার্কুলেশন তখন এমন উঁচুতে উঠেছিল যে, অন্য সব পত্রিকা এক করলেও ইত্তেফাক-এর সমান হতো না, বরং অনেক নিচে থাকত। আমাদের টিমের মধ্যে আর যারা ছিলেন, যেমন জহিরুল আলম (প্রথম চিফ রিপোর্টার), হাসান শাহরিয়ার (দ্বিতীয় চিফ রিপোর্টার), ছিলেন আবেদ খান, খায়রুল আনাম, শফিকুল কবির , নাজিমউদ্দীন মোস্তান, জাহিদুজ্জামান ফারুক, আখতার ইউসুফ, আকরাম হোসেন খান, মোহাম্মদ শাহজাহান, গিয়াস উদ্দিন, রেজানুর রহমান, আলমগীর হোসেন, মতিউর রহমান চৌধুরী, নাজমুল হাসান, পরের দিকে আরো জয়েন করেছিলেন শাহজাহান সরদার, আমীর খসরু ও মাঈনুল আলম। ফটোগ্রাফারদের মধ্যে আফতাব আহমেদ, রশীদ তালুকদার, মোহাম্মদ আলম।

সবার ওপরে ছিলেন দুই ভাই ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, যথাক্রমে সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও সম্পাদক। তবে এটা ঠিক যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুই ছিলেন ইত্তেফাক-এর মৌল চালিকাশক্তি। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ভোমা ভোমা সব বক্তৃতা ইত্তেফাক-এর ফ্রন্ট পেজে ছাপতেন। তিনি মনে করতেন তার বক্তৃতার কারণেই পাঠক ইত্তেফাক হাতে নেয়। কিন্তু আমরা জানি যেদিন থেকে তিনি বক্তৃতা ছাপতে শুরু করলেন সেদিন থেকে পাঠক সংখ্যাও দ্রুতগতিতে কমতে শুরু করল। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মিলিটারি এরশাদের মন্ত্রী হবার পর সার্কুলেশনের নিম্নমুখিতা আরো গতি পেয়ে গেল। ২০০১ সালের পর থেকে এক এক করে আমরা ইত্তেফাক ছেড়ে দিলাম। আজ যে ইত্তেফাক ছাপা হচ্ছে তার মান, সার্কুলেশন আমাদের ব্যথিত করে।

হাসান শাহরিয়ার বয়সে আমার ততোটা বড় না হলেও পেশায় অনেক সিনিয়র এবং সে কারণেই তাঁকে বস বলে ডাকতাম। আমি ১৯৭০ সাল থেকে খণ্ডকালীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার পর (মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বাদ দিয়ে) ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝিতে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেই। শাহরিয়ার সাহেব ১৯৬৩ সালের দিকে ইত্তেফাক-এর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ছিলেন এবং ঐ বছর আইএ পাস করে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান এবং একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া অপরদিকে সাংবাদিকতা দুটোই সমানতালে চালিয়ে যান। করাচিতেই তিনি যোগ দেন দৈনিক মর্নিং নিউজ, ডেইলি ডন এবং তখনই ইত্তেফাক-এর পাকিস্তান করেসপন্ডেন্ট। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ঢাকা ফেরেন এবং ১৯৭৪-এর পয়লা জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক-এ যোগ দেন। তিনি এতটাই ভাগ্যবান যে, তার যোগদান ছিল স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট হিসেবে। আমাদের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট হতে সময় লেগেছিল দুই দশকের মতো। মূলত হাসান শাহরিয়ারের রক্তেই ছিল সাংবাদিকতা। তার পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন একাধারে সাংবাদিক ও রাজনীতিক। তিনি তদানীন্তন আসামের প্রথম মুসলমান সম্পাদক ছিলেন। তার সম্পাদনায় কলকাতা থেকে দৈনিক ‘ছোলতান’ (সুলতান), সিলেটের সাপ্তাহিক ‘যুগবাণী’ ‘যুগভেরী’ ও ‘সিলেট’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। হাসান শাহরিয়ারের বড় ভাই হোসেন তওফিক চৌধুরী (পরে আইনজীবী) দৈনিক পূর্বদেশের রিপোর্টার ছিলেন।

