মর্যাদার লড়াইয়ে বার্সেলোনাকে হারিয়ে শীর্ষে রিয়াল মাদ্রিদ

আগের সংবাদ

এবার করোনায় প্রাণ গেলো শিল্পী মিতা হকের

পরের সংবাদ

আইসিইউর জন্য হাহাকার

প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২১ , ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০২১ , ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ

বেসরকারি একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চন্দন বড়ুয়া। সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্ত হয়েছে গত ৬ এপ্রিল। এরপর মহাখালী ডিওএইচএস-এর বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব চন্দন বড়ুয়া ও তার স্ত্রী। শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সিদ্ধান্ত হয় হাসপাতালে ভর্তির। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে বেড ফাঁকা নেই। ৮ এপ্রিল ভর্তি হন বেসরকারি একটি হাসপাতালে। ওই দিনই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে চন্দন বড়–য়ার। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন তার আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) দরকার। কিন্তু সেই হাসপাতালে আইসিইউ বেড ফাঁকা নেই। এরপরই শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। চেনা পরিচিত এবং উপর মহলে যোগাযোগ আছে এমন লোকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে নেই আইসিইউ।

কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালেও যোগাযোগ করে আইসিইউ বেড ফাঁকা মেলেনি। পরে চন্দন বড়–য়াকে নেয়া হয় রাজধানীর আরেকটি অভিজাত বেসরকারি হাসপাতালে। এ চিত্র এখন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের নিত্যদিনের। যাদের অর্থবিত্ত কিংবা উপর মহলে যোগাযোগ আছে; ভাগ্য ভালো হলে তাদের কারো কারো ক্ষেত্রে আইসিইউ মিললেও অনেক ক্ষেত্রে তাতেও কাজ হয় না। আর সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তো আইসিইউ রীতিমতো সোনার হরিণ। একটা আইসিইউ বেডের জন্য রোগীর স্বজনদের আকুতি-মিনতি আর ছোটাছুটির পরিসমাপ্তি ঘটে স্বজন হারানোর আর্তনাদে। আইসিইউ বেড জোগাড় করতে না পারায় তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে প্রিয় জনের মৃত্যু দেখা ছাড়া যেন কিছুই করার থাকে না স্বজনদের।

করোনার সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে গুরুতর রোগীর সংখ্যাও- যাদের দরকার হচ্ছে আইসিইউ সেবার। দেশের বিভিন্ন জেলায় এই সুবিধা না থাকায় রোগী নিয়ে ঢাকায় ছুটছেন স্বজনরা। তাই রোগীর চাপ বাড়ছে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। শুধু আইসিইউ নয়; যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে এবং করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে তাতে হাসপাতালের সাধারণ বেডও মিলছে না। হাসপাতালগুলোতে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ সংকট।
চিকিৎসকরা বলছেন, ধরন বদলে দেশে করোনা ভাইরাসের যে নতুন সংক্রমণ দেখা গিয়েছে তাতে খুব অল্প সময়েই রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। তিন দিন পার না হতেই অনেক রোগীর শারীরিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে। শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে। নিরুপায় হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে রোগী। প্রয়োজন হচ্ছে হাই ফ্লো অক্সিজেন ও আইসিইউর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর করোনা সংক্রমণ শুরুর পর যে সংকটগুলো তৈরি হয়েছিল এবারো তেমনটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত বছরও হাসপাতালে আইসিইউ সংকট ছিল, এ বছরও ওই একই চিত্র আমরা দেখছি। সময় পেয়েও আইসিইউ বেড যতটা বাড়ানো দরকার ছিল সরকার ততটা বাড়াতে পারেনি। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউর খরচ সাধারণের নাগালের বাইরে। ২৮টি জেলায় আইসিইউ আছে, ৩৬টি জেলায় নেই। এসব জেলার রোগীরা বাঁচার আশায় ঢাকায় আসছেন। কিন্তু ঢাকাতেও সেই সুযোগ তারা পাচ্ছেন না। আইসিইউ, অক্সিজেনের অভাবে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। আর দীর্ঘ হচ্ছে মৃতের তালিকা।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, এখনো দেশের সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা সরকারি হাসপাতাল। বেসরকারি হাসপাতালে বেড ফাঁকা মিলছে। কিন্তু যাদের টাকা নেই তারা বেসরকারি হাসপাতালের খরচ কোথা থেকে জোগাড় করবে? তাদের তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে মরতে হবে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভায় হাসপাতালগুলোতে যথাসম্ভব করোনা রোগীদের জন্য সাধারণ বেড ও আইসিইউ বেড সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর সক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শও দেন কমিটির সদস্যরা।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. ফরিদ হোসেন মিঞা ভোরের কাগজকে বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ বেড বাড়ানোর কাজ চলমান রয়েছে। হাসপাতালে আইসিইউ বেড বাড়ানো সমস্যা নয়, সমস্যা দক্ষ জনবলের। আইসিইউ ইউনিট চালানোর জন্য যে বিশেষ দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও ব্রাদারের প্রয়োজন হয় সেই জনবলের সংকট আছে আমাদের।

গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, দেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নির্ধারিত ১০টি সরকারি হাসপাতালে সাধারণ বেড আছে ২ হাজার ৭৩৬টি। রোগী ভর্তি আছে ২ হাজার ৪৯৯টিতে। ফাঁকা আছে ২৩৭টি বেড। আর এসব হাসপাতালের আইসিইউ বেড আছে ১৩২টি। রোগী ভর্তি ১২৫টিতে। ফাঁকা ৭টি। বেসরকারি ৯টি হাসপাতালের ৮৭০টি সাধারণ বেডের মধ্যে ৭২৪টিতে রোগী ভর্তি আছে। ফাঁকা আছে ১৪৬টি। ১৭৩টি আইসিইউ বেডের মধ্যে রোগী ভর্তি আছে ১৬৯টিতে। ফাঁকা ৪টি। ঢাকায় ৩ হাজার ৬০৬টি সাধারণ বেডের মধ্যে রোগী আছে ৩ হাজার ২২৩টিতে। আর ৩০৫টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ফাঁকা আছে মাত্র ১১টি। চট্টগ্রামের ৪টি সরকারি ও ৩টি বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে সাধারণ বেড আছে ৬৬৭টি। রোগী ভর্তি ৩৬৬টিতে আর ফাঁকা আছে ৩০১টি বেড। ৫১টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ২৭টিতে রোগী ভর্তি আছে। ফাঁকা আছে ২৪ টি। অথচ দেশের অনান্য এলাকায় চিত্রটা ভিন্ন। সেখানে সাধারণ বেড ও আইসিইউ ফাঁকা থাকছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাদে সারাদেশে ৫ হাজার ৭৪৬টি সাধারণ বেডের মধ্যে রোগী ভর্তি আছে ১ হাজার ৪৯৫ জন। ফাঁকা আছে ৪ হাজার ৯৩৫টি বেড। আর ২৪৪টি আইসিইউ বেডের মধ্যে রোগী ভর্তি আছ ১৩১ জন। ফাঁকা আছে ১১৩টি বেড।

এসআর

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়