বহির্বিশ্বের কাগজেও হাসান শাহরিয়ার সুনামের সাথে সাংবাদিকতা করেছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাপ্তাহিক ‘নিউজউইক’ ও দৈনিক ড্যাকান হেরাল্ড-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। পিতা আসামের এমএলএ ছিলেন। কিন্তু হাসান শাহরিয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ও পরে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তাকে সুনামগঞ্জ থেকে পার্লামেন্ট নির্বাচন করার অফারও দেয়া হয়েছিল, তিনি এড়িয়ে গেছেন। সাংগঠনিক তৎপরতার দিক থেকে বলা যায় তিনি দুই দুইবার কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং ২০১২ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস নির্বাচিত হন। জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন (১৯৯৩-১৯৯৪)।

সাংবাদিকতার শুরুতে যে ক’জন সিনিয়রের কাছে আমার ঋণ রয়েছে তাদের মধ্যে হাসান শাহরিয়ার অন্যতম। চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব আমাদের মতো শিক্ষানবিশ তরুণ রিপোর্টারদের গাইড করা। হাসান শাহরিয়ার সে কাজটি করতেন আন্তরিকতার সাথে। তার মধ্যে ক্লান্তি দেখিনি। কখনো নিউজ এন্ড এক্সিকিউটিভ এডিটর আসাফ-উদ-দৌলা রেজাÑ রেজা ভাইর সঙ্গে নিউজ বৈঠক করছেন আবার কখনো গোলাম সারওয়ারসহ তিনতলায় মালিকদের সঙ্গে দেনদরবার করছেন। বেশিভাগ সময় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে, কারণ তার মধ্যে বা তার মনোজগতে সাংবাদিকতার একটা জায়গা ছিল। মানিক মিয়ার সন্তান হিসেবে তার একটা দায়বদ্ধতাও ছিল ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের ব্যাপারে। ব্যারিস্টার মইনুল সে-সবের ধার ধারতেন না। তিনি কখনো কখনো আওয়ামী লীগের বিপক্ষে নিউজ নিয়ে ইন্টারেস্টেড হতেন। পক্ষান্তরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মনোজগতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল। ইত্তেফাক-এর প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালকদের তালিকায় মওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর নাম দেখিয়েছেন তিনিই আমাদের।

আমাদের সময় ইত্তেফাক ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। সেই সুবাদে মালিকেরা যেমন প্রচুর ডিবিডেন্ট পেতেন আবার সাংবাদিক-কর্মচারীরাও অনেকগুলো সুবিধার মধ্যে বছরে দুই ঈদে ৬ বেসিকের সমান বোনাস পেতেন। অমুসলিমরাও সমভাবে পেতেন। ওয়েজবোর্ডের বাইরে বাড়িভাড়া খাতে ৩০% বেশি পেয়েছি। সব সুযোগ-সুবিধার দরবার আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গেই হতো। কখনো কখনো কোনো নিউজ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যকার মতভেদ চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যেত, হিংসাত্মক হয়ে উঠত। তখন রেজা ভাই জীবিত থাকতে তিনি, পরে সারওয়ার ভাই ও শাহরিয়ার ভাইকে মিটাতে হতো। কোনো কোনোদিন সংকট মিটাতে ভোর হয়ে যেত, তারপর কাগজ প্রিন্ট হতো।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে যখন আবার ইত্তেফাক-এ প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ও পরে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে মোটামুটি একটা অবস্থানে উঠি তখন রেজা ভাই আমাকে রাজনীতি, কূটনীতি ও পার্লামেন্ট কাভার করতে সুযোগ করে দেন। হাসান শাহরিয়ার তখন পার্লামেন্টের মেইন রিপোর্ট করতেন। অবশ্য প্রথমদিকে খায়রুল আনাম ও শাহরিয়ার সাহেবের সঙ্গে পার্লামেন্ট কভার করতে যেতাম। তারা দু’জনই আমাকে খুব সাহায্য করেছেন, গাইড করেছেন এবং অল্পদিনেই আমি পার্লামেন্ট প্রসিডিংস কাভার করা রপ্ত করতে সমর্থ হই। দু’জনের কাছেই আমার কৃতজ্ঞতা।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে বিট সিস্টেম ছিল না। হাসান শাহরিয়ারই প্রথম রিপোর্টারদের বিট ভাগ করে একটা শৃঙ্খলা আনেন। এর আগে দেখা গেছে এক কাগজের দু’জন একই বিষয়ের ওপর রিপোর্ট জমা দিয়েছে অথবা এ ওর ওপর ঠেলাঠেলি করে হয়তো বড় একটা ঘটনাই মিস হয়ে গেছে। বিট ভাগের পর তা শৃঙ্খলার মধ্যে আসে।

পার্লামেন্ট কাভার করতে হলে দুটো ব্যাপার খুব জরুরি, প্রথমত ট্রেজারি বেঞ্চ ও অপজিশনের পলিটিক্স এবং মেনুফেস্টা জানতে হবে, দ্বিতীয়ত, পার্লামেন্টের রুলস অব প্রসিডিউর জানতেই হবে, সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সংবিধান। মনে পড়ে এই লক্ষ্যে আমি দিনের পর দিন পার্লামেন্ট লাইব্রেরিতে পড়ালেখা করেছি। যে-কারণে রাজনীতির পাশাপাশি পার্লামেন্ট রিপোর্টার হিসেবে অফিসে এবং অফিসের বাইরেও আমার একটা অবস্থান ছিল।

হাসান শাহরিয়ার একজন রাজনীতি-সচেতন সাংবাদিক। বিশেষ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা তথা অসাম্প্রদায়িক আধুনিক মানুষ। কিন্তু রাজনীতিতে সরাসরি যোগ দেননি। তার কাছ থেকে শুনেছি (পশ্চিম) পাকিস্তানে থাকতে বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। ’৭০-এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তাকে সুনামগঞ্জ থেকে নির্বাচন করার পরামর্শও দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও একই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজি হননি। কেন রাজি হননি জানি না, কোনদিন প্রশ্নও করিনি কারণ ওটা তার একান্ত ব্যক্তিগত।

তবে আমাদের মধ্যে যে-ক’জন সাংবাদিকের পোশাকে-আশাকে, কর্থাবার্তায় চালচলনে, আচার-আচরণে আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে, এক কথায় এলিট সাংবাদিক বলতে যা বোঝায় হাসান শাহরিয়ারর তাদের অল্প কয়েকজনের মধ্যে একজন। বাংলা ইংরেজি দুই ভাষায়ই তুখোড় রিপোর্টার হিসেবে আমাদের কমিউনিটিতে পরিচিত ছিলেন। বিশ্বাসের সঙ্গেও খুব কমই আপস করেন। যেমন একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে জয়েন করার পরও কেবল বিশ্বাসের কারণে ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন।

’৯০ থেকে ২০০০। এ সময় আমরা অনেকেই ইত্তেফাক ছেড়ে দেই। অনেকদিন আমরা কেউ আর রাজপথে, পার্লামেন্টে বা কোনো দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠান কাভার করতে যাই না। দেখা-সাক্ষাৎও কম হয়, শাহরিয়া সাহেব এই কমতিটা পূরণ করেন মাঝেমধ্যে লাঞ্চ-ডিনারে আপ্যায়ন করে। তবে একটি খবর আমাদেরও ভাবনার মধ্যে ফেলে দেয়। ভদ্রলোক এতটাই একা নিজ পরিমণ্ডলে থাকতে ভালোবাসেন। হয়তো গোপন কষ্টের বা যাপিতজীবনের গোপন কথাগুলো নিজের মধ্যেই রাখেন। তখনকার ইত্তেফাকের সহকর্মীদের অনেকে আজ প্রয়াত। প্রিয় হাসান শাহরিয়ারও সম্প্রতি বিদায় নিয়েছেন। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়